চীনে কেন আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে ৫ দিন ছুটি থাকে
আমাদের দেশে মে দিবসের জন্য এক দিন ছুটি থাকে। কিন্তু চীনে এই ছুটি চলে টানা পাঁচ দিন। এই দীর্ঘ ছুটিতে চীনের মানুষ ব্যাপক ঘোরাঘুরি করেন। সম্প্রতি চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের হাংঝৌ শহরে মে দিবসের ছুটিতে মানুষের এমন উপচে পড়া ভিড় ছিল যে তা সামলাতে পুলিশকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে।
তবে এই বিশাল ভিড় সামলাতে তারা সাধারণ পুলিশের পাশাপাশি রাস্তায় নামিয়েছে ১৫টি রোবটের একটি বিশেষ দল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এই রোবটগুলো ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে পথচারী আর সাইকেল চালকদের পথ দেখাচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে রোবট পুলিশের এমন কাজ দেখে হাংঝৌ শহরের মানুষের কৌতূহল যেন আরও বেড়ে গেছে। তবে চীনে কেন পাঁচ দিন ধরে শ্রমিক দিবস পালন করা হয়?
মে দিবস কী
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০টির বেশি দেশে পালিত হয়। মূলত সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সাফল্য আর তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে সম্মান জানাতেই দিনটি পালন করা হয়।
শ্রমিক দিবসের শুরুটা হয়েছিল ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শিকাগো শহরের হে মার্কেট নামের এক জায়গায়। তখন শ্রমিকদের দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। এর প্রতিবাদে তাঁরা দাবি তুললেন, দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করবেন না। সেই আন্দোলনে শিশুশ্রম বন্ধ করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি ও সপ্তাহে অন্তত এক দিন ছুটির দাবিও ছিল।
এই আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়। অনেক শ্রমিক আহত হন। ১০ থেকে ১২ জন নিহত হন। তাঁদের এই সাহসী প্রতিবাদের কারণে পরে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কাজ করার নিয়ম তৈরি হয়।
চীনে মে দিবস
চীনকে বলা হয় বিশ্বের কারখানা। বর্তমান বিশ্বে আমরা যা কিছু ব্যবহার করি—হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য, তার একটি বিশাল অংশই তৈরি হয় চীনে। আজ চীন যে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ এবং পণ্য রপ্তানিতে শীর্ষের অবস্থানে পৌঁছেছে, তার আসল কারণ দেশটির কোটি কোটি পরিশ্রমী শ্রমিক।
চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের বিশাল ও দক্ষ জনশক্তি। দিন–রাত এক করে কারখানায় কাজ করা এই শ্রমিকদের থেকেই ‘মেড ইন চায়না’ কথাটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার পেছনে শ্রমিকদের এই অবদানকে সম্মান জানাতেই চীনে মে দিবস বা শ্রমিক দিবসকে এত বড় উৎসব হিসেবে দেখা হয়।
চীনে প্রথম মে দিবস পালিত হয়েছিল ১৯২০ সালের ১ মে। এরপর ১৯২১ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে চীনের আন্দোলনকারীরা শ্রমিকদের শিক্ষিত করে তুলতে বিভিন্ন কেন্দ্র গড়ে তোলেন ও ইউনিয়ন গঠন করেন। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর জন্য তাঁরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র এক মাস পরই দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ১ মে কে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
চীনে মে দিবসে এক দিন থেকে পাঁচ দিনের ছুটি
চীনে শ্রমিক দিবস আগে কেবল এক দিনের ছুটি ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯৯ সালে চীন সরকার এই ছুটি বাড়িয়ে সাত দিন করার সিদ্ধান্ত নেয়, যাকে বলা হতো গোল্ডেন উইক বা সোনালী সপ্তাহ। উদ্দেশ্য ছিল চীনা নববর্ষ ও জাতীয় দিবসের মতো এই সময়েও মানুষ যেন লম্বা ছুটি পায়।
মাঝখানে কয়েক বছর এই ছুটি কমিয়ে তিন দিন করা হলেও ২০১৯ সাল থেকে এটি আবার বাড়তে শুরু করে। সবশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ মে থেকে ৫ মে পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি কাটান চীনের মানুষ।
কেন পাঁচ দিনের ছুটি
চীনের এই পাঁচ দিনের ছুটির পেছনে রয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক হিসাব। লম্বা ছুটি পাওয়ার কারণে চীনের লাখ লাখ মানুষ পরিবার নিয়ে দূরে কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ পান। এতে দেশটির অভ্যন্তরীণ পর্যটনশিল্পে আয় বাড়ে।
শুধু তা–ই নয়, এই সময়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের ওপর বিশেষ ছাড় দেয়। ফলে কেনাকাটাও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। লোকজন তাঁদের পৈতৃক বাড়িতে যান, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন এবং দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরে বেড়ান।
২০১৯ সালে যখন মে দিবসের ছুটি বাড়ানো হলো তখন দেখা গেল বিদেশ যাওয়ার বিমানের টিকিট বুকিং এক লাফে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ছুটির পেছনের এই বিশাল অর্থনৈতিক প্রবাহ যেকোনো দেশই নিজের উন্নতির জন্য কাজে লাগাতে চাইবে।
ছুটির আড়ালে কাজের চাপ
যদিও সাত দিনের ছুটির কথা বলে শ্রমিকদের সম্মান জানানোর এত আয়োজন চলে, বাস্তব চিত্রটি কিন্তু সব সময় এক নয়। চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ৯৯৬ নামের একটি বিতর্কিত কর্মসংস্কৃতি প্রচলিত আছে। এর মানে হলো সপ্তাহে ৬ দিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করা।
আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা এই প্রথাকে আশীর্বাদ বলে মন্তব্য করলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর প্রতিবাদে চীনা কর্মীরা ইন্টারনেটে সোচ্চার হয়ে ওঠেন ও শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে চীনের আদালত এই প্রথাকে অবৈধ ঘোষণা করে।
চীনের শ্রম আইন অনুযায়ী, দিনে ৮ ঘণ্টা ও সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৪ ঘণ্টা কাজ করার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। প্রযুক্তি ও উইচ্যাটের মতো অ্যাপের কারণে অফিসের সময়ের পরও কর্মীদের কাজের বার্তার উত্তর দিতে হয়।
মূলত আধুনিক চীনের কর্মসংস্কৃতিতে অফিসের কর্মীদের ওপর সারা বছর কাজের প্রচণ্ড চাপ থাকে। এই দীর্ঘ ছুটিটি মূলত সেই হাড়ভাঙা খাটুনি থেকে একটু মুক্তির সুযোগ করে দেয় তাদের।