টটেনহাম কি সত্যিই অবনমিত হয়ে যাচ্ছে

‘অবনমন’ শব্দটা একটু কম পরিচিত দলের জন্যই বরাদ্দ। গত বছরের নিচের বিভাগ থেকে উঠে আসা দলটাই থাকে অবনমনের দৌড়ে এগিয়ে। কিন্তু এবারের প্রিমিয়ার লিগে সেই দলগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিয়ে লড়ছে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলা লন্ডনের বিখ্যাত দল টটেনহাম হটস্পার্স। প্রিমিয়ার লিগের ‘বিগ সিক্স’খ্যাত দলটা প্রিমিয়ার লিগে যেমন অবনমনের লড়াইয়ে, অন্যদিকে চ্যাম্পিয়নস লিগের শীর্ষ ১৬-তে। এক মৌসুমেই যেন মুদ্রার দুই পিঠ দেখা হয়ে যাচ্ছে তাদের।

টটেনহামের লিগ মৌসুম ওলটপালট হয়ে গেছে গত মৌসুম থেকে। সেবার তাদের কোচ ছিলেন গ্রিসের অ্যাঞ্জ পোস্তেকোগলু। তাঁর অধীন স্পার্স একটা নতুন লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু পোস্তেকোগলু একটা জিনিস অর্জন করে দিয়ে গিয়েছিলেন, যা অনেক হেভিওয়েট কোচরা ১৭ বছরেও পারেননি। টটেনহামকে এনে দিয়েছিলেন ইউরোপা লিগের শিরোপা। তিনি বুঝেছিলেন, টটেনহামের জন্য শিরোপাটা বেশি জরুরি। যে কারণে শেষদিকে লিগে মনোযোগ না দিয়ে মনোযোগ দিয়েছিলেন ইউরোপায়। ফলে ৩৮ পয়েন্ট নিয়ে ১৭ নম্বর অবস্থানে থেকে লিগ শেষ করলেও শিরোপা জয়ের আনন্দে মেতেছিল স্পার্সভক্তরা।

আরও পড়ুন
ইউরোপা লিগের শিরোপা হাতে কোচ ও অধিনায়ক।
ছবি: এক্স

সেই আনন্দ টেকেনি বেশি দিন। পত্রপাঠে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে কোচকে। কারণটা খুবই সাধারণ। টটেনহাম এমন একটা দল, যারা শিরোপার পেছনে খুব কম ছুটেছে। বরং তাদের লক্ষ্যই থাকত সব সময় প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ ছয়ে থাকা। কারণ, প্রিমিয়ার লিগে যত ওপরে একটি দল শেষ করতে পারবে, তত বেশি টিভিস্বত্ব আর লাভের অংশ ঢুকবে তাদের পকেটে। অন্য সব শিরোপা জিতেও এত টাকা আসে না, যতটা আসে প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ ৬-এ থেকে। নিজেদের রুটিরুজি হাতছাড়া হতে দেখা নিশ্চয় এত সহজ ব্যাপার নয়।

যার কারণে পোস্তেকোগলুকে সরিয়ে আনা হয়েছিল ব্রেন্টফোর্ডের কোচ থমাস ফ্র্যাঙ্ককে। ব্রেন্টফোর্ডের মতো দলকে প্রিমিয়ার লিগে শুধু তুলে আনেননি, বরং তাদের প্রিমিয়ার লিগে থিতু করেছেন, গত মৌসুম শেষ করেছিল শীর্ষ অর্ধে থেকে। এমন একজন ধারাবাহিক কোচ দরকার ছিল স্পার্সের। ফ্র্যাঙ্ক সেই তালিকা পূরণ করেছিলেন ঠিকই; কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ।

আরও পড়ুন
থমাস ফ্র্যাঙ্ক ব্যর্থ হয়েছেন কোচ হিসেবে।
ছবি: এক্স

প্রিমিয়ার লিগের আর বাকি আছে মাত্র ৯ গেমউইক। ২৯ ম্যাচ শেষে টটেনহামের পয়েন্ট ২৯। ম্যাচপ্রতি গুনে গুনে মাত্র একটি করে পয়েন্ট ছিনিয়ে আনতে পেরেছে তারা। টেবিলে আছে ১৬ নম্বর অবস্থানে। অবনমন থেকে দুই ধাপ ওপরে থাকলেও স্বস্তি নেই। কারণ, ১৭ ও ১৮ নম্বরে থাকা নটিংহাম ফরেস্ট ও ওয়েস্ট হামের পকেটে আছে ২৮ পয়েন্ট। আরেকটু পা ফসকালেইও তাদের চলে যেতে হবে অবনমনের সারিতে। এর মধ্যেই বরখাস্ত হয়েছেন থমাস ফ্র্যাঙ্ক। নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ইগর তুদোর। তিনিও তিন ম্যাচের তিনটিতেই হেরেছেন। নতুন কোচ এলে দল একটু গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, টটেনহাম সেটাও পারছে না। বরং একই হারের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। শেষ পাঁচ ম্যাচে টানা হার, শেষ জয় এসেছিল গত বছর, ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে। এ বছরে ১১ ম্যাচ খেলে মাত্র ৪ পয়েন্ট আনতে পেরেছে তারা।

মধ্য মৌসুমে দলের দায়িত্ব পেয়েছেন ইগর তুদোর।
ছবি: এক্স

টটেনহামের মতো দল এই অবস্থায় থাকবে, এমনটা দেখে অবাক ভক্তরা। স্পার্স সেটাই করে দেখিয়েছে। দলের অবস্থা এতটাই করুণ যে শেষ ম্যাচে প্রথমার্ধের পরই খালি হয়ে গেছে পুরো মাঠ। এত বাজে অবস্থার কারণ আসলে অনেক। বছরের পর বছর ধরে ক্লাবের ভেতরে জয়ের স্পৃহা গড়ে ওঠেনি। ক্লাব সব সময়ই চেয়েছে টিকে থাকতে। যে মনোভাবের সমালোচনা করে গেছেন হোসে মোরিনহো, অ্যান্তোনিও কন্তে, নুনো সান্তোস, অ্যাঞ্জ পোস্তেকোগলু থেকে শুরু করে নতুন আসা কোচ ইগর তুদোরও। ক্লাব বছরের পর বছর শুধু ব্যবসাই দেখেছে। সেদিকে লাভও করেছে অবশ্য। প্রিমিয়ার লিগের মধ্যে সবচেয়ে ভালোভাবে চলা ক্লাবটির নাম টটেনহাম। নতুন স্টেডিয়ামে শুধু ফুটবল নয়, এনএফএল ম্যাচ হয়, কনসার্ট হয়। সবকিছুই চলছে একসঙ্গে। এর মধ্যে যেন ক্লাবটাই হারিয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

প্রায় ১৭ বছর ক্লাবের চেয়ারপারসন ছিলেন ডেনিয়েল লেভি। যিনি স্পার্সকে ফুটবল ক্লাবের চেয়ে ব্যবসা হিসেবে দেখতেন বেশি। সেদিক দিয়ে ব্যবসাসফল ক্লাব তারা, কিন্তু ফুটবল ক্লাব হিসেবে ঠিক যেভাবে গড়ে ওঠা উচিত, ঠিক সেভাবে তাদের তৈরি করতে পারেননি তিনি। এই মৌসুমের শুরুতে তিনি ক্লাব ছাড়লেও একই চিন্তাধারা রয়েই গেছে। নতুন সিইও সেভাবেই ক্লাবকে চালাচ্ছেন। যার ফলাফল আজকের এই অবস্থান। অবনমনের খুব কাছাকাছি।

খেলার চেয়ে ব্যবসাই বড় ছিল লেভির কাছে।
ছবি: এক্স

অনেকেই বলছেন, টটেনহাম ‘টু বিগ টু ফল’ ক্লাব। এত বড় দল এত সহজে অবনমিত হয় না। কিন্তু আর্জেন্টাইন লিগ থেকে রিভার প্লেট অবনমিত হয়েছে, ব্রাজিলিয়ান লিগ থেকে হয়েছে সান্তোস। সর্বজয়ী ক্লাব ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল শুধু টিকতে না পেরে। একসময় প্রিমিয়ার লিগে ত্রাস করে বেড়ানো নিউক্যাসল ইউনাইটেডও অবনমিত হয়েছিল, অনেক বছর লেগেছে সেই পুরোনো জায়গায় ফিরতে।

টটেনহাম যদি সেই জায়গায় একবার নেমে যায়, তবে ফিরে আসা কঠিন নয়, একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ, প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাদ পড়লেই বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতছাড়া হবে তাদের। নামীদামি খেলোয়াড়েরা পাড়ি জমাবেন ভিন্ন দলে। সঙ্গে মাঠের জন্য নেওয়া বিশাল অঙ্কের দেনা এখনো শোধ করা হয়নি। সব মিলিয়ে টটেনহাম যদি এখন পথ হারিয়ে দ্বিতীয় ডিভিশনে চলেই যায়, তাহলে সেই দেনা শোধ করতে গিয়ে টটেনহামকে অনেক দিন বেগ পোহাতে হবে। এখন দেখার বিষয় সেই জায়গা থেকে টটেনহাম ফেরত আসতে পারে কি না।

আরও পড়ুন