অ্যান্টার্কটিকা কবে মহাদেশে পরিণত হলো
পৃথিবীর মানচিত্রের একদম নিচের দিকে থাকা এই মহাদেশটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফের ব্লক। প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ বর্গকিলোমিটারের এই বিশাল জায়গাটি কিন্তু সব সময় এমন বরফে ঢাকা ছিল না!
একসময় এই অ্যান্টার্কটিকায় বিশাল সব গাছপালার জঙ্গল ছিল। সেখানে দিব্যি ঘুরে বেড়াত ডাইনোসররা! তাহলে এই জাদুকরি মহাদেশটি কবে অন্য সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে এই বরফের রাজ্যে পরিণত হলো?
অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদর সরালে নিচে কী পাওয়া যাবে জানো? পৃথিবীর অন্য যেকোনো মহাদেশের মতোই বিশাল সব পাহাড়, উপত্যকা ও সমতল ভূমি! অ্যান্টার্কটিকার এই বরফের নিচে লুকিয়ে আছে ট্রান্সঅ্যান্টার্কটিক পর্বতমালা। এটি উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত রকি পর্বতমালার চেয়েও উঁচু!
দক্ষিণ আমেরিকা, অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া একসঙ্গে জোড়া লাগানো থাকায় প্রাণীরা খুব সহজেই এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে হেঁটে যেতে পারত।
পুরো মহাদেশটিকে বিজ্ঞানীরা দুই ভাগে ভাগ করেছেন, পূর্ব এবং পশ্চিম। পূর্ব অ্যান্টার্কটিকা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ভূখণ্ডের একটি, যার কিছু পাথরের বয়স প্রায় ৩০০ কোটি বছর! অন্যদিকে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা তুলনামূলকভাবে বেশ তরুণ। জুরাসিক যুগে যখন বিশাল মহাদেশগুলো ভাঙতে শুরু করে, তখন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে এই পশ্চিম অংশের জন্ম হয়েছিল।
আজ আমরা পৃথিবীতে যে সাতটি আলাদা মহাদেশ দেখি, কোটি কোটি বছর আগে কিন্তু এমনটা ছিল না। সব মহাদেশ একসঙ্গে জোড়া লেগে বিশাল একটা ভূখণ্ড আকারে ছিল। আজ থেকে প্রায় ৬০ কোটি বছর আগে তৈরি হওয়া তেমনই এক বিশাল ভূখণ্ডের নাম ছিল গন্ডোয়ানা।
প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে এই গন্ডোয়ানা ভাঙতে শুরু করে। আর এই গন্ডোয়ানার ভেতরেই একসঙ্গে জোড়া লাগানো ছিল আজকের অ্যান্টার্কটিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আমেরিকা! বিশ্বাস না হলে অ্যান্টার্কটিকার পূর্ব দিকের পাথরের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার পাথরের মিল এখনো মিলিয়ে দেখতে পারো।
মেসোজোয়িক যুগে, মানে প্রায় সাড়ে ২৫ কোটি থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা আজকের মতো এত ঠান্ডা ছিল না। বরং সেখানে ছিল দারুণ আরামদায়ক আবহাওয়া, আর সবুজে ঘেরা রেইনফরেস্ট!
মহাদেশগুলোর মাঝখানে বিশাল ফাঁকা জায়গা তৈরি হওয়ায় অ্যান্টার্কটিকার চারপাশ ঘিরে সাগরের ঠান্ডা পানির এক ভয়ংকর স্রোত তৈরি হয়।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, কোটি কোটি বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকা একটি বিশাল সেতু হিসেবে কাজ করেছে। দক্ষিণ আমেরিকা, অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া একসঙ্গে জোড়া লাগানো থাকায় প্রাণীরা খুব সহজেই এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে হেঁটে যেতে পারত। উদাহরণ হিসেবে মারসুপিয়াল বা পেটে থলে থাকা প্রাণীদের কথা বলা যায়। ক্যাঙারুর মতো এই প্রাণীদের পূর্বপুরুষেরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অ্যান্টার্কটিকার ওপর দিয়ে হেঁটেই অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিল! একবার চোখ বন্ধ করে ভাবো তো, অ্যান্টার্কটিকার সবুজ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ক্যাঙারুরা লাফিয়ে লাফিয়ে পার হচ্ছে!
এখন হয়তো ভাবছ, সবুজ জঙ্গল ও এত এত প্রাণীর কলকাকলি ছেড়ে অ্যান্টার্কটিকা কবে একাকী হয়ে গেল? কার্নেগি মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির জীবাশ্মবিদ ম্যাট ল্যামানা বলেন, এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আলাদা হওয়া বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি, তার ওপর।
তবে বেশির ভাগ বিজ্ঞানী একমত যে আজ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়। ওই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকা ও অ্যান্টার্কটিকার মাঝখানে ড্রেক প্যাসেজ এবং অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকার মাঝখানে তাসমান গেটওয়ে নামে বিশাল সমুদ্রপথ খুলে যায়।
অস্ট্রেলিয়া ধীরে ধীরে উত্তরের দিকে সরে যায়, আর অ্যান্টার্কটিকা চলে যায় একদম দক্ষিণে। মহাদেশগুলোর মাঝখানে বিশাল ফাঁকা জায়গা তৈরি হওয়ায় অ্যান্টার্কটিকার চারপাশ ঘিরে সাগরের ঠান্ডা পানির এক ভয়ংকর স্রোত তৈরি হয়। একে বলা হয় অ্যান্টার্কটিক সার্কামপোলার কারেন্ট। এই স্রোত অ্যান্টার্কটিকাকে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার গরম বাতাস ও গরম পানি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ব্যস! পৃথিবীর বিশাল এক ডিপ ফ্রিজের ভেতর চিরতরে আটকা পড়ে যায় মহাদেশটি!
মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবী আজ দ্রুত গরম হয়ে যাচ্ছে। ফলে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলতে শুরু করেছে। বরফ গলে গেলে সূর্যের আলো আর প্রতিফলিত হবে না।
পৃথিবীর জলবায়ু বা আবহাওয়া ঠিক রাখতে অ্যান্টার্কটিকা বিশাল ভূমিকা পালন করে। এই মহাদেশের মাইলের পর মাইল সাদা বরফ বিশাল এক আয়নার মতো কাজ করে, যা সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে মহাকাশে ফিরিয়ে দেয় এবং পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবী আজ দ্রুত গরম হয়ে যাচ্ছে। ফলে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলতে শুরু করেছে। বরফ গলে গেলে সূর্যের আলো আর প্রতিফলিত হবে না। ফলে পৃথিবী আরও দ্রুত গরম হবে। শুধু তা-ই নয়, এই বিশাল বরফ গলে সাগরের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দেবে। এতে বিশ্বের অনেক দেশ পানিতে ডুবে যেতে পারে।
তাই পৃথিবীর এই সুন্দর ও রহস্যময় মহাদেশটিকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে।