বন্যার পানিতে ডুবে গেছে ব্যাংককের রাস্তাঘাট
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টি হয়। বিকেলের দিকে হুট করে বৃষ্টি নামা এই শহরের জন্য নতুন কিছু না। আমাদের ঢাকার মতো বৃষ্টির পানিতে এই শহরেরও অনেক রাস্তা নদীর মতো হয়ে যায়। নর্দমা থেকে ইঁদুর আর তেলাপোকা বেরিয়ে আসে। প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেয় গাছপালা আর ভবনের গায়ে। কিন্তু এবারের বৃষ্টি ব্যাংককের সব হিসাব যেন পাল্টে দিয়েছে। টানা বৃষ্টিতে ব্যাংককের অনেক এলাকা এখন আর নদীর মতো না, পরিণত হয়েছে পানির বিশাল লেকে। কোথাও কোথাও মাত্র দুই দিনে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশের মতো। লন্ডনে দুই মাসে যা হয়, ব্যাংককে দুই দিনেই প্রায় ততটা হয়েছে!
এ বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে থাইল্যান্ড সরকার। তাঁদের মধ্যে কেউ পানিতে ডুবে, কেউ আবার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। শহরজুড়ে ২৩০টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংককের ৫০টি জেলার সব কটিতেই বন্যা দুর্যোগ ঘোষণা করেছে সরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সেখানকার ছবি। বাদামি পানির মধ্যে ডুবে থাকা ভবনগুলোর ছাদ শুধু দেখা যাচ্ছে। পার্ক করে রাখা গাড়িগুলোর ছাদও পানির ওপরে কোনোমতে উঁকি দিচ্ছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে অবশ্য উদ্ধারকর্মীরা পানি অনেকটাই সরিয়ে নিতে পেরেছেন।
বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে। রোদ দেখে স্বস্তি পেয়েছিলেন বাসিন্দারা। কিন্তু বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে আরেক সমস্যা। চারদিকে ময়লা-আবর্জনা ভাসছে। জমে থাকা পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
ব্যাংককের অবস্থান চাও ফ্রায়া নদীর বিশাল বন্যাপ্রবণ সমভূমিতে। লাখ লাখ মানুষের এই শহরে বৃষ্টির পানি সরানোর জন্য রয়েছে অসংখ্য খাল, পাম্প আর বাঁধ। কিন্তু শহরজুড়ে একের পর এক ভবন ও কংক্রিটের স্থাপনা তৈরি হওয়ায় অনেক খাল হারিয়ে গেছে। ঠিক ঢাকার মতো। ফলে পানি সরানোর স্বাভাবিক পথও কমে এসেছে। অতিবৃষ্টির পানি একসঙ্গে জমে যাওয়ায় শহরের পক্ষে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এক ব্যক্তিকে দেখা গেছে, ভেসে থাকা একটি ফ্রিজকে নৌকার মতো ব্যবহার করেছেন! অন্যদিকে, প্রধান সড়কে জেটস্কি চালানোর অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বন্যার প্রভাব পড়েছে ব্যাংককের প্রধান বিমানবন্দর সুবর্ণভূমিতেও। থাই এয়ারওয়েজের কর্মীদের প্রায় অর্ধেক কর্মী কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে হাজার হাজার ব্যাগ জমে যায়, বাতিল করতে হয় বেশ কিছু ফ্লাইট। অনেক স্কুলও বন্ধ রাখা হয়েছে। শহরের বেশির ভাগ জায়গায় যানজট এত তীব্র যে বন্যায় তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষও ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
উত্তর দিক থেকে বন্যার পানি নেমে আসায় ব্যাংককের মহানগর এলাকায় এখনো ঝুঁকি রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সরকার বিশেষ নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে। তবে আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহেও ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভয়াবহ বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়ছে, পরিস্থিতি তত জটিল হচ্ছে। সমুদ্রের পানি উষ্ণ হলে বাষ্পীভবন বাড়ে। আবার উষ্ণ বাতাস বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। ফলে বৃষ্টি নামলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি ঝরে পড়তে পারে।
যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী নিকোলাওস স্ক্লিরিস দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের অতিবৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, মধ্য থাইল্যান্ডে ইতিমধ্যে অতিবৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা হলেও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভবিষ্যতে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। বিভিন্ন জলবায়ু মডেলেও দেখা যাচ্ছে, সামনে বৃষ্টির পরিমাণ ও তীব্রতা দুটোই বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এল নিনোর প্রভাব। এল নিনো হলো প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের একটি পর্যায়, যার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যায়। এটি অনেক জায়গায় রেকর্ড তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সাধারণত এল নিনোর সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গ্রীষ্মকাল তুলনামূলক শুষ্ক থাকে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এ সময়ও অতি ভারী বৃষ্টির দিন বাড়তে পারে।
শুধু থাইল্যান্ড নয়, একই আবহাওয়াব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী মিয়ানমারেও। সেখানে আকস্মিক বন্যা ও সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। সপ্তাহের শেষে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কা দেত ঙে থেইন গ্রামে ভয়াবহ ভূমিধসের পর উদ্ধারকারীরা কাদামাটির নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধার করছিলেন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় এরই মধ্যে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্য একটি গ্রামে কাদার নিচে নিখোঁজ রয়েছেন আরও আটজন।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং সামরিক জান্তার সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধের কারণে সেখানকার পরিস্থিতির নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে যুক্ত সংস্থাগুলোকেও নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
ব্যাংককে পানি সরানোর পাম্পগুলো বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও শহরের সব জায়গা থেকে পানি সরতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে।