স্তন্যপায়ীরা কেন সাপ, পাখি বা মাছের মতো রঙিন না

স্তন্যপায়ী প্রাণী তুলনামূলকভাবে বেশ সাদামাটাছবি: পিপল ডটকম/ ডালাস জু

সাপ, পাখি ও মাছের শরীরে আমরা প্রায়ই উজ্জ্বল রং দেখি। গোলাপি, গাঢ় বেগুনি বা নানা ঝলমলে রং এদের। কিন্তু বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণী তুলনামূলকভাবে বেশ সাদামাটা। এদের লোম সাধারণত বাদামি, কালো বা ধূসর। স্তন্যপায়ীরা অন্য প্রাণীদের মতো এত রঙিন নয় কেন?

এর পেছনে কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। প্রথম কারণটি হলো প্রাণীদের শরীরে রং তৈরি হওয়ার পদ্ধতি। বেলজিয়ামের ঘেন্ট ইউনিভার্সিটির বিবর্তনবিদ ম্যাথিউ শকি বলেন, প্রাণীদের শরীরে সাধারণত দুইভাবে রং তৈরি হয়। রঞ্জক পদার্থ ও গঠনগত রং।

রঞ্জক পদার্থ প্রাণীর ত্বক বা শরীরের আবরণে থাকে। আলো শোষণ বা প্রতিফলনের মাধ্যমে বিভিন্ন রং তৈরি করে। অন্যদিকে গঠনগত রং তৈরি হয় ত্বক, পালক বা আঁশের ওপর অতি ক্ষুদ্র বা ন্যানো-গঠনের মাধ্যমে। এসব গঠন আলোকে এমনভাবে ভেঙে দেয় যে উজ্জ্বল ও ঝলমলে রং দেখা যায়।

কিন্তু স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, এরা এই দুই ব্যবস্থার কোনোটিই খুব বেশি ব্যবহার করতে পারে না। অনেক প্রাণীর শরীরে নানা ধরনের রঞ্জক পদার্থ থাকে। যেমন ক্যারোটিনয়েড, পোরফিরিন বা পেটরিন। কিন্তু স্তন্যপায়ীদের শরীরে মূলত একটি রঞ্জক মেলানিনই থাকে। এই মেলানিন থেকেই স্তন্যপায়ীদের শরীরে দেখা যায় কালো, বাদামি বা ধূসর রং। আর যেখানে মেলানিন থাকে না, সেখানে সাদা রং তৈরি হয়। যেমন জেব্রা বা পান্ডার শরীরে দেখা যায়।

আরও পড়ুন

স্তন্যপায়ীদের লোমের গঠনও উজ্জ্বল রং তৈরিতে বাধা দেয়। পাখির পালক, মাছের আঁশ বা সরীসৃপের ত্বক তুলনামূলকভাবে জটিল গঠনযুক্ত। তাই সেখানে আলো ভেঙে উজ্জ্বল রং তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রাণীর পশমের গঠন এত জটিল নয়। ফলে এতে সেই সূক্ষ্ম ন্যানো-গঠন তৈরি হয় না, যা উজ্জ্বল গঠনগত রং তৈরি করতে পারে।

কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। যেমন ম্যানড্রিল নামের বানরের মুখে উজ্জ্বল লাল ও নীল রং দেখা যায়। তবে এই রংগুলো শরীরের সেই অংশে থাকে, যেখানে লোম নেই। আবার অলস প্রাণী স্লথের শরীরে কখনো সবুজাভ রং দেখা যায়। কিন্তু এটি আসলে এদের লোমে জন্মানো শৈবালের কারণে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনের কারণ জানতে বহু আগে ফিরে যেতে হবে। স্তন্যপায়ী প্রাণীরা যখন প্রথম পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়, তখন ডাইনোসররা ছিল প্রধান শিকারি। তাই বেঁচে থাকার জন্য স্তন্যপায়ীদের অনেকেই রাতের বেলা সক্রিয় ছিল। এই দীর্ঘ সময় প্রায় ১০ কোটি বছর রাতে বসবাস করার ফলে এদের শরীরে উজ্জ্বল রঙের আর প্রয়োজন ছিল না। বরং গাঢ় বা মাটির মতো রং এদের লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করত।

আরও পড়ুন
রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাংলার বাঘ
ছবি: সংগৃহীত

২০২৫ সালে সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গবেষকেরা জুরাসিক ও ক্রিটেশিয়াস যুগের কয়েকটি স্তন্যপায়ী জীবাশ্মের রং সংরক্ষণকারী গঠন বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা দেখেন, ওই সব প্রাচীন স্তন্যপায়ীর রং ছিল মূলত বাদামি বা ধূসর।

আজ পৃথিবীতে ছয় হাজারের বেশি স্তন্যপায়ী প্রজাতি রয়েছে। অনেকেই দিনে সক্রিয়। অনেকেই আর প্রাকৃতিক শিকারি নয়। তবু বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী এখনো বাদামি, ধূসর বা কালো রঙের রয়ে গেছে।

স্তন্যপায়ীর সাদামাটা রঙের আরেকটি কারণ হলো দৃষ্টিশক্তি। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির আচরণগত পরিবেশবিদ টেড স্ট্যানকোইচ বলেন, ‘অনেক স্তন্যপায়ীর রং দেখার ক্ষমতা সীমিত। ডাইনোসরের যুগে রাতে ভালোভাবে দেখার জন্য এরা সম্ভবত কিছু রং দেখার ক্ষমতা হারিয়েছিল।’ বেশির ভাগ স্তন্যপায়ীর চোখে মাত্র দুই ধরনের কোন কোষ থাকে। যাকে বলা হয় ডাইক্রোমেটিক দৃষ্টি। ফলে এরা লাল, কমলা বা বেগুনির মতো অনেক রং স্পষ্টভাবে দেখতে পারে না।

এ কারণেই প্রাণীদের মধ্যে রঙের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো হলো সঙ্গীকে আকর্ষণ করা, সতর্কবার্তা দেওয়া বা শত্রুর কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা। এগুলো স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে কাজ করে।

আরও পড়ুন

উদাহরণ হিসেবে বাঘকে ধরা যায়। মানুষের চোখে বাঘ কমলা রঙের দেখালেও অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর কাছে এই রং সবুজের মতো লাগে। ফলে ঘাসের মধ্যে বাঘ খুব সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে।

উজ্জ্বল রঙের বদলে অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী বিপরীত রঙের নকশা ব্যবহার করে যোগাযোগ করে। যেমন স্কাঙ্ক বা পোলক্যাট কালো-সাদা ডোরার মাধ্যমে শত্রুকে সতর্ক করে। এ সতর্কতা যেন বলে, আমরা কিন্তু দুর্গন্ধ ছড়াতে পারি। আবার আফ্রিকান বুনো কুকুরের লেজের সাদা অংশ শিকার করার সময় সঙ্গীদের সংকেত দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। প্রাইমেটদের মধ্যে মানুষ, কিছু বানর ও বেবুনের রং দেখার ক্ষমতা তুলনামূলক ভালো। তাই তাদের মধ্যে উজ্জ্বল নীল বা লাল রং দেখা যায়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও কিছু অদ্ভুত বিষয় জানা গেছে। অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী অতিবেগুনি আলোতে হালকা জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠে। যদিও মানুষের চোখে তা দেখা যায় না। তবে ভালো করে খুঁজলে স্তন্যপায়ীদের মধ্যে বেশ কিছু রং খুঁজে পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন গবেষকেরা।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন