ইতিহাসে প্রথম এক্সোপ্ল্যানেট থেকে রেডিও সংকেত পাওয়া গেল

পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে একটি গ্রহমণ্ডল রয়েছে। আমাদের সৌরজগতের বয়সের তুলনায় এটি ১ শতাংশের চেয়েও নতুন বা তরুণ। এর নাম ‘বিটা পিক্টোরিস’। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, এই গ্রহমণ্ডলে রয়েছে সূর্যের চেয়ে বড় একটি নক্ষত্র, তিনটি বিশাল গ্রহ এবং ধূলিকণা ও পাথুরে ধ্বংসাবশেষের একটি বড় ডিস্ক।

এই গ্রহমণ্ডলের মাঝের গ্রহটির নাম ‘বিটা পিক্টোরিস বি’। এটি বৃহস্পতি গ্রহের চেয়েও কয়েক গুণ বড় গ্যাসের তৈরি এক দানব গ্রহ। পুরোটাই গ্যাসে ভরা হওয়ায় পা রাখার মতো কোনো শক্ত মাটি বা পৃষ্ঠ এখানে নেই। মহাজাগতিক হিসাবে এর বয়স কয়েক মিলিয়ন বছর, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিচারে একেবারে শিশু গ্রহের মতো।

এটি সরাসরি টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রহগুলোর একটি। তরুণ গ্রহ হওয়ায় এটি বেশ উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল। এ ছাড়া নিজের নক্ষত্র থেকে এটি বেশ দূরে অবস্থিত। ঠিক যেমন আমাদের সূর্য থেকে শনি গ্রহের দূরত্ব। তাই শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে নক্ষত্রের আলো থেকে আলাদা করে একে খুব সহজেই দেখা যায়।

আরও পড়ুন

হার্ভার্ড ও ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নতুন একটি গবেষণায় একটি অবাক করা বিষয় দাবি করা হয়। তাঁদের মতে, বিটা পিক্টোরিস বি গ্রহ থেকে এমন এক আলো বা তরঙ্গ বের হচ্ছে, যা আগে কখনো কোনো এক্সোপ্ল্যানেটে দেখা যায়নি। আর সেটি হলো রেডিও সংকেত বা তরঙ্গ।

দক্ষিণ আফ্রিকার ‘মিরক্যাট’ রেডিও টেলিস্কোপে এই সংকেত ধরা পড়েছে। সংকেতটি একেবারেই প্রাকৃতিক কোনো উৎস থেকে এসেছে। অর্থাৎ এটি এলিয়েনদের পাঠানো কোনো তথ্য বা সিগন্যাল নয়। গবেষকেরা গবেষণাপত্রের শুরুতেই এই বিষয় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার ‘মিরক্যাট’ রেডিও টেলিস্কোপে এই সংকেত ধরা পড়েছে
স্পেস ডটকম

যদিও গবেষণাটি এখনো অন্যান্য বিজ্ঞানীদের দ্বারা যাচাই বা ‘পিয়ার-রিভিউ’ করা হয়নি। তবে গবেষকেরা শক্তিশালী কিছু প্রমাণ হাজির করেছেন। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রহটির তীব্র চৌম্বকীয় চালচলন ও কর্মকাণ্ডের কারণেই এই রেডিও তরঙ্গ তৈরি হয়েছে।

এই রেডিও তরঙ্গগুলোর বৈশিষ্ট্য নতুন ও বিশাল আকারের গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাসের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। গ্রহটির শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রে ধনাত্মক বা ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা আটকা পড়তে পারে। গ্রহটি যখন নিজের অক্ষের চারপাশে ঘোরে, তখন এই কণাগুলো দ্রুত গতি পায় এবং রেডিও তরঙ্গের আকারে শক্তি ছড়িয়ে দেয়। এক অর্থে, অরোরাল রেডিও নিঃসরণ নামে পরিচিত এই ঘটনা হলো মহাকাশের দিকে গ্রহের চৌম্বকমণ্ডলের একধরনের শব্দ।

আরও পড়ুন

গবেষক দলটি এমন বেশ কয়েকটি সংকেত খুঁজে পেয়েছেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি কোনো বহির্গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট থেকে এই সংকেত আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। যার জন্য বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে চেষ্টা করছিলেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই সাফল্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। ২০২৩ সালে ওয়াইজেড সেটি নক্ষত্রমণ্ডলীতে এমন তীব্র রেডিও তরঙ্গ ধরা পড়েছিল। সেখানকার সংকেতগুলো বারবার ফিরে আসছিল, যা একটি গ্রহের ঘূর্ণনের সঙ্গে মিলে যায় বলে মনে হয়েছিল। তবে সেই তরঙ্গ কেবল নক্ষত্রটির নিজস্ব চৌম্বকীয় চালচলনের কারণে তৈরি হয়েছিল কি না তা বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারেননি।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিটা পিকটোরিস নক্ষত্রমণ্ডলটি কিন্তু দারুণ এক বিশেষ জায়গায় রয়েছে। ১৯৮৪ সালে এটিই ছিল প্রথম নক্ষত্র, যার চারপাশে ধূলিকণা ও পাথুরে ধ্বংসাবশেষের চাকতির ছবি সরাসরি তোলা সম্ভব হয়েছিল। সেই ছবি দেখে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন সেখানে হয়তো নতুন গ্রহ তৈরি হচ্ছে, যদিও তখন কোনো গ্রহ নিশ্চিতভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সূত্র: ওয়্যার্ড ডটকম
আরও পড়ুন