আর্জেন্টিনা নাকি ইংল্যান্ড, দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ফেবারিট কে

বিশ্বকাপের মঞ্চে এ দুই দলের দেখা হওয়া মানেই চরম নাটকীয়তাদ্য অ্যাথলেটিক

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আজ রাত একটায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এ দুই দেশের ফুটবলীয় দ্বন্দ্বের ইতিহাস অনেক পুরোনো। একদিকে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। এই ম্যাচে যারা জিতবে, তারা ২০ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে।

প্রথম প্রশ্ন, এই ম্যাচে কারা এগিয়ে? বিশ্বকাপের মঞ্চে এ দুই দলের দেখা হওয়া মানেই চরম নাটকীয়তা। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তাপ সব সময়ই এই ম্যাচে বাড়তি বারুদ যোগ করে। বিশ্বকাপে এ নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে তারা।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, লড়াইটা বেশ হাড্ডাহাড্ডি। ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে ৩-১ গোলে জিতেছিল ইংল্যান্ড। এরপর ১৯৬৬ সালের সেই বিখ্যাত কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড জেতে ১-০ গোলে। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিন লাল কার্ড দেখেন। ক্ষুব্ধ ইংলিশ কোচ আলফ রামসে ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের জার্সি বদল করতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

এরপর আসে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিতর্কিত গোল, যা পরিচিত ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে। দ্বিতীয় গোলটি আরও বিখ্যাত। গোলটি শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে খ্যাত। ম্যারাডোনার এ দুই গোলের সুবাদে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জিতে যায় ম্যাচটি। ১৯৯৮ সালের শেষ ষোলোর ম্যাচটিও ছিল ক্ল্যাসিক; ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড এবং মাইকেল ওয়েনের অসাধারণ গোলের পর ১০ জনের ইংল্যান্ড ২-২ গোলে ড্র করলেও টাইব্রেকারে জিতে যায় আর্জেন্টিনা। সবশেষ ২০০২ সালের গ্রুপ পর্বে সেই বেকহ্যামের একমাত্র পেনাল্টিতে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল আর্জেন্টিনা।

আরও পড়ুন

কিন্তু এসবই তো ইতিহাস। দুই দলের বর্তমান ফর্ম কেমন? আর্জেন্টিনা এই টুর্নামেন্টে টিকে আছে মূলত লিওনেল মেসির জাদুতে। তিনি একাই ৮টি গোল করেছেন। সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট। মেসি এখন বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তবে নকআউট পর্বে তারা বেশ ভুগেছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচের পর থেকে স্কালোনির দল গোল হজম করেছে প্রতিটি ম্যাচেই। জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিসর—সবাই তাদের জালে গোল দিয়েছে। মিসরের বিপক্ষে তো আর্জেন্টিনা ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ০-২ গোলে পিছিয়ে ছিল। শেষ ১০ মিনিটে অবিশ্বাস্য এক কামব্যাকে ৩-২ গোলে জয় পায় মেসি-আলভারেজরা। কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে আলভারেজ এবং বদলি নামা লাউতারো মার্তিনেজের গোলে তারা সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে।

২০১৮ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করেছে ইংল্যান্ড
রয়টার্স

ইংল্যান্ডের পুরো দলের আক্রমণভাগ মূলত হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামের কাঁধে ভর করে চলছে। এই টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের ১৩টি গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে এ দুজনের পা থেকে, দুজনই ৬টি করে গোল করেছেন। বাকি গোলটি করেছেন মার্কাস রাশফোর্ড।

তবে তাদের মাঝমাঠের ভারসাম্য খুব একটা ভালো নয়। ডেকলান রাইস টুর্নামেন্টজুড়েই ধুঁকছেন। ফলে এলিয়ট অ্যান্ডারসনের ওপর বাড়ছে চাপ। কোচ টুখেল রাইটব্যাক পজিশনে চারজন ভিন্ন খেলোয়াড়কে খেলিয়েছেন। নকআউট পর্বে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে তারা শুরুতে পিছিয়ে পরেও হ্যারি কেইনের শেষ ১৫ মিনিটের জোড়া গোলে বেঁচে যায়। মেক্সিকোর বিপক্ষে জ্যারেল কোয়ানসা লাল কার্ড দেখার পর ১০ জনের দল নিয়েও তারা জেতে ৩-২ ব্যবধানে। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষেও পিছিয়ে পড়ার পর বেলিংহামের একক নৈপুণ্য এবং অতিরিক্ত সময়ের গোলে সেমিফাইনালে আসে ইংল্যান্ড।

এই ম্যাচে কৌশলের লড়াইটা হবে দারুণ উপভোগ্য। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সেট–পিস। পেনাল্টিসহ ডেড বল সিচুয়েশন থেকে তারা ইতিমধ্যে ৬টি গোল করেছে, যার বেশির ভাগই এসেছে মেসির নিয়ার-পোস্ট টার্গেট করা কর্নার থেকে। তা ছাড়া দলটির ফরোয়ার্ড লাইনে মেসির ভূমিকা অপরিসীম। তিনি দলের মোট শটের ৩৩ শতাংশ নিয়েছেন এবং ৩৩ শতাংশ সুযোগ একাই তৈরি করছেন।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জন্য সুযোগ লুকিয়ে আছে আর্জেন্টিনার রক্ষণে। আর্জেন্টিনার দুই সেন্টারব্যাক লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরো প্রায়ই আক্রমণ ঠেকাতে নিজেদের লাইন ছেড়ে অনেকটা সামনে এগিয়ে আসেন। ফলে তাঁদের পেছনে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, ঠিক সেই জায়গাতেই দৌড়াতে পছন্দ করেন জুড বেলিংহাম।

আর্জেন্টিনা ফুটবল দল
রয়টার্স

তবে ইংল্যান্ডের জন্য চিন্তার বিষয় হলো, তাদের ডিফেন্সের মনোযোগ হারানো। প্রায় প্রতি ম্যাচেই এমন একটা সময় আসে, যখন ইংলিশ দল খেই হারিয়ে ফেলে এবং প্রতিপক্ষকে বড় সুযোগ দিয়ে বসে।

তাহলে এই ম্যাচ কারা জিতবে? বলা কঠিন। ইংল্যান্ডের আছে কেইন ও বেলিংহামের মতো ম্যাচ উইনার, যাঁরা নিজেদের দিনে যেকোনো দলের রক্ষণ গুঁড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু যখনই দল হিসেবে খেলার প্রশ্ন আসে, তখন আর্জেন্টিনা কিছুটা এগিয়ে থাকবে। ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের দুর্বলতা এবং হঠাৎ করে মনোযোগ হারিয়ে ফেলার প্রবণতাকে কাজে লাগানোর জন্য মুখিয়ে থাকবে আর্জেন্টিনা। আর আর্জেন্টিনা দলের শেষ পর্যন্ত হাল না ছাড়ার যে মানসিকতা, সেটা তাদের বাড়তি সুবিধা দেবে।

সম্ভবত ইংল্যান্ড বেলিংহামের রান-মেকিংয়ের মাধ্যমে সুযোগ তৈরি করবে; কিন্তু সেট-পিস কাজে লাগিয়ে এবং ইংল্যান্ডের রক্ষণের ভুলে পাওয়া সুযোগ থেকে গোল বের করে নিয়ে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা জিতে গেলে করার কিছু থাকবে না। তবে মাথায় রাখতে হবে, নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা কিন্তু এখনো তুলনামূলক দুর্বল দলের সঙ্গে খেলেছে। আজ এই বড় ম্যাচের চাপ সামলে আর্জেন্টিনা জিততে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক
আরও পড়ুন