চাঁদে নেমে নভোচারীরা আসলে কী বলেছিলেন
১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। পৃথিবীর মানুষ সেই রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অন্য রকম উত্তেজনায়। কারণ, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষ চাঁদের মাটিতে নামতে যাচ্ছে। মিশনের নাম ছিল অ্যাপোলো–১১। তিনজন নভোচারী এ অভিযানে ছিলেন নীল আর্মস্ট্রং, বাজ আলড্রিন ও মাইকেল কলিনস।
পৃথিবী থেকে প্রায় আড়াই লাখ মাইল দূরে, চাঁদের একটি সমতল এলাকায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ছোট্ট লুনার মডিউল ‘ইগল’। পৃথিবীতে তখন সবাই রেডিওতে শুনছে তাঁদের কথা। উত্তেজনায় যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল অনেকের। রেডিওতে শোনা গেল, ‘ইগল নেমেছে।’ অবশেষে সেই মুহূর্ত এল।
চাঁদের মাটি স্পর্শ করতেই নিল আর্মস্ট্রং পৃথিবীর দিকে বার্তা পাঠালেন—Houston, Tranquillity Base here. The Eagle has landed. মানে ‘হিউস্টন, এখানে ট্র্যাঙ্কুইলিটি বেজ। ইগল নেমে গেছে।’
হিউস্টনের কন্ট্রোল রুমে তখন যেন স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল। যোগাযোগ কর্মকর্তা উত্তর দিলেন—We copy you on the ground...We’re breathing again. এতক্ষণ সবাই দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছিল। এখন যেন আবার শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে।
অবতরণের সময় কিন্তু সবকিছু একেবারে সহজ ছিল না। পরে আর্মস্ট্রং জানান, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তাঁদের এমন এক জায়গায় নামাতে যাচ্ছিল, যেখানে বড় বড় পাথর আর গর্ত ছিল। তাই তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন। পাথরে ভরা জায়গার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে তিনি একটু সমতল জায়গা খুঁজে নামান লুনার মডিউলটি।
পৃথিবী থেকে প্রায় আড়াই লাখ মাইল দূরে, চাঁদের একটি সমতল এলাকায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ছোট্ট লুনার মডিউল ‘ইগল’।
চাঁদের মাটি কেমন, তা জানার জন্য সবাই আগ্রহ নিয়ে রেডিও শুনছিল। বাজ অলড্রিন বললেন, চারপাশে নানা ধরনের পাথর দেখা যাচ্ছে। কোনোটি কোনাকৃতি, কোনোটি দানাদার। রং খুব স্পষ্ট নয়, তবে কিছু পাথরে আলাদা ঝিলিক আছে।
অবতরণের প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর আর্মস্ট্রং বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। ছোট্ট সিঁড়ি বেয়ে নামছেন তিনি। পৃথিবীর মানুষ টেলিভিশনে দেখছে সেই দৃশ্য। তিনি বললেন—I’m at the foot of the ladder. তারপর তিনি ধীরে ধীরে চাঁদের মাটিতে পা রাখলেন। আর বললেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বাক্যটি—That’s one small step for a man, one giant leap for mankind. বাংলায় যার অর্থ, ‘একজন মানুষের জন্য এটি ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিশাল লাফ।’
চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটতে গিয়ে আর্মস্ট্রং দেখলেন, চাঁদের মাটি খুব সূক্ষ্ম, প্রায় পাউডারের মতো। তিনি বললেন, জুতার নিচে মাটি লেগে থাকে। যেন কয়লার গুঁড়া। পায়ের ছাপও পরিষ্কার দেখা যায়। চাঁদের মাটিতে চলাফেরা করা খুব কঠিন ছিল না। কারণ, চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ। তাই একটু লাফ দিলেই অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া যায়।
এর কিছুক্ষণ পর বাজ অলড্রিনও মডিউল থেকে বের হয়ে এলেন। চারদিকে তাকিয়ে তিনি বললেন—Beautiful view. দারুণ সুন্দর দৃশ্য। চাঁদের দৃশ্য দেখে আর্মস্ট্রং বললেন—It has a stark beauty all its own...very pretty out here. মানে চাঁদের সৌন্দর্য আলাদা। খুব নির্জন, খুব কঠিন, তবু অদ্ভুত সুন্দর।
তাঁরা চাঁদের মাটিতে নানা বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বসান। পাথর ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন এবং একটি পতাকা স্থাপন করেন। লুনার মডিউলের গায়ে একটি ফলকও লাগানো ছিল।
তাঁরা চাঁদের মাটিতে নানা বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বসান। পাথর ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন এবং একটি পতাকা স্থাপন করেন। লুনার মডিউলের গায়ে একটি ফলকও লাগানো ছিল। সেখানে লেখা ছিল, ‘পৃথিবী গ্রহের মানুষ প্রথমবারের মতো এখানে চাঁদের মাটিতে পা রাখল—জুলাই ১৯৬৯। আমরা এসেছি পুরো মানবজাতির শান্তির জন্য।’
এ সময় তৃতীয় নভোচারী মাইকেল কলিনস চাঁদের কক্ষপথে ঘুরছিলেন কমান্ড মডিউল ‘কলম্বিয়া’তে বসে। পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগে তিনি শুধু বলেছিলেন—This is history. সত্যিই এটা ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।