বিদেশি সমুচা কীভাবে আমাদের নাশতা হলো
সমুচা নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গরম তেলে ভাজা মচমচে একটা নাশতা, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে মসলাদার পুর। বিকেলের চা হোক বা স্কুলের টিফিন, এ ছোট্ট খাবারটি বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে অনেকেই ভাবে, এটা বুঝি আমাদেরই নিজস্ব খাবার। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সমুচার যাত্রা শুরু হয়েছিল বহুদূরের দেশে। সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কীভাবে এটি বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠল, সে গল্পটাই জানা যাক।
মধ্য এশিয়া থেকে বাংলার পথে
সমুচার গল্পটার শুরু মধ্য এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের দিক থেকে। ইতিহাসবিদেরা বলেন, তখনকার ভ্রমণকারী ব্যবসায়ী ও সৈন্যরা একধরনের ছোট, ভাজা পিঠার মতো খাবার খেত। যার ভেতরে থাকত মাংস আর মসলা। সেই খাবারের নাম ছিল ‘সাম্বোসা’ বা ‘সাম্বুসাক’। সহজে বানানো যায়, বহন করা যায়। তাই লম্বা পথের জন্য এটি ছিল আদর্শ খাবার।
এই খাবার ধীরে ধীরে পারস্য, আফগানিস্তান হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। বিশেষ করে দিল্লির সুলতানি আর মোগল আমলে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখনকার রাজদরবারে মাংস ভরা সমুচা ছিল বেশ অভিজাত খাবার; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলায় এই খাবার পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগেনি। বাণিজ্য, শাসনব্যবস্থা আর সংস্কৃতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে অনেক বিদেশি খাবারের মতো সমুচাও ঢুকে পড়ে বাংলার খাদ্যভান্ডারে। তবে এখানে এসে এটি একদম নিজের মতো করে বদলে যায়।
বাংলার স্বাদে বদলে যাওয়া সমুচা
বাংলায় এসে সমুচা শুধু নামেই নয়, স্বাদেও বদলে যায়। এখানকার মানুষ মাংসের পাশাপাশি আলু, মটরশুঁটি, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ দিয়ে নতুন ধরনের পুর তৈরি করতে শুরু করে। ফলে জন্ম নেয় আমাদের পরিচিত শিঙাড়া ও সমুচা, যা দেখতে কাছাকাছি হলেও স্বাদে আলাদা।
বাংলার সমুচা সাধারণত একটু ছোট, মচমচে ও বেশি মসলাদার হয়। অনেক সময় এতে কিমা বা ডালের পুর দেওয়া হয়। আবার রমজানের সময় যে সমুচা পাওয়া যায়, সেগুলোর ভেতরে নুডলস, সবজি বা মিশ্র পুরও থাকতে পারে। এ বৈচিত্র্যই দেখায়, বাঙালিরা কীভাবে একটি বিদেশি খাবারকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে।
আরেকটা বড় বিষয় হলো বাংলার রান্নায় মসলার ব্যবহার। গরমমসলা, ধনে, জিরা, মরিচ—এই সবকিছুর মিশ্রণে সমুচার স্বাদ হয়ে ওঠে একদম আলাদা। ফলে এটি আর শুধু ‘বিদেশি খাবার’ থাকে না, হয়ে ওঠে একেবারে দেশি স্বাদের অংশ।
চা-নাশতা আর টিফিনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী
আজকের দিনে সমুচা শুধু একটা খাবার নয়, এটি একটা অভ্যাস, একটা সংস্কৃতি। বিকেলের দিকে রাস্তার দোকানে গেলে দেখা যাবে গরম তেলে সমুচা ভাজা হচ্ছে। পাশে লোকজন চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই খুব পরিচিত।
স্কুল-কলেজের ক্যানটিনেও সমুচা খুব জনপ্রিয়। কম দামে পাওয়া যায়, পেটও ভরে। তাই কিশোরদের কাছে এটি খুব প্রিয়। বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিতে দিতে এক প্লেট সমুচা ভাগাভাগি করে খাওয়া, এটাও এখনকার তরুণদের জীবনের একটা অংশ।
মজার ব্যাপার হলো, সমুচা এখন শুধু ঘরোয়া বা রাস্তার খাবারেই সীমাবদ্ধ নেই। অনেক রেস্টুরেন্টেও এটি নতুনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে—কখনো চিজ দিয়ে, কখনো ফিউশন স্টাইলে।