কলমের বিচিত্র ইতিহাস: রিড পেন থেকে স্পেস পেন

একদিন টেবিলে বসে পড়তে গিয়ে তুমি হঠাৎ খেয়াল করলে তোমার কলমের কালি শেষ। খুঁজতে গিয়ে দেখলে ঘরে আর একটিও কলম নেই। তাই বের হলে নতুন কলম কিনতে। কিন্তু বাইরে গিয়ে দেখলে, সব দোকান বন্ধ! অনেক খুঁজেও কোনো খোলা দোকান পেলে না। ফেরার পথে হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগল, যখন কলম ছিল না, তখন মানুষ কীভাবে লিখত? তাদেরও কি লেখার জন্য এমন ঝামেলা পোহাতে হতো? চলো, জেনে নেওয়া যাক কলমের শুরুর দিকের গল্প।

মানুষ যখন নিজের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সংরক্ষণ করার প্রয়োজন অনুভব করল, তখন থেকেই লেখার প্রয়োজন দেখা দেয়। আর সেই প্রয়োজন থেকেই একসময় সৃষ্টি হলো কলম। প্রাচীন যুগের খুবই সরল লেখনী থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক কলম, সবই এসেছে দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কলম কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আমরা সব সময় বুঝতে পারি না। সাধারণত প্রয়োজন না হলে আমরা কলমের কথা ভাবিই না। কিন্তু যখন হঠাৎ লিখতে বসি এবং কলম খুঁজে পাই না, তখনই বুঝি এর প্রয়োজন কতটা। আজকাল আমরা যে কলমগুলো ব্যবহার করি, সেগুলোর বেশির ভাগই সস্তা প্লাস্টিকের বলপয়েন্ট কলম। তবে এ ছাড়া অনেকের কাছে থাকে সুন্দর ও মসৃণ লেখার ফাউন্টেন পেন বা বিশেষ ধরনের কলম। কলম মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা জ্ঞান সংরক্ষণ করতে পারি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নানা তথ্য লিখে রেখে যেতে পারি।

আরও পড়ুন

প্রাচীনকালে মানুষ মূলত মুখে মুখে কথা বলেই তথ্য আদান–প্রদান করত। তাই তখন কিছু লিখে রাখার প্রয়োজন তেমন ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলাতে শুরু করে। মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে থাকে, বাণিজ্য শুরু হয়, খাদ্য সংরক্ষণ ও লেনদেন বাড়তে থাকে। তখন তথ্য লিখে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়।

মানুষ বিভিন্ন প্রতীক ও চিহ্ন ব্যবহার করে নিজের ভাব প্রকাশ করতে শুরু করে। এভাবেই ধীরে ধীরে লিখিত ভাষার জন্ম হয়। লেখার প্রাচীনতম রূপগুলোর একটি হলো কিউনিফর্ম। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরাক) সুমেরীয়রা এই পদ্ধতিতে লিখত। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষি উৎপাদন বাড়ার ফলে উদ্বৃত্ত খাদ্যের বাণিজ্য শুরু হয়। তখন শস্যের হিসাব রাখা, শ্রমিকদের মজুরি লিপিবদ্ধ করা এবং বিভিন্ন লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজন থেকেই লেখার ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।

রিড পেন

ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৩২০০ সালে মিসরীয়রা প্রথম কলম ব্যবহার শুরু করে। তারা নলখাগড়া বা বাঁশের কঞ্চি কেটে তৈরি করত রিড পেন। এটিই ইতিহাসের প্রথম কলম হিসেবে ধরা হয়। মিসরীয়রা কঞ্চির একপাশ তির্যকভাবে কেটে সরু ও তীক্ষ্ণ করত। তারপর সেই ডগা দিয়ে লেখা হতো। কালি হিসেবে ব্যবহার করা হতো কালো রঙের মাটি, আঠা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান। কখনো গাছের রস থেকেও কালি তৈরি করা হতো।

এই কালি দিয়ে তারা লিখত প্যাপিরাসে। প্যাপিরাস তৈরি হতো সাইপেরাস প্যাপিরাস নামের একধরনের উদ্ভিদ থেকে। একে অনেক সময় কাগজের উদ্ভিদও বলা হয়। প্যাপিরাস ছিল কাগজের মতো একধরনের পাতলা বস্তু, যার ওপর মিসরীয়রা বিভিন্ন প্রতীক ও চিত্র আঁকত। মধ্যযুগ পর্যন্ত লেখার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।

আরও পড়ুন

কুইল পেন

খ্রিষ্টীয় ৬০০ সালের আগপর্যন্ত রিড পেনই বেশি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এর স্থায়িত্ব কম ছিল। তাই পরে তৈরি হয় কুইল পেন।

কুইল পেন সাধারণত রাজহাঁস বা বড় পাখির ডানার পালক দিয়ে তৈরি করা হতো। এই কলমগুলো রিড পেনের তুলনায় বেশি সুবিধাজনক ছিল। কারণ, এগুলো পার্চমেন্ট কাগজ বা প্রাণীর চামড়ায় লেখা সহজ করত। এ ছাড়া কুইল পেনের ডগা সূক্ষ্ম হওয়ায় ছোট অক্ষর ও সূক্ষ্ম নকশা আঁকা সম্ভব হতো।

ইংরেজি পেন শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ পেন্না (Penna) থেকে, যার অর্থ ‘পাখির পালক’। তাই কুইল পেনকে অনেক সময় পালকের কলমও বলা হয়।

স্টিল নিব কলম

শিল্পবিপ্লবের সময় নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়, যা ব্যাপক পরিমাণে পণ্য উৎপাদনকে সহজ করে তোলে। তখনই ধাতব নিব তৈরি শুরু হয়। জন মিচেল নামে এক ব্যক্তি ইস্পাতের নিব ব্যাপক পরিমাণে তৈরি করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এরপর ১৮২৫ সালে তাঁর ভাই উইলিয়াম মিচেল ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে ইস্পাত নিব তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। স্টিল নিব কুইল পেনের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই ছিল। এগুলো সস্তায় এবং দ্রুত তৈরি করা যেত। তাই ধীরে ধীরে কুইল পেনের ব্যবহার কমে যায়।

তবে এই কলম ব্যবহার করতে হলে নিবকে বারবার কালির দোয়াতে ডুবাতে হতো। স্টিল নিব কলম মূলত সুন্দর ক্যালিগ্রাফি ও আঁকার কাজে বেশি ব্যবহৃত হতো।

আরও পড়ুন
পাইলট কাস্টম ৮২৩ ফাউন্টেন পেন নামের এই কলমটির নিবে রয়েছে ১৪ ক্যারেটের সোনার প্রলেপ।
ছবি: প্রথম আলো

ফাউন্টেন পেন

১৮২৭ সালে রোমানিয়ার উদ্ভাবক পেট্রাচে পোয়েনারু প্রথম ফাউন্টেন পেন তৈরি করেন। তিনি এটিকে বর্ণনা করেছিলেন ‘নিজস্ব কালি বহনকারী পোর্টেবল কলম’ হিসেবে। তবে প্রথম দিকের ফাউন্টেন পেনে কালি লিক করার সমস্যা ছিল। ১৮৮৪ সালে লুইস এডসন ওয়াটারম্যান আধুনিক কার্যকর ফাউন্টেন পেন তৈরি করেন এবং সেটির পেটেন্ট নেন।

ফাউন্টেন পেনের বিশেষত্ব হলো এতে কলমের ভেতরেই কালি সংরক্ষণ করা থাকে। ফলে বারবার কালিতে ডুবাতে হয় না। কাগজে ছোঁয়ালেই নিবের মাধ্যমে কালি বের হয়ে আসে। কিছু দামি ফাউন্টেন পেনে স্বর্ণের নিব ব্যবহার করা হয়, যার ফলে লেখা খুবই মসৃণ হয়।

আরও পড়ুন
বলপয়েন্ট কলম
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

বলপয়েন্ট কলম

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফাউন্টেন পেনের জায়গা দখল করতে শুরু করে বলপয়েন্ট কলম। ১৯৩০-এর দশকে হাঙ্গেরীয় সাংবাদিক লাসজলো বিরো লক্ষ করেন, সাধারণ কালি শুকাতে সময় নেয় এবং দাগ পড়ে যায়। তাই তিনি এমন একটি কলম তৈরির চেষ্টা করেন, যার কালি দ্রুত শুকিয়ে যাবে। পরে একজন আমেরিকান উদ্ভাবকের সহায়তায় তিনি বলপয়েন্ট কলম তৈরি করেন।

এই কলমের নিবে একটি ছোট বল থাকে, যা ঘুরতে ঘুরতে কাগজে কালি ছড়িয়ে দেয়। ফলে কালি দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং দাগ পড়ে না।

কিছু বিশেষ কলম

ইতিহাসে ব্যবহৃত সাধারণ কলম ছাড়াও কিছু বিশেষ ধরনের কলম রয়েছে।

স্পেস পেন

সাধারণ কলম মহাকাশে ঠিকভাবে কাজ করে না, কারণ সেখানে অভিকর্ষ বল নেই। এই সমস্যার সমাধান করতে পল ফিশার ১৯৬০-এর দশকে তৈরি করেন ফিশার স্পেস পেন।

এই কলম দিয়ে শুধু মহাকাশেই নয়, সমুদ্রের গভীর তলদেশেও লেখা যায়। এটি মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে।

পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কলম

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দামি কলমগুলোর একটি হলো ফুলগর নকটারনাস। ইতালীয় কোম্পানি টিবাল্ডি এটি তৈরি করেছে। হীরা ও মূল্যবান রত্ন দিয়ে তৈরি এই কলমটি ২০২০ সালে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছিল।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কলম

২০১১ সালে ভারতের আচার্য মাকুনুরি শ্রীনিবাস প্রায় ১৮ ফুট উঁচু এবং ৩৭ কেজি ওজনের একটি বিশাল কলম তৈরি করেন। এটি ২০১১ সালের ২৪ এপ্রিল গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান পায়।

আরও পড়ুন