প্রকৃতিকে যেভাবে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন ডেভিড অ্যাটেনবরো

বিবিসি

জীবনে কখনো কখনো এমন মুহূর্ত আসে, যা সারা জীবন আমাদের বয়ে বেড়াতে হয়। ছোটবেলার এক স্মৃতি গড়ে তোলে পুরো জীবনের ভিত। ডেভিড অ্যাটেনবরোর জীবনে এমন এক মুহূর্ত এসেছিল। খুব ছোটবেলায়, যখন তিনি কেবল এক কৌতূহলী কিশোর ছিলেন। সময়টা উনিশ শতকের ত্রিশের দশকের শেষ ভাগ। ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলের পথে সাইকেল চালিয়ে তিনি গিয়েছিলেন এক খোলা পাথুরে জায়গায়। চারপাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ছিল পাথরের টুকরা। আর সেগুলোর ভেতরে লুকিয়ে ছিল কোটি বছরের ইতিহাস। তখনো তিনি পুরোটা জানতেন না; কিন্তু এগুলোর প্রতি টান অনুভব করেছিলেন।

নিচু হয়ে একটি পাথর তুলে নিয়েছিলেন অ্যাটেনবরো। সঙ্গে থাকা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে সেটিকে ভেঙে ফেললেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সময় যেন থমকে দাঁড়াল। পাথরের ভেতরে ফুটে উঠল এক নিখুঁত সর্পিল খোলস। দেখতে চকচকে, মসৃণ, যেন সদ্য পালিশ করা হয়েছে। পরে তিনি সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে লিখেছিলেন, ‘দুই কোটি বছর আগে এর ভেতরের প্রাণীটি মারা গিয়েছিল। সেই বস্তুটি প্রথমবার দেখল আমার চোখ।’ এ ভাবনাটিই তাঁকে শিহরিত করেছিল। তিনি যেন সময়ের এক অদৃশ্য দরজা খুলে ফেলেছিলেন।

এই জীবাশ্মটি ছিল একটি অ্যামোনাইট। হাতের তালুর সমান আকারের এই জীবাশ্মের সর্পিল খোলসের কারণে একসময় অনেকেই একে সাপের জীবাশ্ম ভেবে ভুল করত। কিন্তু আসলে এটি ছিল সমুদ্রের প্রাণী। আধুনিক নটিলাসের মতো একধরনের নরমদেহী জীব। যারা বহু কোটি বছর আগে প্রাচীন সাগরে সাঁতার কাটত।

এই একটি জীবাশ্ম অ্যাটেনবরোর মনে এমন এক আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যা আর কখনো নেভেনি। তিনি নিজেই বলেছেন—এটি তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আর সেই মুহূর্তের উত্তেজনা তিনি বারবার ফিরে পেতে চেয়েছেন জীবনের নানা সময়ে। আশ্চর্যের বিষয়, এত বছর পরও সেই অনুভূতি তাঁর কাছে একই রকম নতুন রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

কৈশোরেই তিনি নিবেদিতপ্রাণ জীবাশ্ম-সংগ্রাহকে পরিণত হন। লেস্টার অঞ্চলের আশপাশে ঘুরে বেড়িয়ে তিনি খুঁজে বেড়াতেন পাথরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অতীতের গল্প। জীবাশ্ম তাঁর কাছে শুধু পাথর নয়, সেগুলো ছিল সময়ের দূত বা ইতিহাসের সাক্ষী। অনেক বছর পর, তাঁর নিরানব্বইতম জন্মদিনের পরে লেখা এক চিঠিতে তিনি স্বীকার করেছেন—আজও জীবাশ্ম তাঁকে একই রকম আনন্দ দেয়। কীভাবে একটি সাধারণ শখ এক কিশোরকে তৈরি করে দিয়েছিল, সেটাই জানা যাবে এ লেখায়।

ডেভিড অ্যাটেনবরো
বিবিসি ওয়াল্ডলাইফ ম্যাগাজিন

ইংল্যান্ডের লেস্টার শহরে ডেভিড অ্যাটেনবরোর শৈশব কেটেছে। এখন সেই বাড়িটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। চারপাশে ছাত্রছাত্রী, গবেষণা। আধুনিক পরিবেশ। তবে এর মধ্যেই কোথায় যেন লুকিয়ে আছে সেই পুরোনো দিনের ছাপ। তাঁর পরিবারের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে পুরো এলাকায়। কাছেই আছে তাঁর ভাইয়ের নামে একটি শিল্পকেন্দ্র। আছে উঁচু একটি বিশাল ভবন। এটির নামকরণ করা হয়েছে তাঁর বাবার নামে।

পুরোনো কিছু চিঠি থেকে জানা যায় তাঁর কৈশোরের কথা। এই কিশোর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন পাথরের দিকে, জীবাশ্মর দিকে। মনে মনে স্বপ্ন দেখতেন পৃথিবীর ইতিহাস বোঝার। তাঁর বাবা নিজে এ বিষয়ে খুব বেশি জানতেন না, কিন্তু তিনি ছেলেকে বলেছিলেন, ‘জানার পথ খোলা আছে। বই আছে, জাদুঘর আছে। তোমাকে খুঁজে নিতে হবে।’ এই উৎসাহ তাঁর জন্য ছিল বড় পাওয়া।

ছোটবেলায় অ্যাটেনবরো নিজের জন্য একটি সংগ্রহশালা তৈরি করেছিলেন। তাঁর ভাষায় সেটা ছিল ‘আমার জাদুঘর’। সেখানে ছিল তাঁর সংগ্রহ করা জীবাশ্ম, প্রজাপতি, পাখির ডিম (তখন ইংল্যান্ডে পাখির ডিম সংগ্রহ করা বৈধ ছিল), পরিত্যক্ত পাখির বাসা, সাপের খোলস। এমনকি প্রাচীন ইটের টুকরাও ছিল তাঁর সংগ্রহে। এই ছোট্ট সংগ্রহশালা ছিল তাঁর ছোটবেলার গর্ব। নিজস্ব পরিচয়।

বাড়িতে আসা অতিথিদের তিনি সেই সংগ্রহ দেখাতেন গর্ব করে। একবার এক অতিথির মেয়ে তাঁর সংগ্রহ দেখে এত আগ্রহ দেখিয়েছিল, তিনি অনুভব করেছিলেন তিনি যেন হাওয়ায় ভাসছেন। পরে সেই অতিথি তাঁকে একটি পার্সেল পাঠান। সেখানে সামুদ্রিক জীবের খোলস, শুকনা মাছ, প্রাচীন মুদ্রা, পাত্রের টুকরা ও প্রবাল ছিল। প্রতিটি জিনিস আলাদা করে মোড়া। প্রতিটি যেন একেকটি অমূল্য সম্পদ। তিনি লিখেছিলেন, এটি ছিল তাঁর শৈশবের সবচেয়ে স্মরণীয় দিনগুলোর একটি।

আরও পড়ুন

১২ বছর বয়সে অ্যাটেনবরোর সংগ্রহে যোগ হয় আরেকটি আশ্চর্য জিনিস—অ্যাম্বার। জমাট বাঁধা গাছের রস, যার ভেতরে আটকে আছে পোকামাকড়। সেটি তাঁকে দিয়েছিল এক জার্মান কিশোরী, যে যুদ্ধের সময় তাঁদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই অ্যাম্বারের ভেতরে আটকে থাকা পোকামাকড় দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এরা কোন পৃথিবীর বাসিন্দা? কত পুরোনো সেই সময়? এ প্রশ্নগুলোই তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে।

কৈশোরে তিনি আরও সাহসী হয়ে ওঠেন। ১৩ বছর বয়সে তিনি একা সাইকেল চালিয়ে কয়েক সপ্তাহের জন্য চলে যান দূর পাহাড়ি অঞ্চলে। আজকের দিনে আমরা এমনটা হয়তো কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু সেই সময়ে তাঁর পরিবার তাঁকে স্বাধীনতা দিয়েছিল। আর তাঁর ছিল মন ভরা কৌতূহল। এই কৌতূহলের কারণে তিনি এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছিলেন, যা তাঁর ভাবনাকে সারা জীবনের জন্য গড়ে দিয়েছিল।

রুয়ান্ডায় মাউন্টেন গরিলার সঙ্গে অ্যাটেনবরো ১৯৭৮

শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন বাড়ির পাশ থেকেই। লেস্টার অঞ্চলের পাথরগুলো তৈরি হয়েছিল কোটি বছর আগে। এসব পাথরের ভেতরে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য জীবাশ্ম। সকালে তিনি সাইকেল নিয়ে বের হতেন, সঙ্গে থাকত নিজের বানানো ব্যাগ। সারা দিন ঘুরে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন। সঙ্গে থাকত ব্যাগভর্তি জীবাশ্ম। প্রতিটি নমুনা তিনি যত্ন করে কাগজে মুড়ে রাখতেন।

একটি জায়গা ছিল ডেভিড অ্যাটেনবরোর বিশেষ প্রিয়। একটি উঁচু গ্রাম, যার আশপাশে পাওয়া যেত অসাধারণ সব জীবাশ্ম। কাছেই ছিল রেললাইনের জন্য কাটা পাথরের দেয়াল। সেখানে পাওয়া গিয়েছিল এক বিশেষ ধরনের অ্যামোনাইট, যার নামকরণ হয়েছিল সেই গ্রামের নামে। তখনই তাঁর মনে হয়েছিল—তিনি যেন জীবাশ্মর এক গুপ্তধনের কেন্দ্রে বাস করছেন।

পাথরে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলেই বেরিয়ে আসত জীবাশ্ম। প্রতিটি আঘাতই তাঁর জন্য ছিল নতুন সম্ভাবনা। কখনো কিছুই পাওয়া যেত না। আবার হঠাৎ এক আঘাতেই বেরিয়ে আসত এমন এক খোলস, যা কোটি বছর সূর্যের আলো দেখেনি। সেই মুহূর্তগুলো তাঁর কাছে ছিল জাদুর মতো। আজও তাঁর মনটা তেমনই আছে। এই ১০০ বছর বয়সেও।

আরও পড়ুন

বহু বছর পর, মানে এখন লেস্টারের সেই জায়গায় আর রেললাইন নেই। চারপাশটা বেশ নীরবতা। ঘাসের ভেতরে পোকামাকড় ঘুরে বেড়ায়। জায়গাটি এখন সংরক্ষিত। পাথরে আঘাত করা নিষেধ। তবু ছড়িয়ে আছে পাথরের টুকরা। এখনো লুকিয়ে আছে সেই অতীত।

এই অঞ্চলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়েছে। এখানে পাওয়া গেছে এমন একটি জীবাশ্ম, যা পৃথিবীর জীবনের ইতিহাস নিয়ে আমাদের ধারণা বদলে দিয়েছে। কয়েকজন স্কুলছাত্র সেটি খুঁজে পেয়েছিল। সেই আবিষ্কার প্রমাণ করেছিল, পৃথিবীতে জীবনের সূচনা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক আগে হয়েছিল। এই ঘটনা ভূতত্ত্বের ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছে।

ডেভিড অ্যাটেনবরো পরে আফসোস করেছিলেন, তিনি কেন সেই জায়গাটিকে গুরুত্ব দেননি! যদি দিতেন, হয়তো তিনিই সেই আবিষ্কার করতেন। তবু তাঁর পথ থেমে থাকেনি। জীবনের নানা সময়ে তিনি জীবাশ্ম সংগ্রহ করে গেছেন। এমনকি একবার ভুল করে একটি ভুয়া জীবাশ্ম কিনেও ফেলেছিলেন। যেটি দুটি আলাদা নমুনা জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। পরে তিনি বুঝেছিলেন, সেটি প্রতারণা। তবু তিনি সেটি রেখে দিয়েছেন। এটি তাঁর নিজের সরলতার একটি স্মারক।

এখন অ্যাটেনবরোর সংগ্রহশালা তাঁর শৈশবের সেই বাড়িতে আর নেই। কিন্তু সেই বাড়ির দেয়ালের ইটের এখনো ছোট ছোট আঁচড়ে তাঁদের নাম লেখা আছে। সেই চিহ্ন এক অন্য রকম জীবাশ্ম। তাঁদের পরিবারের স্মৃতি।

পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে ডেভিড অ্যাটেনবরো আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন প্রকৃতির বিস্ময়। কিন্তু এই বিশাল যাত্রার শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ এক জায়গা থেকে। ছিল একটি সাইকেল, কিছু পাথর আর এক কিশোরের অদম্য কৌতূহল।

বিবিসিতে প্রকাশিত রিচার্ড ফিশারের প্রতিবেদন অবলম্বনে
আরও পড়ুন