পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদী কোনটি
যেকোনো নদী দেখলে মনে হতে পারে, জীবনভরই বুঝি নদীটা এখানে ছিল। কিন্তু আসলে নদীর জীবনচক্র আছে। মানে নদী জন্ম নেয়, ধীরে ধীরে বাঁক বদল করে, একসময় শুকিয়ে যায়। হারিয়ে যায় ইতিহাসের পাতা থেকে। সব নদীর জীবনকাল সমান নয়। কিছু নদী বেঁচে থাকে অনেক দিন। কিছু নদী কিছুকাল পরে হারিয়ে যায়। তো প্রশ্ন হলো, এখনো টিকে আছে, এমন নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো নদী কোনটি?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে যেতে হবে অস্ট্রেলিয়ায়। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো জীবিত নদী হলো অস্ট্রেলিয়ার ফিংক নদী। এই নদীকে স্থানীয় আদিবাসীরা আরেন্টে ভাষায় বলে ‘লারাপিন্টা’। এই নদীর বয়স ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন বছর। মানে ডাইনোসরদের আবির্ভাবের বহু আগে এর জন্ম।
ফিংক নদী আসলে একটি বিস্তৃত নদীব্যবস্থা। ছোট ছোট স্রোতধারা আর চ্যানেল মিলিয়ে ৬৪০ কিলোমিটার বা ৪০০ মাইলের বেশি এলাকাজুড়ে এটি বিস্তৃত। এটি অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরি ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের এই মধ্যভাগ অত্যন্ত শুষ্ক হওয়ায় নদীটি সারা বছর প্রবহমান থাকে না। বছরের বেশির ভাগ সময় এটি বিচ্ছিন্ন জলাধারের সারির মতো হয়ে থাকে। তখন নদীর পানি জমে থাকে গর্ত বা খাঁজে।
তবু কীভাবে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন যে এটি প্রাচীনতম নদী? গবেষকেরা আশপাশের শিলা ও পলির ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড, ক্ষয় ও আবহাওয়াজনিত পরিবর্তনের রাসায়নিক চিহ্ন এবং কিছু তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে নদীটির বয়স নির্ধারণ করেছেন। এসব প্রমাণ দেখায় যে ফিংক নদীর উৎপত্তি হয়েছিল ডেভোনিয়ান যুগে। যার সময়সীমা ৪১৯ থেকে ৩৫৯ মিলিয়ন বছর আগে। এটি কার্বনিফেরাস যুগেও হতে পারে। সেক্ষেত্রে এর জন্ম ৩৫৯ থেকে ২৯৯ মিলিয়ন বছর আগে।
নদীটি যে প্রাচীনতম তার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণগুলোর একটি হলো ‘ক্রস-অ্যাক্সিয়াল ড্রেনেজ’ নামে পরিচিত এক ভূতাত্ত্বিক অস্বাভাবিকতা। সাধারণত নদী শক্ত পাথরের স্তর, যেমন কোয়ার্টজাইটের মতো কঠিন শিলার সমান্তরালে বয়ে যায়। কারণ, পানি সব সময় সহজ পথ বেছে নেয়। কিন্তু ফিংক নদী অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকডনেল রেঞ্জ পার হওয়ার সময় শক্ত শিলাগুলোর বুক চিরে আড়াআড়ি বয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-আকৃতিবিদ ভিক্টর বেকার বলেন, এ ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে নদীটি পাহাড় তৈরির আগেই সেখানে ছিল। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অ্যান্টিসিডেন্স’। মানে ভূত্বক ধীরে ধীরে ওপরে উঠে পাহাড় তৈরি করার সময় নদীটি তার গতিপথ ধরে নিচের দিকে ক্ষয় ঘটাতে থাকে। ম্যাকডনেল রেঞ্জ বা স্থানীয় ভাষায় তেজারিতজা তৈরি হয়েছিল ‘অ্যালিস স্প্রিংস অরোজেনি’ নামে পরিচিত এক বিশাল টেকটোনিক পর্বে, যা ঘটেছিল ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে। ফলে ফিংক নদীর বয়স অন্তত পাহাড়গুলোর সমান।
এরপরের প্রমাণ আসে ক্ষয় ও আবহাওয়াজনিত পরিবর্তন থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে বাতাস, পানি ও তাপমাত্রার প্রভাবে শিলায় যে রাসায়নিক ছাপ পড়ে, তা বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, কোন পৃষ্ঠ কত দিন ধরে পরিবেশের সংস্পর্শে ছিল। পাশাপাশি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ক্ষয়ের হিসাব করে বিজ্ঞানীরা শিলার বয়স অনুমান করতে পারেন। এই সব তথ্য মিলিয়ে গবেষকেরা ফিংক নদীর ইতিহাস ও বিবর্তনের একটি বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেছেন।
তবে নদী তো চিরস্থায়ী নয়। অনেক নদী ধীরে ধীরে বড় হয়, আবার অনেক নদী হারিয়ে যায়। তাহলে ফিংক কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে রইল?
কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ববিদ এলেন ওল বলেন, কোনো নদীকে বিশাল পরিমাণ পলি এসে ঢেকে দিলে, যেমন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় নদী হারিয়ে যেতে পারে। আবার ভূপ্রকৃতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেলে, যেমন হিমবাহ এগিয়ে আসা বা সরে যাওয়ার সময় নদীর পানি নতুন পথ বেছে নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন বা মানুষের অতিরিক্ত পানি ব্যবহারেও নদী শুকিয়ে যেতে পারে।
ফিংক নদীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অস্ট্রেলিয়ার ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা। অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের মাঝখানে অবস্থান করায় মহাদেশটি গত কয়েক শ মিলিয়ন বছরে প্রায় কোনো বড় ধরনের টেকটোনিক অস্থিরতার মুখে পড়েনি। ফলে ফিঙ্কে নদীব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় বাধাহীনভাবে বিকশিত হতে পেরেছে।
ভবিষ্যতে এই নদীর কী হবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এলেন ওলের মতে, যেসব নদী দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে, তারা সাধারণত আরও কিছুকাল টিকে থাকে। তবে শুষ্ক অঞ্চলের নদীগুলো, যেমন ফিংক, মানুষের পানির ব্যবহার বাড়ার কারণে ক্রমেই বেশি চাপে পড়ছে। বিশ্বজুড়ে পানির চাহিদা বাড়ছে আর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুষ্ক অঞ্চলগুলো আরও শুষ্ক হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় ফিংকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
যদি কোনো দিন ফিংক নদী শুকিয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদীর তকমা যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ রিভারের দিকে। প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর পুরোনো এই নদী আজও যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স