পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদীর খোঁজে
বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ নদী কোনটি, তা আমরা সবাই জানি—নীল নদ! আর সবচেয়ে বড় নদী আমাজন। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদী কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তোমাকে হয়তো সবজান্তা গুগল বা এআইয়ের সাহায্য নিতে হবে। কারণ, এই একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ অবাক করা কিছু তথ্য পেয়েছেন। পৃথিবীর বুকে এমন কিছু নদী আছে, যাদের বয়স শুনলে তোমার চোখ কপালে উঠবে! ডাইনোসরদেরও আগে পৃথিবীতে এদের জন্ম হয়েছিল। তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, সেগুলো এখনো অবিরামগতিতে বয়ে চলছে!
পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদীর নাম ফিংক নদী। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা একে লারাপিন্টা নামে ডাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই নদীর বয়স প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি বছর। তার মানে, প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে যখন ডাইনোসরদের রাজত্ব শুরু হয়েছিল, তারও অনেক আগে থেকে এই নদী বইছে! শুধু তা-ই নয়, যখন অস্ট্রেলিয়া, অ্যান্টার্কটিকা, আফ্রিকা ও ভারত মিলে গন্ডোয়ানা নামের বিশাল এক অতিকায় মহাদেশ ছিল, ফিংক নদী তখন থেকেই নিজের পথ তৈরি করে আসছিল।
ফিংক নদীর অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে। এর জন্ম ম্যাকডনেল রেঞ্জ নামে পাহাড়ি এলাকায় এবং এটি গিয়ে মিশেছে আয়ার হ্রদে। মজার ব্যাপার হলো, এটি আমাদের দেশের নদীগুলোর মতো সারা বছর পানিতে ভরপুর থাকে না। এই নদী বছরে মাত্র কয়েকবার ভারী বৃষ্টির পর প্রবহমান হয়। বাকি সময় একে দেখলে মনে হবে, শুধুই বালুর প্রান্তর এবং ছোট ছোট পানির গর্ত। এই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০০ থেকে ৭৫০ কিলোমিটার। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের এক পুরোনো রূপকথায় বলা হয়, রেইনবো সারপেন্ট বা রংধনু সাপ যখন আয়ার হ্রদ থেকে উত্তর দিকে যাচ্ছিল, তখন তার চলার পথ ধরেই এই নদীর জন্ম হয়েছিল।
এখন তোমার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, বিজ্ঞানীরা কীভাবে একটি নদীর বয়স মাপেন? কাজটা কিন্তু মোটেও সোজা নয়! বিশেষ করে যখন কোটি কোটি বছরের হিসাব মেলাতে হয়। ভূতাত্ত্বিকেরা নদীর চারপাশের পরিবেশ, পর্বতমালা, নদীর তলদেশের পলি এবং নদীর আঁকাবাঁকা পথ খুব সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করেন। কোটি কোটি বছরের ক্ষয়ের ফলে এই নদীর গতিপথ কীভাবে চারপাশের দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে, তা হিসাব করা হয়।
ফিংক নদীর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এক অদ্ভুত বিষয়। সাধারণত পাহাড় তৈরি হলে নদী তার পাশ দিয়ে সহজ পথ বেছে নেয়। কিন্তু ফিংক নদী সরাসরি উঁচু পাহাড়ের বুক চিরে পথ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অ্যান্টিসিডেন্ট রিভার বা আগের নদী। মানে পাহাড়গুলো তৈরি হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেখানে নদীটি ছিল। যখন ধীরে ধীরে ভূমি উঁচু হয়ে পাহাড় তৈরি হচ্ছিল, নদীটি তখনো তার পথ বদলায়নি; বরং সে পাহাড় কেটে নিজের গভীর খাদ তৈরি করে বইতে থাকে। তা ছাড়া গত ১০ কোটি বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার মহাদেশীয় কাঠামো খুব স্থির ছিল এবং বরফ যুগে এটি পুরোপুরি বরফে ঢাকা পড়েনি। এ কারণেই প্রাচীন নদীটি এত দিন টিকে রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া থেকে এবার চলো উত্তর আমেরিকায় যাই। সেখানকার সবচেয়ে পুরোনো নদীটির নাম শুনলে তুমি হয়তো একটু হাসবে। এর নাম নিউ রিভার। অর্থাৎ, সবচেয়ে পুরোনো নদীটির নামই বাংলা করলে হয় নতুন নদী! ইতিহাস থেকে জানা যায়, আঠারো শতকে যখন ইউরোপীয়রা ওই অঞ্চলে পৌঁছায়, তখন তারা ম্যাপে এর নাম দেয় ‘একটি নতুন নদী’। সেই থেকেই এর নাম এমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। নাম নতুন হলেও এটি কিন্তু মহাদেশটির সবচেয়ে পুরোনো নদী। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার ব্লু রিজ পর্বতমালা থেকে শুরু হয়ে ভার্জিনিয়া ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ভেতর দিয়ে প্রায় ৫৪৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কানাওহা নদীর সঙ্গে মিশেছে। এর বয়স নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেক মতভেদ আছে। অনেকের মতে, এটি ১ কোটি থেকে ৩৬ কোটি বছরের পুরোনো। ১৯৭০-এর দশকে এই নদীতে বাঁধ দেওয়ার একটি সরকারি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন শুরু হয়, তখন একে বাঁচানোর জন্য প্রচারণায় বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীন নদী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
এবার আসি ইউরোপের কথায়। ইউরোপের সবচেয়ে পুরোনো নদীর নাম মিউস। এটি ফ্রান্স থেকে শুরু হয়ে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের ভেতর দিয়ে প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। বেলজিয়ামের নামুর এবং শার্লভিল-মেজিয়েরের মধ্যে এই নদী প্রাচীন প্যালিওজোয়িক যুগের পাথরের স্তর কেটে বয়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই মিউস নদীর বয়স প্রায় ৩২ থেকে ৩৪ কোটি বছর।
নদীর বয়স মাপা বা এর জন্মরহস্য বের করা খুব নিখুঁত কোনো বিজ্ঞান নয়। কোটি কোটি বছরের পুরোনো পাথর ও পলির হিসাব মেলানো বেশ কঠিন কাজ। হয়তো ভবিষ্যতে আরও নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আমাদের সামনে আসবে, যা এই নদীগুলোর বয়স সম্পর্কে আরও নিখুঁত তথ্য দেবে।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স, টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং এনপিএস ডটকম