কিছু মানুষ কেন সব কাজে নিখুঁত হতে চায়

আমাদের আশপাশে হয়তো এমন অনেক মানুষ আছে, যারা কাজ করার সময় একবিন্দু ভুল সহ্য করতে পারে না। সবকিছু তাদের একদম নিখুঁত চাই। তা না হলে তাদের মনে শান্তি থাকে না। একটি কাজ বারবার করে নিখুঁত করার চেষ্টা করে তারা। এ ধরনের মানুষদের বলা হয় পারফেকশনিস্ট। কিন্তু সবাই এমন হয় না। কিছু মানুষ কেন সবকিছুতে এত নিখুঁত হতে চায়? এর পেছনের বিজ্ঞানটা আসলে কী?

বিজ্ঞানীরা এর একটি সহজ উত্তর দিয়েছেন। এই নিখুঁত হওয়ার স্বভাবের পেছনে মূলত দুটি জিনিস একসঙ্গে কাজ করে। একটি হলো আমাদের জিন, অন্যটি আমাদের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা। মানুষের জিন তার স্বভাব তৈরিতে বিশাল ভূমিকা রাখে। জিনের এই প্রভাব কিন্তু জন্মের পরই শুরু হয়।

সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের দিকে খেয়াল করলে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা যায়। প্রত্যেক শিশুর স্বভাব বা মেজাজ একদম আলাদা হয়। কোনো শিশু খুব শান্ত থাকে, আবার কোনো শিশু একটুতেই কেঁদে ওঠে। শিশুদের এই আলাদা স্বভাবগুলোই হলো তাদের ভবিষ্যতের ব্যক্তিত্বের শুরু। জিনের কারণেই এমনটা হয়।

যমজ শিশুদের নিয়ে বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি বেশ কিছু গবেষণা করেছেন। এই গবেষণাগুলো থেকে চমৎকার কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। মানুষের ব্যক্তিত্ব আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বংশগত। অর্থাৎ মা–বাবার স্বভাব সন্তানের মধ্যে বেশ ভালোভাবেই পরিবাহিত হয়।

আরও পড়ুন
যমজ ভাই
ছবি: সংগৃহীত

যমজ শিশুরা আবার দুই ধরনের হয়। এক দল দেখতে হুবহু একই রকম হয়। এদের আইডেনটিক্যাল টুইন বলা হয়। অন্য দল দেখতে আলাদা। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দেখতে এক রকম যমজদের মধ্যে স্বভাবের মিল সবচেয়ে বেশি থাকে। তাদের মধ্যে প্রবল জেদ থাকে। আত্মনিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও অনেক বেশি থাকে। তাদের জীবনের লক্ষ্য পূরণের ইচ্ছাও প্রায় একই রকম হয়। আলাদা দেখতে যমজদের তুলনায় এদের মধ্যে এই গুণগুলো পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ!

পারফেকশনিজম বা নিখুঁত হওয়ার ইচ্ছার দুটি দিক আছে। এর একটি ভালো দিক, অন্যটি খারাপ। ভালো দিকটি মানুষকে জীবনে সফল হতে খুব সাহায্য করে। নিখুঁত হওয়ার ইচ্ছার কারণে মানুষ যেকোনো কাজে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই স্বভাব তাদের জীবনে অনেক বড় বড় অর্জন এনে দেয়। কাজে সফল হলে তাদের মনে চরম সন্তুষ্টি আসে। নিজেদের ওপর তাদের আত্মবিশ্বাস ও সম্মানবোধ বহুগুণে বেড়ে যায়।

কিন্তু এর খারাপ দিকটাও বেশ ভয়ংকর। অনেক পারফেকশনিস্ট নিজের ওপর খুব কঠোর হয়। কাজের সামান্য ভুল হলে তারা নিজেকে তীব্র বকাঝকা করে। তারা সব সময় হতাশায় ভোগে। অনেক সময় নিখুঁতভাবে কাজ শেষ না হওয়ার ভয়ে কোনো কাজ শুরুই করতে চায় না। তারা শুধু কাজ ফেলে রাখে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রোক্রাস্টিনেশন বা দীর্ঘসূত্রতা। কাজের এই ভয় থেকে একসময় তারা চরম বিষণ্নতায় বা ডিপ্রেশনে ভোগে।

আরও পড়ুন

পারফেকশনিজমের এ দুটি দিকই মানুষের মূল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। মানুষের ব্যক্তিত্বকে বিজ্ঞানীরা মূলত পাঁচটি বড় ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলোকে একত্রে বলে বিগ ফাইভ। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্থিতিশীল ব্যক্তিত্ব মূলত এ পাঁচটি গুণের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।

এ পাঁচটি গুণ কী কী? এগুলো হলো নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহ, দায়িত্বশীলতা, মিশুক স্বভাব, অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ও মানসিক অস্থিরতা। পারফেকশনিস্টদের মধ্যে সাধারণত এই দায়িত্বশীলতার গুণটি অনেক বেশি থাকে। আবার খারাপ দিকটি ভারী হলে তাদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতাও বেশি দেখা যায়।

জিনের প্রভাব তো আছেই, কিন্তু আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোও এসব গুণের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে। চারপাশের পরিবেশ আমাদের ব্যক্তিত্বকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে। একজন শিশু বড় হওয়ার সময় নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। মা–বাবা বা শিক্ষকদের উৎসাহ পেলে শিশুদের মনের জোর বাড়ে।

আবার বারবার বকা খেলে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। হতাশাজনক অভিজ্ঞতার শিকার হলেও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চারপাশের পরিবেশের এই চাপ অনেক সময় মানুষকে অতিরিক্ত পারফেকশনিস্ট করে তোলে। তারা ভাবে, কাজ নিখুঁত না হলে হয়তো কেউ তাদের ভালোবাসবে না, কেউ তাদের গুরুত্ব দেবে না। এই ভয় থেকেই তারা সবকিছু নিখুঁত করতে চায়।

তাই বলা যায়, শুধু জিন একা পারফেকশনিস্ট তৈরি করে না। জিনের সঙ্গে আমাদের জীবনের ভালো ও খারাপ অভিজ্ঞতাগুলো মিলে এই স্বভাব তৈরি করে।

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস

আরও পড়ুন