সেফটি পিনের পেছনের অংশ প্যাঁচানো থাকে কেন
সবার বাড়ির ড্রয়ার খুঁজলেই হয়তো সেফটি পিন পাওয়া যাবে। দুনিয়ার সব অপ্রয়োজনীয় জিনিসের সঙ্গে জমা থাকে এই প্রয়োজনীয় জিনিসটিও। দেখতে খুব তুচ্ছ জিনিস মনে হয়, দামেও ভারী সস্তা। কিন্তু বিপদের সময় এই সেফটি পিনই হয়ে ওঠে আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু।
হঠাৎ শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গেছে? ব্যাগের চেইন নষ্ট? কিংবা শাড়ির কুঁচি ঠিকঠাক থাকছে না? সমাধান সেই সেফটি পিন। আমরা এটি নিয়মিত ব্যবহার করি। কিন্তু কখনো কি এর গঠন ভালোভাবে খেয়াল করেছ? বিশেষ করে সেফটি পিনের নিচে যে প্যাঁচানো অংশ বা ছিদ্রটি থাকে, তা আসলে কোন কাজে লাগে?
বেশির ভাগ মানুষ ভাবে, ওটা নিশ্চয়ই ডিজাইনের অংশ। দেখতে সুন্দর লাগে বলেই হয়তো ও রকম প্যাঁচানো হয়েছে। কিন্তু নয়, ওই ছোট্ট ছিদ্রটি আসলে সেফটি পিনের প্রাণভোমরা। ওটা না থাকলে সেফটি পিন তার আসল কাজটাই করতে পারত না!
ছিদ্রটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা জানতে আমাদের কথা বলতে হবে ল্যারি শোয়ার্টজের সঙ্গে। তিনি হোলসেল সেফটি পিনস নামের এক বিশাল কোম্পানির মালিক। ২০ বছর ধরে তিনি শুধু সেফটি পিন নিয়েই ব্যবসা করছেন। তাঁকে এই ছিদ্রের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সোজা চলে যান কারখানায়, যেখানে পিনগুলো তৈরি হয়। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে এল ছিদ্রের আসল রহস্য।
সেফটি পিনে আসলে দুটি ছিদ্র থাকে। একটি থাকে ওপরে, যেখানে পিনের মাথাটা আটকানো হয়, অন্যটি নিচে। নিচের এই প্যাঁচানো অংশটি স্প্রিং মেকানিজম হিসেবে কাজ করে। পিনটি যখন তৈরি করা হয়, তখন সোজা তারকে পেঁচিয়ে তৈরি হয় এই ছিদ্র। এই প্যাঁচ বা ছিদ্রই পিনটির চাপ সামলায়।
আরও সহজ করে বলি। খেয়াল করলে দেখবে, সেফটি পিন খোলার সময় সেটি আপনা–আপনি বাইরের দিকে ছিটকে যেতে চায়। ওটা আবার চাপ দিয়ে আটকাতে হয়। এই যে চাপ বা স্প্রিংয়ের মতো ভাব, এটা তৈরি হয় ওই প্যাঁচানো ছিদ্রটির কারণেই। যদি ওই ছিদ্র না থাকত, তাহলে সেফটি পিন হতো একটা সাধারণ বাঁকানো তারের মতো। ওটা নিজে থেকে বন্ধ থাকত না, আবার খুলতেও চাইত না। আর তাতে ছিঁড়ে যাওয়া জামা বা শাড়িও সেফটি পিন আটকে রাখতে পারত না।
তা ছাড়া কারখানায় পিন তৈরির সময় এ ছিদ্রটি ম্যানুফ্যাকচারিং পয়েন্ট বা অ্যাঙ্কর হিসেবে কাজ করে। আর ওপরের দিকেও একটি ছিদ্র থাকে। ওপরের ছিদ্রের কাজ হলো পিনের তীক্ষ্ণ মাথাটিকে নিরাপদে ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করা। এ ছাড়া পিনটি খোলার সময় যে চাপের সৃষ্টি হয়, এ ছিদ্রটি সেই চাপ কিছুটা কমিয়ে দেয়, যাতে পিনটি ভেঙে না যায়।
তবে এই সেফটি পিন আবিষ্কারের একটি মজার কাহিনি আছে। হুট করেই আবিষ্কার হয়ে যায় এটি, তা-ও ১৫ ডলারের ঋণের দায়ে! আধুনিক সেফটি পিন আবিষ্কৃত হয় ১৮৪৯ সালে। আবিষ্কারক ছিলেন ওয়াল্টার হান্ট নামের এক মেকানিক। বেচারা হান্ট তখন মাত্র ১৫ ডলারের ঋণ নিয়েছিলেন। তবে সে যুগে ১৫ ডলার কিন্তু অনেক টাকা! যাহোক, তিনি ভাবছিলেন কীভাবে এই ঋণ শোধ করা যায়।
চিন্তিত হান্ট আনমনে তাঁর হাতে থাকা এক টুকরা তারকে মোচড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন, তারটি পেঁচিয়ে এমন একটা লুপ বা ফাঁস তৈরি হয়েছে, যা বারবার খোলা ও বন্ধ করা যায়। আর এভাবেই জন্ম হলো সেফটি পিনের! তিনি তৎক্ষণাৎ এটির পেটেন্ট বা স্বত্ব করিয়ে মাত্র ৪০০ ডলারে বিক্রি করে দেন। হান্ট তখনো জানতেন না, তাঁর এই আবিষ্কার আগামী কয়েক শতাব্দী ধরে সারা পৃথিবী ব্যবহার করবে।
তবে সেফটি পিনের আছে নানা রূপ। দুনিয়াজুড়ে হাজারো কাজে ব্যবহারের জন্য নানা ধরনের পিন তৈরি হয়। দেখো তো, তুমি কয়টা চেনো!
১. ট্র্যাডিশনাল বা সাধারণ পিন
এগুলো ১, ২ বা ৩ নম্বর সাইজের হয়। আমাদের ঘরে, সেলাই বাক্সে বা ফার্স্ট এইড বক্সে এগুলোই থাকে।
২. কালো সেফটি পিন
এদের বলা হয় সেফটি পিন জগতের ‘নিনজা’। এগুলো কুচকুচে কালো রঙের হয় এবং আলো পড়লে চকচক করে না। হলিউডের মুভি বা ফ্যাশন ফটোশুটে এগুলো ব্যবহার করা হয়, যাতে ক্যামেরায় পিনগুলো দেখা না যায়।
৩. ছিদ্র ছাড়া পিন
কিছু পিনে নিচের দিকে ছিদ্রটি থাকে না। কারণ, দামি সোয়েটার বা লেসের পোশাকে সাধারণ পিন লাগালে ওই প্যাঁচে সুতা আটকে পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। তাই শৌখিন ও দামি পোশাকের জন্য এই বিশেষ পিন ব্যবহার করা হয়।
৪. নাশপাতি আকৃতির পিন
এগুলো দেখতে নাশপাতির মতো গোলগাল। সাধারণত নতুন পোশাকের সঙ্গে প্রাইস ট্যাগ বা বোতাম ঝুলিয়ে রাখতে এগুলো ব্যবহার করা হয়। দেখতে সুন্দর বলে অনেকে এগুলো শখের গয়না হিসেবেও ব্যবহার করেন।
৫. কিল্টি পিন
এগুলো বেশ বড় ও ভারী। স্কটল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘কিল্ট’ আটকানোর জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়। আজকাল পাঙ্ক ফ্যাশন বা জ্যাকেটের স্টাইল হিসেবেও এগুলো বেশ জনপ্রিয়।
৬. লন্ড্রি বা নেট পিন
এই পিনগুলো অনেক শক্তিশালী ও মজবুত। বড় বড় হোটেল বা হাসপাতালের লন্ড্রিতে হাজার হাজার কাপড়ের বস্তা বা জালের মুখ আটকানোর জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়। এগুলো খোলার জন্য রীতিমতো পেশাদার হতে হয়!
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট