দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতি যেভাবে ইন্টারন্যাশনাল ডেটলাইন সরিয়ে দিয়েছে

ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটালেই পরের দিন আসে, এটাই তো নিয়ম। কিন্তু পৃথিবীর বুকে এমন এক দেশ আছে, যারা এক রাতে ঘুমিয়ে পরের দিন সকালে উঠে দেখেছিল—মাঝখানের ২৪ ঘণ্টা হাওয়া! কেন তাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে হলো একটি দিন?

দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতিওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স

থার্টি ফার্স্ট নাইটে অনেকেই আতশবাজি বা পিকনিকের জন্য অপেক্ষা করে। বছরের শেষ দিন বলে কথা! কিন্তু ক্যালেন্ডার থেকে হঠাৎ এই দিনটাই গায়েব হয়ে গেলে কেমন হবে? মানে ৩০ ডিসেম্বরের পরদিন সকালবেলায় ঘুম ভেঙে দেখলে, ক্যালেন্ডারে ওটা ১ জানুয়ারি! মাঝখানের ৩১ ডিসেম্বরের কোনো অস্তিত্বই নেই!

কথাগুলো রূপকথার কোনো গালগল্প মনে হতে পারে, কিন্তু বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। আসলেই একটা দেশে মাত্র একটি দিনেই সম্পূর্ণ বছর হয়ে গিয়েছিল। দেশটির নাম কিরিবাতি। নামটা হয়তো তুমি কখনো শোনোইনি। শোনার কথাও নয়।

কারণ, কিরিবাতি হলো প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট্ট একটা দ্বীপরাষ্ট্র। দেশটি ৩৩টি প্রবালপ্রাচীর ও দ্বীপ নিয়ে গঠিত। কিন্তু ১৯৯৫ সালের আগে দেশটির একটা অদ্ভুত সমস্যা ছিল। সমস্যাটা ছিল সময় নিয়ে।

আরও পড়ুন

আচ্ছা, তুমি কি ইন্টারন্যাশনাল ডেটলাইনের নাম শুনেছ? এটি প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে কল্পনা করা একটি আঁকাবাঁকা রেখা। এই রেখাই পৃথিবীর সময় বিভাজন করে। এই রেখা পার হলে দিন বদলে যায়। অর্থাৎ রেখার এক পাশে যদি শুক্রবার হয়, অন্যপাশে তখন শনিবার। সমস্যা হলো, রেখাটি কিরিবাতির ঠিক মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছিল। ফলে দেশটির এক অংশ ছিল রেখার পশ্চিমে, আর অন্য অংশ পূর্বে। কী আজব কাণ্ড বলো! দেশের এক প্রান্তে যখন সোমবার সকাল, অন্য প্রান্তে তখনো রোববার সকাল! সময়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ২৩ ঘণ্টার।

ফলে আনুষ্ঠানিক কাজকর্ম করতে গিয়ে মহাবিপদে পড়তে হতো তাদের। ধরো, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কাউকে ফোন করে জরুরি কাজ করতে বলা হলো। কিন্তু দেখা গেল, ওই প্রান্তে তখন ছুটির দিন! একই দেশে থেকেও মানুষ ছিল দুই ভিন্ন তারিখে। এই জগাখিচুড়ি অবস্থা থেকে বাঁচতে ১৯৯৪ সালের শেষ দিকে কিরিবাতির সরকার এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিল। তারা ঠিক করল, পুরো দেশকে একই তারিখের মধ্যে নিয়ে আসবে। কিন্তু সেটা করতে হলে ইন্টারন্যাশনাল ডেটলাইনকে একটু সরিয়ে দিতে হবে।

আরও পড়ুন

যে ভাবা সেই কাজ। সরকার ডেটলাইনকে দ্বীপগুলোর পাশ দিয়ে একটু বাঁকিয়ে দিল। ম্যাপে তাকালে দেখবে, প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে ডেটলাইনটা সোজা না গিয়ে আঁকাবাঁকা একটা মোড় নিয়েছে। ওটাই কিরিবাতির জন্য করা হয়েছিল।

কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে একটা বড় বলিদান দিতে হলো। সেটাই হলো ৩১ ডিসেম্বর।

১৯৯৪ সাল। ৩০ ডিসেম্বর দিনটা শেষ হওয়ার পর ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ১২টা পার হলো, কিরিবাতির মানুষ আর ৩১ ডিসেম্বরে গেল না। তারা সোজা চলে গেল ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারিতে! অর্থাৎ সেবার তাদের জীবনে ৩১ ডিসেম্বর দিনটাই আসেনি। কোনো থার্টিফার্স্টের পার্টি করার সুযোগই পায়নি বেচারারা! তবে এর একটা মজার দিকও আছে। এই পরিবর্তনের ফলে কিরিবাতি হয়ে গেল বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা নতুন বছরকে স্বাগত জানায়।

অবশ্য শুধু কিরিবাতি নয়, ২০১১ সালে সামোয়া ও টোকেলাউ নামে আরও দুটি দ্বীপও একই কাজ করেছিল। ব্যবসার সুবিধার জন্য তারাও নিজেদের তারিখ এক দিন এগিয়ে নেয় এবং ক্যালেন্ডার থেকে ২০১১ সালের ৩০ ডিসেম্বর দিনটিকে মুছে ফেলে সরাসরি ৩১ ডিসেম্বরে চলে যায়! সময়ের এই গোলকধাঁধা আসলেই বড় অদ্ভুত!

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন