১০ হাজার ফুট উঁচু থেকে পড়েও বেঁচে গেল এক কিশোরী
আকাশ থেকে পড়ে কেউ বেঁচে যেতে পারে? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে নিশ্চয়ই তোমাদেরও ‘আকাশ থেকে পড়া’র মতো অবস্থা হয়েছে। কিন্তু ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছিল জুলিয়ানে কোয়েপক নামের এক কিশোরীর জীবনে।
১৯৭১ সালের বড়দিনে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে ১৭ বছর বয়সী কিশোরী জুলিয়ানে কোয়েপক। বজ্রঝড়ের কবলে পড়া বিমান আকাশে থাকতেই ১০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে নিচে ছিটকে পড়েছিল সে। তখন তার মাথায় যেন ‘আকাশ ভেঙে পড়েছিল’। কিন্তু এত ওপর থেকে পড়েও বেঁচে গিয়েছিল জুলিয়ানে। চেতনা ফিরলে সে নিজেকে আবিষ্কার করে আমাজনের গভীর জঙ্গলে। এই ঘন জঙ্গল থেকে ১১ দিন পর সম্পূর্ণ একা কীভাবে সে বেঁচে ফিরেছিল, সে গল্প কল্পকাহিনিকেও হার মানাবে। ১৯৭৪ সালে এ ঘটনা নিয়ে ইতালিয়ান পরিচালক জুসেপ্পে মারিয়া স্কটিস ‘মিরাকলস স্টিল হ্যাপেন’ নামে একটি ছবি নির্মাণ করেন। পরে ১৯৯৮ সালে ভার্নার হার্জগ ‘উইংস অব হোপ’ শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। জুলিয়ানে নিজে তাঁর স্মৃতিকথামূলক ‘হোয়েন আই ফেল ফ্রম দ্য স্কাই’ বইয়েও এই কাহিনি উল্লেখ করেছেন।
আকাশ থেকে পড়ে যাওয়া মেয়েটি
জুলিয়ানের বেড়ে ওঠা পেরুর রাজধানী লিমা শহরে। জন্ম ১৯৫৪ সালে। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সে সেখানেই ছিল। বাবা জার্মান প্রাণিবিজ্ঞানী হানস-উইলহেলম ও মা পাখিবিশারদ মারিয়া কোয়েপকের একমাত্র সন্তান সে। ১৯৬৮ সালে তার মা–বাবা আমাজনের মধ্যবর্তী অঞ্চল পেরুর রেইনফরেস্টে পাঙ্গুয়ানা ইকোলজিক্যাল রিসার্চ স্টেশন প্রতিষ্ঠা করেন। মা–বাবার সঙ্গে জুলিয়ানে প্রায়ই জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, রিসার্চ স্টেশনে থাকত। বাইরে ছিল লতাপাতা, গাছ, পাখি ও হাউলার বানর। আর ভেতরে ছিল তার মায়ের বই আর পোষা তোতাপাখি টোবিয়াস। জুলিয়ানে পশু, পাখি ও প্রাণীদের ভাষা বুঝতে পারত। টানা দুই বছর মা–বাবার সঙ্গে জঙ্গলে গবেষণাভ্রমণে যাওয়ার পর জুলিয়ানে হাইস্কুল শেষ করতে আবার লিমায় ফিরে আসে। জঙ্গলে বড় হওয়া জুলিয়ানে সে সময় নিজেকে ‘জংলি’ মেয়ে বলত।
১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠান ও স্কুল পার্টি শেষে বড়দিনে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জুলিয়ানে। সঙ্গী মা। তারা লিমা থেকে পুকালপাগামী একটি বিমানে ওঠে। পাঙ্গুয়ানার সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর হলো পুকালপা। এরপর ঘটে যায় ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনা। শুরু হয় জুলিয়ানের গভীর জঙ্গলে টিকে থাকার এক অবিশ্বাস্য লড়াই।
ধাতব পাখির উড়াল
জুলিয়ানের মা কিছুদিন আগেই পুকালপায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গ্র্যাজুয়েশন আর স্কুল পার্টিতে অংশ নেওয়ার জন্য মাকে কয়েক দিন পরে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল জুলিয়ানে। সেই অনুরোধ রেখেছিলেন মা।
বড়দিনের আগের সকালে বিমানবন্দরে পৌঁছেই দেখা গেল, সেখানে উপচে পড়া ভিড়। বড়দিনের ছুটিতে সবাই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে। এ ছাড়া আগের দিন বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় শত শত মানুষ টিকিট কাউন্টারে ভিড় করেছেন। তাই উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে জুলিয়ানের মা একটি টার্বোপ্রপ বিমান ল্যানসা ফ্লাইট ৫০৮–এর টিকিট কাটেন। এই ফ্লাইটে সেদিন ৯৯ জন যাত্রী ছিলেন।
লকহিড এল–১৮৮ ইলেকট্রা বিমানের বদনামের কথা জুলিয়ানের বাবা হানস-উইলহেলম আগে থেকেই জানতেন। তৈরি হওয়া ১৭০টি ইলেকট্রার মধ্যে ৫৮টি মাঝ–আকাশে দুর্ঘটনা বা মারাত্মক ত্রুটির কারণে বাতিল হয়েছিল। এ কারণে তিনি বিকল্প বিমানে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু আর এক দিন পর বড়দিন হওয়ায় মা–মেয়ে শেষ পর্যন্ত টিকিট কেটে ফেলে।
বেলা প্রায় ১১টার দিকে বোর্ডিং শুরু হয়। জুলিয়ানে ও তাঁর মা তিন আসনের বেঞ্চের একেবারে পেছন দিকের সারিতে বসেন। জানালার পাশের সিটে জুলিয়ানে আর তার পাশে মা।
জুলিয়ানের মা উড়োজাহাজে উঠতে পছন্দ করতেন না। তিনি ছিলেন পাখিবিশারদ। তাই বিমানকে বলতেন ধাতব পাখি। বলতেন, ধাতব পাখির আকাশে ওড়া প্রকৃতিবিরুদ্ধ।
ঝড়ের কবলে
বিমানে লিমা থেকে পুকালপায় যেতে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে। এই ফ্লাইটের প্রথমার্ধ ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। সকালের নাশতার জন্য স্যান্ডউইচ ও পানীয় দেওয়া হয়। স্যান্ডউইচ খেতে খেতে জানালা দিয়ে জুলিয়ানে রেইনফরেস্ট দেখছিল। কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ আকাশ অন্ধকার হয়ে যায়। শুরু হয় ভয়ংকর বজ্রঝড়।
জুলিয়ানে জানায়, হঠাৎ দিনের আলো রাতের মতো অন্ধকার হয়ে আসে। বিমান তীব্রভাবে কাঁপতে থাকে। মাথার ওপরের তাক থেকে ব্যাগ, মোড়ানো উপহার আর জামাকাপড় সব পড়ে যায়। স্যান্ডউইচের ট্রেগুলো ভেতরে বাতাসে উড়তে শুরু করে, আধখাওয়া পানীয় যাত্রীদের মাথায় ছিটকে পড়ে। মানুষ চিৎকার করতে থাকে, কান্না শুরু হয়।
সব ঠিক হয়ে যাবে বলে আশ্বাস দিতে থাকেন মা। জুলিয়ানে বলে, ‘ডান পাশের ডানার ওপর একঝলক সাদা আলো দেখি। সেটা বজ্রপাত না বিস্ফোরণ, জানি না। সময়ের ধারণা হারিয়ে ফেলি। বিমানটি হঠাৎ নিচের দিকে পড়তে শুরু করে। পেছনের সিটে বসে সামনের ককপিট পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। বিমানে অনেক জোরে শব্দ হতে থাকে। সবকিছুর মধ্যেও আমি শুনতে পাই, মা শান্ত গলায় বলছেন, এখন সব শেষ।’
হঠাৎ দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে বিমান। একসময় যাত্রীদের চিৎকার আর ইঞ্জিনের শব্দ থেমে যায়। জুলিয়ানে দেখে, মা তার পাশে নেই। সে নিজেও আর নেই বিমানের ভেতর। কিন্তু তাঁর সিটবেল্ট বাঁধা। সেটা এত শক্ত করে চেপে ধরে আছে যে সে শ্বাস নিতে পারছিল না। প্রায় ১০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে উল্টো অবস্থায় নিচে পড়ে যাচ্ছে সে। পেরুর রেইনফরেস্ট ধীরে ধীরে ঘুরছে তার দিকে। গাছের ঘন মাথাগুলো দেখতে তার ব্রকলির মতো মনে হচ্ছিল। এসব দেখে ভয় পাওয়ার আগেই সে অচেতন হয়ে পড়ে।
অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া
ভিজে, কাদায় মাখামাখি অবস্থায় সেদিন পুরো রাত সেখানেই পড়ে থাকতে হয় জুলিয়ানেকে। পরদিন সকালে চেতনা ফিরে আসার পর চোখ খুলে দেখে, সে আমাজনের জঙ্গলের একদম মাঝখানে পড়ে আছে। আশপাশে কেউ নেই। মা–ও নেই। সারা শরীর ব্যথায় ভরা। কাঁধের হাড় ভেঙে গেছে, চোখ ফুলে গেছে, পায়ে কাটা জখম। সেই জখম নিয়ে দাঁড়াতে পারে না জুলিয়ানে। এক পায়ে স্যান্ডেল আছে, আরেক পা খালি। চশমাও হারিয়ে গেছে। সে বুঝতে পারে যে তার বাঁ চোখে আঘাত লাগায় সেটা ফুলে বন্ধ হয়ে গেছে। যেহেতু চশমা নেই, তাই ডান চোখের সরু ফাঁক দিয়ে একটু দেখা যাচ্ছে, ঝাপসা।
চশমা নেই, তাই স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এই বন তো জাগুয়ার আর বিষধর সাপে ভরা। এসব চিন্তা করে জুলিয়ানের ভয় পাওয়ার কথা। ভয় পেলেও সে কাঁদল না। বরং নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। তার কাছে খাওয়ার মতো ছিল শুধু একটি ছোট্ট ব্যাগে কয়েকটি ক্যান্ডি (যা চতুর্থ দিনে শেষ হয়ে যায়)।
জুলিয়ানে বলে, ‘সকালে মাথা ঘোরানো শুরু হলে মাটিতে শুয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর হাঁটু গেড়ে বসতে পারি, কিন্তু আবার শুয়ে পড়তে হয়। চার হাত–পায়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে মাকে খুঁজি। তাঁর নাম ধরে ডাকি। কিন্তু জঙ্গল ছাড়া আর কেউ উত্তর দেয় না।’
গহিন জঙ্গলে একা
রেইনফরেস্টের বিশাল বিশাল গাছ রহস্যময় ছায়া ফেলে রাখে। সব সময় টপটপ করে পানি পড়ে। গাছপালার পচন ও বেড়ে ওঠার মিশ্রণে একধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ থাকে। ডিসেম্বরের রেইনফরেস্ট ভিজে থাকে। আর রাতে বরফঠান্ডা বৃষ্টি হতে থাকে। এসবের ভেতর নিজেকে একদম একা খুঁজে পায় জুলিয়ানে।
জঙ্গল মানেই অজানা শব্দ, পোকামাকড় আর বিপদ। কিন্তু পাঙ্গুয়ানা ইকোলজিক্যাল রিসার্চ স্টেশনে থাকার সময় জুলিয়ানের মা–বাবা তাকে টিকে থাকার উপায় শিখিয়েছিলেন। শিখিয়েছিলেন যে গহিন জঙ্গলে পায়ে পা তুলে হাঁটতে হবে; যদি পথ হারিয়ে যায়, পানির স্রোত অনুসরণ করতে হবে। জানিয়েছিলেন কোন ফল খাওয়া যাবে, কোনটা নয়; কীভাবে পানির উৎস খুঁজতে হয়। চিনিয়েছিলেন ব্যাঙের ডাক, পাখির শব্দ, জঙ্গলের শব্দ—হাঁটাহাঁটি, খসখস, শিস আর গর্জন।
এই জঙ্গলে এ সবকিছুর মুখোমুখি হতে হয় জুলিয়ানেকে। ব্যাঙের ডাক আর পাখির শব্দ শুনে সে চিনতে পারে যে এটা পাঙ্গুয়ানার শব্দ।
জুলিয়ানে বলে, ‘পাঙ্গুয়ানার পরিচিত শব্দ শুনে বুঝলাম, আমি একই জঙ্গলে আছি। জঙ্গল সম্পর্কে এমন প্রায় কিছুই ছিল না যা আমার মা–বাবা আমাকে শেখাননি। এমন পরিস্থিতিতে শুধু মাথার ভেতর সেই জ্ঞান খুঁজে নিতে হচ্ছিল।’
জুলিয়ানে বাবার অবস্থান থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। কিন্তু একবার ভুল পথে গেলে, সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জঙ্গলের আরও গভীরে হারিয়ে যেতে পারত। তাই খুব সতর্কতার সঙ্গে তাকে এগোতে হচ্ছিল। সে বলেন, ‘একসময় ভীষণ তৃষ্ণা পায়। চারপাশের পাতায় জমা ফোঁটা ফোঁটা পানি চেটে খাই। আশপাশে ছোট বৃত্তে হাঁটি। জানি, জঙ্গলে দিক হারানো খুব সহজ। তাই একটি গাছের চিহ্ন মনে রেখে অবস্থান ঠিক রেখেছি। কোথাও বিমানের কোনো ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাইনি। কোনো মানুষ নেই। শুধু কয়েকটি ক্যান্ডিসহ ছোট্ট একটা ব্যাগ কুড়িয়ে পেয়েছি। সেখান থেকে ক্যান্ডি খেয়েছি।’
একসময় মাথার ওপর দিয়ে যাওয়া উদ্ধারকারী বিমানের শব্দ শুনতে পায় জুলিয়ানে। কিন্তু গাছ এত ঘন যে ওপরে পাতা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। এখান থেকে কাউকে সংকেত দেওয়ারও উপায় নেই। সে ভাবতে থাকে, এই জঙ্গল ছেড়ে বের হতেই হবে, যাতে উদ্ধারকারীরা তাকে দেখতে পান। এরপর সে পানি গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পায়। শব্দ শুনে এগোতে গিয়ে দেখে, একটি ঝরনা ছোট একটি খালে গিয়ে মিশেছে। এটা দেখে আশায় বুক ভরে যায় তার। কারণ, সে জানত যে শুধু পানি নয়, এই খাল হয়তো তাকে উদ্ধার পর্যন্ত নিয়ে যাবে। এই খাল ধরে এগোলে একসময় মানুষ পাওয়া যেতে পারে।
সামনে পথের দেখা
জুলিয়ানে খালের ধার ধরে হাঁটার চেষ্টা করে। কিন্তু পড়ে থাকা গাছ বা ঝোপঝাড় বারবার তার পথ আটকে দেয়। সামনের দিকে খালের প্রশস্ততা আরও বেশি, স্রোতও বেশি। অনেক জায়গায় পানি কম থাকায় হাঁটা সহজ হয়।
২৮ ডিসেম্বর জুলিয়ানের নানির দেওয়া উপহার হাতঘড়িটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দিন গুনে চলতে হয় তাকে। খালটি পরিণত হয় বড় নদীতে। সে সময় বর্ষাকাল চলছিল। টানা বৃষ্টি হচ্ছিল। সন্ধ্যা ছয়টার দিকেই অন্ধকার নেমে আসে। খালের ধারে নিরাপদ জায়গা খুঁজে রাত কাটাত সে। আগুন জ্বালানোর মতো শুকনা কিছুই ছিল না। কোনো গাছে ফলও ছিল না।
‘জঙ্গলের অনেক গাছ বিষাক্ত। তাই যা চিনি না, তাতে হাত দিইনি। শেষ ক্যান্ডিটুকুও খেয়ে ফেলেছি। ছুরি নেই, তাই পামগাছের ভেতর থেকে খাবার বের করতে পারি না। মাছ ধরতে বা কিছু রান্না করতেও পারি না। অচেনা কিছু খেতে ভয় পাই—জঙ্গলের অনেক কিছুই বিষাক্ত। তাই শুধু নদীর পানি পান করেছি।’ আমাজনের গহিন জঙ্গলে কাটানো চতুর্থ দিনের অভিজ্ঞতা এভাবেই জানিয়েছে জুলিয়ানে।
আমাজনের গহিন জঙ্গলে একা একা খুব ভয় না পেলেও চতুর্থ দিনে রাজশকুনের ডাক শুনে আতঙ্কিত হয়েছিল জুলিয়ানে। রাজশকুন সাধারণত তখনই জড়ো হয়ে আর্তচিৎকার করে, যখন কোথাও মৃত্যু ঘটে। এই পাখির ডাক তাকে এক ভয়াবহ দৃশ্যের দিকে নিয়ে যায়। সে এগিয়ে দেখে, তারই বিমানের মৃত তিনজন যাত্রী। আসনের সঙ্গে সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থায় ওপর থেকে আছড়ে পড়েছিলেন মাটিতে। তাঁদের একজন নারী। জুলিয়ানের মায়ের কথা মনে পড়তে থাকে। নিশ্চিত হতে ওই নারীর পায়ের নখের দিকে তাকায় সে।
জুলিয়ানে বলে, ‘ওই নারীর নখে নেইলপলিশ ছিল। এটা দেখে গভীর শ্বাস নিই। কারণ, আমার মা কখনো নেইলপলিশ দিতেন না।’
আশার আলো
২৯ বা ৩০ ডিসেম্বর, পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিন হোয়াটজিন পাখির ডাক শুনে মন চনমনে হয়ে ওঠে জুলিয়ানের। এই পাখি শুধু উন্মুক্ত পানির কাছেই বাসা বাঁধে, যেখানে মানুষ থাকে। পাঙ্গুয়ানায় সে বহুবার এই পাখির ডাক শুনেছে।
জুলিয়ানে বলে, ‘নতুন উদ্যমে এগোতে এগোতে বড় একটি নদীর তীরে পৌঁছাই, কিন্তু সেখানে কেউ নেই। দূরে বিমানের শব্দ শুনি, কিন্তু তা মিলিয়ে যায়। মনে হয়, সবাইকে উদ্ধার করে তারা ফিরে গেছে, আমি বাদ পড়েছি। রাগ হয় ভীষণ। এত দিন পর খোলা জায়গায় আসার পরও তারা কীভাবে ফিরে যায়? হতাশ হয়ে পড়ি। তবু হাল ছেড়ে দিইনি। কারণ আমি জানি, নদী যেখানে আছে, মানুষ সেখান থেকে দূরে থাকতে পারে না।’
নদীর তীর এতটাই ঝোপঝাড়ে ভরা যে হাঁটা কঠিন। নদীর ধারে বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত স্টিং গ্রে মাছ থাকে, তাই সাবধানে চলতে হয় জুলিয়ানেকে। স্টিং গ্রে মাঝনদীতে থাকে না, এ কারণে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে মাঝনদীতে সাঁতার কাটবে। কিন্তু সেখানে তো পিরানহা থাকে! বাবা বলেছিলেন যে পিরানহা চলমান পানিতে বিপজ্জনক নয়। কুমির গোত্রের নিশাচর ও মাংসাশী কাইম্যানের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ও ছিল জুলিয়ানের। তবে তারা সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না। এসব ভেবে মাঝনদীতে নেমে পড়েন সে। আশা, যদি একবার মানুষের নজরে পড়া যায়, তাহলেই কেবল উদ্ধার সম্ভব হবে।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঘুমানোর নিরাপদ জায়গা খুঁজতে হয় জুলিয়ানেকে। মশা ও ছোট ছোট মাছি কানে–নাকে ঢুকতে চায়। বৃষ্টি হলে অবস্থা আরও খারাপ—বরফশীতল ফোঁটা গায়ে পড়ে পাতলা জামা ভিজে যায়। বাতাসে কাঁপতে থাকে সে। গাছ বা ঝোপের নিচে গুটিসুটি হয়ে বসে নিজেকে সম্পূর্ণ একা মনে হতে থাকে জুলিয়ানের।
অসহ্য যন্ত্রণা ও দৃঢ়তা
সাঁতার কাটতে কাটতে শক্তি কমে যাচ্ছিল জুলিয়ানের। প্রচুর পানি পান করলেও খাবারের অভাবে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। একদিন সকালে পিঠে তীব্র ব্যথা অনুভব করে সে। ছুঁয়ে দেখে, হাতে রক্ত লেগে যায়। সূর্যের তাপে তার পিঠের চামড়া পুড়ে গেছে। পরে জানতে পারে যে সেটা ছিল দ্বিতীয় মাত্রার পোড়া ক্ষত।
একসময় চোখ আর কান বিভ্রম সৃষ্টি করে জুলিয়ানের। মনে হতে থাকে, নদীর ধারে বাড়ির ছাদ দেখছে বা মুরগির ডাক শুনছে। ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে জুলিয়ানে।
রোদে পুড়ে, অনাহারে দুর্বল হয়ে দশম দিনে জুলিয়ানে প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিল। স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল সে। হঠাৎ চোখ খুলে দেখে একটি নৌকা। দীর্ঘক্ষণ সাঁতরে সেখানে গিয়ে নৌকা ধরে দাঁড়িয়ে দেখে, একটু দূরে চরে একটি ছোট আশ্রয়কেন্দ্র।
জুলিয়ানে বলে, ‘ছোট্ট ওই আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখি, কেউ নেই। রাতে সেখানেই থাকি। পরদিন বৃষ্টি নামে। ত্রিপল জড়িয়ে পড়ে থাকি। বিকেলে বৃষ্টি থামে। আমি আর দাঁড়াতে পারি না। ভাবি, আর এক দিন বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার চলব। ভেতরে একটি পেট্রলের ক্যান পেয়েছিলাম। কাঁধের ক্ষতে পচন ধরায় সেখানে পোকা ঢুকেছিল। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল। বাবা যেমন পোষা প্রাণীর ক্ষতে পেট্রল দিয়ে ক্ষত সারাতেন, ঠিক সেভাবে আমিও কাঁধের ক্ষতে পেট্রল ঢেলেছিলাম। এতে প্রায় ৩০টি পোকা বের করেছিলাম। একটু আরাম হয়েছিল।’
পরদিন তিনজন পুরুষের কণ্ঠ শুনে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসে জুলিয়ানে। তাঁরা ছিলেন মূলত স্থানীয় পেরুভিয়ান জেলে। ১০ দিনে কঙ্কালসার হওয়া, নোংরা, স্বর্ণকেশী জুলিয়ানেকে দেখে ভয়ে আঁতকে ওঠেন তাঁরা। জেলেরা ভেবেছিলেন, জুলিয়ানে হয়তো কোনো জলদেবী; ডলফিন আর ফর্সা নারীর মিশ্র কোনো কিংবদন্তি চরিত্র।
বেঁচে থাকার শেষ চাবিটিও জুলিয়ানেকে দিয়েছিলেন তার মা–বাবা। আর সেটি হলো স্প্যানিশ ভাষা শেখানো। জেলেদের মতিগতি বুঝতে পেরে সে তাঁদের স্প্যানিশ ভাষায় বলে, ‘আমি জুলিয়ানে। আমি ল্যানসা দুর্ঘটনার যাত্রী।’ অবশেষে তার কথা বুঝতে পারেন জেলেরা।
রেইনফরেস্টের পর
ল্যানসা ফ্লাইটের একমাত্র বেঁচে যাওয়া যাত্রী জুলিয়ানে কোয়েপক অবশেষে ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি মানুষের দেখা পায়। টানা ১১ দিন জঙ্গলে বেঁচে থাকার পর তাঁদের সহায়তায় সে নিরাপদে লোকালয়ে ফিরে আসে।
জুলিয়ানে পরে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাদুড় নিয়ে গবেষণা করে খ্যাতিমান বিজ্ঞানী হন। ১৯৮৯ সালে তিনি এরিখ ডিলার নামের পিঁপড়া প্রজনন–বিশেষজ্ঞকে বিয়ে করেন। বর্তমানে ৭১ বছর বয়সী জুলিয়ানে একজন জীববিজ্ঞানী ও জার্মানির বাভারিয়ান স্টেট কালেকশন অব জুলজির গ্রন্থাগারিক। পাশাপাশি যে বন তাঁদের বদলে দিয়েছিল, সেই বনেই তাঁর মা–বাবার প্রতিষ্ঠা করা পাঙ্গুয়ানা ইকোলজিক্যাল রিসার্চ স্টেশন পরিচালনা করছেন তিনি।
বছরের পর বছর ধরে জুলিয়ানে বুঝতে চেয়েছেন, কীভাবে তিনি ল্যানসা ফ্লাইট ৫০৮–এর একমাত্র জীবিত মানুষ হলেন। আর কীভাবেই বা আমাজনের গহিন জঙ্গলে একা একা বেঁচে গিয়েছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা তাঁর কাছে।
তথ্যসূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট, দ্য টেলিগ্রাফ, বিবিসি, এবিসি নিউজ