ডাইনোসরের পূর্ণবয়স্ক হতে কত বছর লাগত

ডাইনোসর বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশালদেহী ও ভয়ংকর এক প্রাণীর ছবি! আর সেই ডাইনোসরদের রাজা বলা হয় টিরানোসরাস রেক্স বা সংক্ষেপে টি রেক্সকে। তুমি কি জানো, এই ভয়ংকর টি রেক্সের এত বিশাল শরীর তৈরি হতে কত বছর সময় লাগত?

বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা টি রেক্সের জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া পায়ের হাড়ের ভেতরের গ্রোথ রিং পরীক্ষা করছেন। গাছের গুঁড়ি কাটলে যেমন ভেতরে গোল গোল রিংয়ের মতো দাগ দেখা যায়, ডাইনোসরদের হাড়েও ঠিক তেমনি রিং থাকে! এই রিংগুলো গুনে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, ডাইনোসরটি কত বছর বেঁচে ছিল এবং কত দ্রুত বড় হয়েছিল। আগের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, টি রেক্স হয়তো ২৫ বছর বয়সের মধ্যেই পূর্ণবয়স্ক হয়ে যেত।

কিন্তু সম্প্রতি পিরজে (PeerJ) নামে একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নতুন এবং বড় গবেষণায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিজ্ঞানীরা ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বিশাল বয়স্ক টি রেক্সের মোট ১৭টি জীবাশ্ম পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই ভয়ংকর শিকারি প্রাণীটির প্রায় আট টন ওজনের বিশাল শরীর তৈরি হতে সময় লাগত প্রায় ৪০ বছর!

আরও পড়ুন
ডাইনোসরের একটি প্রজাতি টাইরানোসরাস-রেক্সের কঙ্কাল। এটি ১২ দশমিক ৮ ফুট উঁচু।

টি রেক্সের জীবনের ইতিহাস অনুসন্ধান

এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যানাটমি বিভাগের অধ্যাপক হলি উডওয়ার্ড। তিনি বলেন, ‘টি রেক্সকে নিয়ে করা এটাই এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ডেটাসেট বা তথ্যভান্ডার। জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া হাড়ের ভেতরের গ্রোথ রিংগুলো পরীক্ষা করে আমরা এই প্রাণীগুলোর বছরের পর বছর বেড়ে ওঠার ইতিহাস নতুন করে সাজাতে পেরেছি।’

তবে একটা সমস্যা আছে। গাছের গুঁড়িতে যেমন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কটি রিং সুন্দরভাবে সাজানো থাকে, ডাইনোসরের হাড়ে কিন্তু পুরো জীবনের হিসাব একসঙ্গে পাওয়া যায় না। টি রেক্সের হাড়ের একটি কাটা অংশ থেকে সাধারণত তাদের জীবনের শেষ ১০ থেকে ২০ বছরের হিসাব পাওয়া যায়।

তাহলে বাকি হিসাব মিলবে কীভাবে? এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য বিজ্ঞানীরা এক নতুন গাণিতিক পদ্ধতির আশ্রয় নিলেন। তাঁরা বিভিন্ন বয়সের অনেকগুলো টি রেক্সের হাড়ের তথ্য একসঙ্গে জোড়া লাগিয়ে পুরো প্রজাতির জন্য একটি সম্মিলিত বৃদ্ধির রেখাচিত্র তৈরি করলেন।

গবেষক দলের আরেকজন সদস্য, গণিতবিদ ও প্রত্নজীববিজ্ঞানী নাথান মাইরভোল্ড বলেন, ‘আমরা এমন একটি নতুন পরিসংখ্যান পদ্ধতি বের করেছি, যা বিভিন্ন ডাইনোসরের বৃদ্ধির রেকর্ডগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে দেয়! ফলে টি রেক্স কীভাবে বড় হতো এবং তাদের আকারে কতটা ভিন্নতা ছিল, তার একটা বাস্তবসম্মত চিত্র আমরা আগের যেকোনো গবেষণার চেয়ে নিখুঁতভাবে পেয়েছি।’

আরও পড়ুন

ডাইনোসরদের দীর্ঘ শৈশব

নতুন এই গবেষণার ফলাফল আমাদের বলছে, টি রেক্স কিন্তু খুব দ্রুত বড় হয়ে যেত না। বরং তারা কয়েক দশক ধরে খুব ধীরে ধীরে বেড়ে উঠত।

দ্রুত বড় হওয়ার বদলে টি রেক্সের এই যে দীর্ঘ সময় ধরে বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া, এর পেছনে দারুণ একটি পরিবেশগত কারণ থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

চ্যাপম্যান ইউনিভার্সিটির গবেষক জ্যাক হর্নার বলেন, ‘এই দীর্ঘ ৪০ বছরের বেড়ে ওঠার সময়টা হয়তো অল্পবয়সী টি রেক্সদের তাদের পরিবেশের বিভিন্ন রকম কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করত। আর হয়তো এ কারণেই তারা ক্রেটাসিয়াস যুগের শেষ দিকে এসে সবচেয়ে ভয়ংকর ও শীর্ষ শিকারি হিসেবে পুরো পৃথিবীতে রাজত্ব করতে পেরেছিল।’

আর্কিওপ্টেরিক্স ডাইনোসরের জীবাশ্ম
ছবি: রয়টার্স

বিখ্যাত কিছু জীবাশ্ম কি তবে অন্য কোনো প্রাণীর

যদিও এই ডাইনোসর গোষ্ঠীর মধ্যে টি রেক্স সবচেয়ে বেশি পরিচিত, তবে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো একটা বড় বিতর্ক রয়ে গেছে। টি রেক্স বলে দাবি করা কিছু জীবাশ্ম কি আসলেই টি রেক্সের, নাকি অন্য কোনো কাছাকাছি প্রজাতির?

কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, ছোট আকারের কিছু জীবাশ্ম হয়তো অল্পবয়সী টি রেক্সের নয়, বরং সেগুলো ন্যানোটিরানাস নামে সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রজাতির ডাইনোসরের। আবার কেউ কেউ বলেন, সবচেয়ে বড় জীবাশ্মগুলোও হয়তো দুটি বা তিনটি আলাদা প্রজাতির হতে পারে! বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এই তর্ক এখনো চলছে।

এই বিষয়টা আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা টিরানোসরাস রেক্স স্পিসিস কমপ্লেক্সের আওতায় ১৭টি জীবাশ্ম পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপারটি ঘটে জেন এবং পিটি নামে দুটি বিখ্যাত জীবাশ্মের ক্ষেত্রে। দেখা যায়, এই দুটির বেড়ে ওঠার ধরন বাকি জীবাশ্মগুলোর চেয়ে একেবারেই আলাদা! শুধু হাড়ের বৃদ্ধির ডেটা দেখে প্রমাণ করা কঠিন যে এরা আলাদা প্রজাতি, তবে এটি বিজ্ঞানীদের মনে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি জান্নো এবং নাপোলি নামে দুজন বিজ্ঞানী সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, জেন এবং পিটি হয়তো ন্যানোটিরানাস প্রজাতিরই দুটো আলাদা ডাইনোসর!

আরও পড়ুন

লুকানো গ্রোথ রিং খুঁজে বের করার নতুন প্রযুক্তি

এই গবেষণার আরেকটি বড় চমক হলো ডাইনোসরের হাড়ে এমন এক ধরনের গ্রোথ রিং আবিষ্কার, যা আগে কখনো কেউ খেয়ালই করেনি! সাধারণ মাইক্রোস্কোপ বা আলো দিয়ে যা দেখা যায় না, সার্কুলারলি পোলারাইজড এবং ক্রস-পোলারাইজড নামে বিশেষ ধরনের আলো ব্যবহার করে হাড়ের সেই লুকানো বৈশিষ্ট্যগুলোও স্পষ্ট দেখা যায়!

এই নতুন জাদুকরী প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের ডাইনোসরের হাড়ের বিভ্রান্তিকর বৃদ্ধির ধরনগুলো বুঝতে অনেক সাহায্য করেছে। গবেষণায় শক্তিশালী গাণিতিক প্রমাণ দিয়ে দেখানো হয়েছে, এত দিন ধরে বিজ্ঞানীরা গ্রোথ রিং গোনার জন্য যে সাধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চোখ এড়িয়ে যেত। খুব কাছাকাছি থাকা একাধিক গ্রোথ রিং বের করা বেশ কঠিন একটা কাজ।

টি-রেক্স ডাইনোসরের প্রতীকী ছবি
ছবি: সংগৃহীত

টি রেক্সের জীবনকাহিনির আরও স্পষ্ট ছবি

টি রেক্স প্রথম আবিষ্কার হওয়ার পর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু আজও এই ভয়ংকর প্রাণীটি বিজ্ঞানীদের অবাক করে চলেছে। অনেক বেশি জীবাশ্মের নমুনা, নতুন গাণিতিক টুল এবং ছবি তোলার উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিজ্ঞানীরা এখন এই আইকনিক শিকারি প্রাণীটির বেড়ে ওঠা সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক পরিষ্কার ধারণা পাচ্ছেন।

নতুন এই ফলাফলগুলো টিরানোসরাস রেক্সকে একটি জীবন্ত প্রাণী হিসেবে আমাদের সামনে আরও নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে। একসময়ের ছোট্ট ডাইনোসর ছানা থেকে কীভাবে ধাপে ধাপে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর শিকারি হয়ে উঠত টি রেক্স, সেই রোমাঞ্চকর যাত্রার গল্প এখন আমাদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট ও জীবন্ত!

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি ডটকম

আরও পড়ুন