আমাজন বিশ্বের দীর্ঘতম নদী, তবে বছরে মাত্র ৫ মাসের জন্য
পানির পরিমাণ ও চারপাশের বিশাল অববাহিকা উভয় দিক থেকে আমাজন নদী বিশ্বের সবচেয়ে বড় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা। এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীও হতে পারে। তবে এই তকমাটি পুরোপুরি নির্ভর করছে আমরা এর আসল উৎস বা শুরুটা কোন জায়গায় তা মেনে নিচ্ছি কি না তার ওপর। আর নদীর এই উৎস খুঁজে বের করার বিষয়টি কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে নানা কারণে বেশ বিতর্কিত।
বলা হয়ে থেকে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী পেরুর আন্দিজ পর্বতমালা থেকে তৈরি হয়েছে। এরপর এটি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশজুড়ে প্রবাহিত হয়ে শেষমেশ আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে মিশেছে।
তবে আমাজন নদী কিন্তু চিরকাল এমন ছিল না। ২০০৬ সালের কথা। রাসেল ম্যাপস নামের একজন ভূতত্ত্ববিদ তখন স্নাতক পর্যায়ের ছাত্র। তিনি আন্দিজ পর্বতমালা থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত নদীর পলিমাটি বয়ে যাওয়ার গতিপথ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ তিনি মাটির নিচে এমন কিছু খুঁজে পান, যা সেখানে থাকারই কথা ছিল না। সেগুলো হলো ‘জিরকন’ নামের একধরনের প্রাচীন রত্নপাথরের ক্ষুদ্র খণ্ড।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখলেন, এই প্রাচীন পাথরের স্তরগুলো কিন্তু তুলনামূলক নতুন তৈরি হওয়া আন্দিজ পর্বতমালা থেকে আসেনি। এগুলো নিশ্চিতভাবেই এসেছে পূর্ব দিকের কোনো অঞ্চল থেকে। এই আবিষ্কারটি ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবীর ইতিহাসের কোনো এক সময়ে আমাজন নদী আসলে এখনকার ঠিক উল্টো দিকে প্রবাহিত হতো। এই দাবির পক্ষে আরও বড় প্রমাণ মেলে যখন ওই অঞ্চলে কিছু সামুদ্রিক প্রাণীর প্রাচীন জীবাশ্ম পাওয়া যায়। আমাজন নদী অতীতে নিজের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে না ফেললে সমুদ্রের সেই প্রাণীরা কোনোভাবেই মহাদেশের এত ভেতরে এসে পৌঁছাতে পারত না।
একসময় আমাজন নদী এখনকার ঠিক উল্টো দিকে। অর্থাৎ পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হতো। এই গতিপথ বদলে যাওয়ার পেছনে বিজ্ঞানীরা প্রধানত দুটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেন। প্রথম দলটির বিজ্ঞানীদের মতে, আন্দিজ পর্বতমালা তৈরি হওয়ার আগে এই অঞ্চলের মাটির ঢাল ছিল উল্টো। ফলে নদীটি পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমের একধরনের প্রাচীন উঁচু পাহাড়ি এলাকা পুরুস আর্চ নামক অঞ্চলের দিকে বয়ে যেত। আর সেই পানি গিয়ে পড়ত প্রশান্ত মহাসাগরে।
এই বিজ্ঞানীদের যুক্তি হলো, সময়ের সঙ্গে উত্তর পূর্ব দিকের উঁচু পাহাড়গুলো ক্ষয়ে নিচু হতে থাকে। আমাজনের প্রবাহের দিকও ওলটাতে শুরু করে। একই সময়ে, একপাশে আন্দিজ পর্বতমালা উঁচু হতে থাকায় ও অন্যপাশে পুরুস আর্চ থাকায় মাঝখানে এক বিশাল নিচু অববাহিকা বা গর্তের সৃষ্টি হয়। দিনে দিনে এই নিচু এলাকা পানিতে ভরে এক বিশাল হ্রদ হয়ে যায়। একপর্যায়ে পানি উপচে পড়ে পূর্ব দিকে বইতে শুরু করে, যা আজকের পূর্বমুখী আমাজন নদীর জন্ম দেয়।
অন্যদিকে ২০১৪ সালে বিজ্ঞানীদের আরেকটি দল একটি বিকল্প ধারণার কথা বলেন। তাঁদের মতে, আন্দিজ পর্বতমালা যখন ধীরে ধীরে অনেক উঁচু হয়ে যাচ্ছিল, তখন তা বাতাস থেকে প্রচুর মেঘ আটকে দিতে শুরু করে। এর ফলে ওই অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়। এতে পেবাস জলাভূমি নামের এক বিশাল জলাশয় তৈরি হয়। বছরের পর বছর ধরে সেই জলাভূমিতে পলিমাটি জমতে জমতে একসময় পানির প্রবাহ পুরোপুরি উল্টো দিকে ঘুরে যায়।
আমাজন নদী কেন তার পথ বদলেছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিতর্ক থাকলেও, তাঁরা এক বিষয়ে একমত। আর তা হলো, নদীটির এই উল্টো দিকে পথ চলার ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় এক কোটি বছর আগে।
আমাজন নদীর সুনির্দিষ্ট কোনো একক উৎস নেই। বরং এক হাজারের বেশি উপনদীর পানি মিলে এই বিশাল নদী তৈরি হয়েছে। তবে একটি সুনির্দিষ্ট উৎস চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সংজ্ঞা ও নিয়ম নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।
২০১৪ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী নদীর উৎসকে দুইভাবে দেখা হয়। প্রথমটি হলো প্রধান উৎস, যে শাখা নদীটি সবচেয়ে বেশি পানি নিয়ে আসে। দ্বিতীয়টি হলো সবচেয়ে দূরবর্তী উৎস, যা পুরো নদী অববাহিকার মধ্যের শাখাটি সবচেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসে।
১৭০০ দশকে সবচেয়ে বেশি পানি সরবরাহের কারণে পেরুর মারানন নদীকে আমাজনের উৎস ভাবা হতো। পরে দীর্ঘতম শাখা হিসেবে উচায়ালি নদী এই খেতাব পায়। সর্বশেষ ২০১৪ সালে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকেরা দাবি করেন মানতারো নদীই আমাজনের আসল উৎস। এই নতুন হিসাব অনুযায়ী আমাজন দৈর্ঘ্যে মিসরের নীল নদকেও ছাড়িয়ে গেছে।
মানতারো নদীকে উৎস ধরার মূল সমস্যা হলো, একটি বাঁধের কারণে বছরের প্রায় পাঁচ মাস এই নদীটি শুকিয়ে থাকে। পানিবিদদের মতে, আমাজনের মতো বিশাল নদীর উৎস বছরের অর্ধেক সময় শুকনো থাকতে পারে না। তাই তারা ১২ মাস পানি প্রবাহের নতুন শর্ত যুক্ত করার কথা বলছেন। সব মিলিয়ে সহজ কথায়, মারানন, আপুরিমাক ও মানতারোর মতো প্রধান উপনদীগুলোর মিলিত স্রোতই হলো আমাজনের মূল উৎস।