মাত্র ১১ বছর বয়সেই গ্র্যান্ডমাস্টার লন্ডনের স্কুলছাত্রী

১১ বছর বয়সী এই খুদে দাবারুর নাম বোধনা শিবানন্দন

বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে লন্ডনের এক স্কুলছাত্রী। আন্তর্জাতিক দাবায় সবচেয়ে কম বয়সে ‘উইম্যান গ্র্যান্ডমাস্টার’ (ডব্লিউজিএম) হওয়ার খেতাব অর্জন করেছে সে।

১১ বছর বয়সী এই খুদে দাবারুর নাম বোধনা শিবানন্দন। বয়সে ছোট হওয়ায় দাবার টেবিলে বসার জন্য তাকে এখনো উঁচু বাড়তি সিট ব্যবহার করতে হয়। উজবেকিস্তানের সমরখন্দে আয়োজিত ৪৬তম দাবা অলিম্পিয়াডে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলে সে। সেখানে তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে পয়েন্ট বা নর্ম পেয়ে জিতে যায় বোধনা।

বোধনা এর মাধ্যমেই বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে উইম্যান গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব অর্জনের অনন্য যোগ্যতা অর্জন করল।

তবে বোধনার জন্য রেকর্ড গড়া এবারই প্রথম নয়। এর আগে মাত্র ৯ বছর বয়সে ইংলিশ চেস ফেডারেশনের দলে জায়গা করে নিয়েছিল। সেবারই প্রথম যেকোনো খেলায় ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের হয়ে খেলা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার নজির গড়েছিল এই খুদে দাবারু তারকা।

চাপের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বোধনা আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশনকে বলেছিল, আসলে মোটেও চাপ মনে হয়নি। আমি স্রেফ খেলাটা উপভোগ করার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে এটি ছিল আমার দ্বিতীয় অলিম্পিয়াড। বিষয় দারুণ ছিল আর নিজের দলকেও আমার বেশ পছন্দ। সত্যি বলতে পুরো অভিজ্ঞতাটা আমি দারুণ উপভোগ করেছি।

আরও পড়ুন

স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি বোধনা দাবা খেলে। আবার পিয়ানো ও বেহালাও বাজায়। কোভিডের লকডাউনের সময় উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের হ্যারোতে নিজের ঘরে একটা পুরোনো দাবা বোর্ড পড়ে থাকতে দেখে তার এই খেলার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়।

বোধনা জানায়, দাবার সব কটি ঘুঁটি বিশেষ করে ঘোড়া (নাইট) আর মন্ত্রী (কুইন) দেখতে কেমন, তা তাকে সব সময় অবাক করত।

আন্তর্জাতিক দাবায় সবচেয়ে কম বয়সে ‘উইম্যান গ্র্যান্ডমাস্টার’ (ডব্লিউজিএম) হওয়ার খেতাব অর্জন করেছে সে

মাত্র ১১ বছর বয়সের এই দাবারু ইউটিউবের টিউটোরিয়াল দেখে দেখে নিজে নিজেই দাবা খেলা শিখে নেয়। আর কিছুদিনের মধ্যেই তার বাবা শিবানন্দন ভেলাউথমকে হারানো শুরু করে। পেশায় আইটি কর্মী বাবার চেয়েও সে খেলায় এগিয়ে যায়।

তার বাবা স্বীকার করেছেন, মেয়ের এই অসাধারণ প্রতিভা কার কাছ থেকে এল, তা তাঁর জানা নেই। কারণ, তিনি কিংবা তাঁর স্ত্রী দুজনই প্রকৌশলের ছাত্র হলেও কেউই দাবায় খুব একটা পারদর্শী নন।

২০২১ সালের জুলাই মাসে হ্যারো চেস ক্লাবে আয়োজিত নিজের প্রথম টুর্নামেন্টে অংশ নেয় বোধনা। আর তার ঠিক এক বছর পর ইউরোপিয়ান স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপে সাত বছর বয়সীদের বিভাগে নিজের ২৪টি ম্যাচের সব কটিতেই জয় পেয়ে যায় সে।

দুই বছর পর ক্রোয়েশিয়ায় আয়োজিত ইউরোপীয় র‍্যাপিড ও ব্লিৎজ দাবা টুর্নামেন্টে আরেক নজির গড়ে বোধনা। সেখানে কোনো গ্র্যান্ডমাস্টারের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অপরাজিত থাকা সর্বকনিষ্ঠ দাবারু হিসেবে ইতিহাস তৈরি করে সে। এরপর ২০২৪ সালে সুযোগ পায় ইংল্যান্ডের অলিম্পিয়াড দলে।

আরও পড়ুন

চলতি বছর কভেন্ট্রিতে আয়োজিত ব্রিটিশ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে আরও এক রেকর্ড গড়ে বোধনা। টুর্নামেন্টের ইতিহাসেই সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে এই শিরোপা নিজের করে নেয় সে।

মাত্র ১১ বছর বয়সের এই দাবারু ইউটিউবের টিউটোরিয়াল দেখে দেখে নিজে নিজেই দাবা খেলা শিখে নেয়

এবারের অলিম্পিয়াডে ইংল্যান্ড দলের ‘টপ বোর্ড’-এ (যেখানে কোনো দলের সবচেয়ে সেরা খেলোয়াড় অংশ নেন) পুরো ১১টি রাউন্ডেই খেলে সে। পুরো টুর্নামেন্টে সে সংগ্রহ করে দারুণ ৮টি পয়েন্ট।

উইম্যান গ্র্যান্ডমাস্টার (ডব্লিউজিএম) খেতাব পাওয়ার জন্য একজন খেলোয়াড়ের ন্যূনতম ২ হাজার ৩০০ রেটিং পয়েন্ট দরকার হয়। এই পয়েন্ট বোধনা আগেই অর্জন করেছিল। এবার অলিম্পিয়াডে সে তার তৃতীয় ও চূড়ান্ত ‘নর্ম’ অর্জন করে ফেলে। এই নর্ম মূলত শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মাস্টার পর্যায়ের খেলার এক অফিশিয়াল স্বীকৃতি।

নিজের এই অর্জনের পর বোধনা জানায়, এই কৃতিত্ব অর্জন করতে পেরে আমি দারুণ খুশি। তবে এখানেই থেমে থাকতে চাই না। সামনে আরও এগিয়ে যেতে চাই আর গড়তে চাই নতুন সব ইতিহাস।

এর আগে সর্বকনিষ্ঠ উইম্যান গ্র্যান্ডমাস্টার (ডব্লিউজিএম) হওয়ার বিশ্ব রেকর্ডটি ছিল ক্যাটেরিনা লাগনোর দখলে। তিনি মাত্র ১২ বছর বয়সে এই আন্তর্জাতিক খেতাব অর্জন করেছিলেন।

আরও পড়ুন

‘উইম্যান গ্র্যান্ডমাস্টার’ হলো নারীদের জন্য দাবার সর্বোচ্চ খেতাব। একবার অর্জন করলে এই মর্যাদা আজীবন বহাল থাকে।

সাধারণত ‘ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার’ (আইএম) হতে হলে একজন খেলোয়াড়ের অন্তত তিনটি যোগ্যতা অর্জনকারী পয়েন্ট বা নর্ম এবং ২ হাজার ৪০০ রেটিং পয়েন্ট লাগে। বোধনার ঝুলিতে ইতিমধ্যেই দুটি আইএম নর্ম জমা হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন এই রেটিং নির্ধারণ করে থাকে।

নারী দাবারুদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে পূর্ণাঙ্গ গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব জয়ের বিশ্ব রেকর্ডটি ধরে রেখেছেন চীনের হাউ ইফান। ২০০৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি এই অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন।

সাধারণ গ্র্যান্ডমাস্টার এবং উইম্যান গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাবের মূল তফাত হলো রেটিং পয়েন্টে। প্রথমটির জন্য একজন খেলোয়াড়ের অন্তত ২ হাজার ৫০০ রেটিং পয়েন্ট লাগে। আর দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে ২ হাজার ৩০০ বা তার বেশি রেটিং থাকলেই সেটিকে ধরা হয়।

সূত্র: সিএনএন ও দ্য টেলিগ্রাফ
আরও পড়ুন