আমরা কেন দিনে তিনবেলা খাবার খাই

আগেকার দিনে লাঞ্চ বলে আলাদা কোনো খাবারের অস্তিত্ব ছিল না

বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষই মনে করে দিনে তিনবার খাবার খাওয়াই বুঝি স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু মানুষের এই অভ্যাস সব সময় এমন ছিল না। অনেকে আবার এখন সকালের নাশতা না খেয়েই দিন শুরু করে। অথচ বিজ্ঞান বলছে, সকালের নাশতা আমাদের সারা দিন সজাগ ও চনমনে রাখতে সাহায্য করে। পড়াশোনা বা যেকোনো কাজে মন বসাতেও এর বড় ভূমিকা আছে। বিশেষ করে ছোটদের মেধাবিকাশ ও স্বভাব গঠনে সকালের নাশতা খুবই জরুরি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, দিনে ঠিক তিনবার খাবার খাওয়ার এই প্রচলনটা আসলে এল কীভাবে? আর কে-ই বা আমাদের জীবনের এই নিয়মটি ঠিক করে দিলেন যে আমাদের দিনে তিনবারই খেতে হবে?

তাহলে সকালের খাবার দিয়েই শুরু করা যাক। আমরা এখন নিয়মিত সকালে নাশতা খেলেও ইতিহাসে সব সময় এর অস্তিত্ব ছিল না। প্রাচীন রোমানরা মনে করত দিনে একবার খাওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য সেরা। আর বেশি খাওয়া মানেই পেটুকতা। তাই তারা সকালের নাশতাকে একদমই পছন্দ করত না।

‘ব্রেকফাস্ট’ শব্দটি মূলত এসেছে মধ্যযুগের সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে। সারা রাত না খেয়ে থাকার পর সকালে প্রার্থনা শেষে তারা প্রথম খাবার খেত। এই উপবাস ভাঙা থেকেই নাম হয়েছে ‘ব্রেকফাস্ট’ (Break-Fast)।

আরও পড়ুন
বিশ্বের অন্যান্য দেশে ১৯৫০-এর দশকে টোস্টার বা কফির চল শুরু হলে সকালের নাশতা এর ওপর গড়ে ওঠে। তবে আমাদের দেশের চিরচেনা সকালের নাশতা কিন্তু গড়ে উঠেছে একেবারে ভিন্নভাবে।

১৭ শতকের দিকে নাশতা খাওয়ার চল সব ধরনের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সময় ধনীদের টেবিলে কফি, চা আর ডিমের নানা পদ দেখা যেত। এমনকি বড় বড় বাড়িতে নাশতা খাওয়ার জন্য আলাদা ঘরও তৈরি করা হয়েছিল। উনিশ শতকে এই আয়োজন আরও রাজকীয় হয়ে ওঠে। তখন সকালে একসঙ্গে ২৪টি পদ পরিবেশন করা হতো।

সাধারণ মানুষের কাছে নাশতা জরুরি হয়ে ওঠে শিল্পবিপ্লবের সময়

সাধারণ মানুষের কাছে নাশতা জরুরি হয়ে ওঠে শিল্পবিপ্লবের সময়। কারখানায় দীর্ঘ সময় কাজ করার জন্য শ্রমিকদের শরীরে শক্তির প্রয়োজন ছিল। তাই কাজে যাওয়ার আগে খাওয়ার অভ্যাস শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জন হার্ভে কেলগ ভুলবশত বাসি ভুট্টা থেকে তৈরি করেন কর্নফ্লেক, যা এখন সারা বিশ্বের সকালের নাশতা।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে ১৯৫০-এর দশকে টোস্টার বা কফির চল শুরু হলে সকালের নাশতা এর ওপর গড়ে ওঠে। তবে আমাদের দেশের চিরচেনা সকালের নাশতা কিন্তু গড়ে উঠেছে একেবারে ভিন্নভাবে। একটা সময় আমাদের নাশতা মানেই ছিল রাতের বেঁচে যাওয়া পান্তা ভাত কিংবা গরম গরম মুড়ি-মুড়কি। কৃষক পরিবারে কাজে যাওয়ার আগে এই পান্তা ভাতই ছিল শক্তির প্রধান উৎস। ধীরে ধীরে সেখান থেকে আমরাও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো নাশতা শুরু করেছি।

আরও পড়ুন
মধ্যযুগে বিদ্যুৎ ছিল না বলে মানুষ দিনের আলো থাকতেই অর্থাৎ দুপুরবেলাতেই তাদের এই রাজকীয় ‘রাতের খাবার’ খেয়ে নিত।

আগেকার দিনে লাঞ্চ বলে আলাদা কোনো খাবারের অস্তিত্ব ছিল না। রোমান সময় থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত দিনের প্রধান খাবারটি ঠিক দুপুরেই খাওয়া হতো, যাকে বলা হতো ডিনার। তখন মানুষ খুব ভোরে কাজে বের হতো এবং কয়েক ঘণ্টা খাটুনির পর দুপুরের দিকে ভীষণ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ত। এই ক্ষুধা মেটাতে তারা দ্রুত হাতে ধরে খাওয়া যায় এমন কিছু হালকা নাশতা করে নিত। ইউরোপে প্রচলিত ছিল ‘নাঞ্চিয়ন’। তেমনি আমাদের দেশে কৃষকেরা মাঠে বসেই দুপুরের খাবার সেরে নিতেন। আবার বিকাল পর্যন্ত কাজ করতেন। মূলত এই সাময়িক ক্ষুধা মেটানোর ধারণা থেকেই আজকের আধুনিক ‘লাঞ্চ’ শব্দের জন্ম।

তবে দুপুরের খাবারকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে শিল্পবিপ্লব। কারখানায় দীর্ঘ সময় কাজ করা শ্রমিকদের টিকে থাকার জন্য তখন ভরপুর খাবারের প্রয়োজন ছিল। উনিশ শতকের দিকে অফিসকর্মীদের জন্য এক ঘণ্টা লাঞ্চ ব্রেকের নিয়ম চালু হলেও বর্তমানে আমরা ব্যস্ততার চাপে কম্পিউটারের সামনে বসে মাত্র ১৫ মিনিটে খাবার সেরে ফেলি। এটি আদতে সেই প্রাচীন যুগের দ্রুত ক্ষুধা মেটানোর প্রথাটিকেই আধুনিক দিনেও কাজ করছে।

রাঁধুনিরা ভোর থেকে রান্না শুরু করতেন যাতে দুপুরের মধ্যে সব প্রস্তুত হয়ে যায়

তবে রাতের খাবার এসেছে প্রাচীন রোমানদের থেকে। তাদের কাছে রাতের খাবার বা ‘ডিনার’ ছিল দিনের প্রধান আয়োজন। মধ্যযুগে বিদ্যুৎ ছিল না বলে মানুষ দিনের আলো থাকতেই অর্থাৎ দুপুরবেলাতেই তাদের এই রাজকীয় ‘রাতের খাবার’ খেয়ে নিত। রাঁধুনিরা ভোর থেকে রান্না শুরু করতেন যাতে দুপুরের মধ্যে সব প্রস্তুত হয়ে যায়। সাধারণ কৃষকেরাও দুপুরে ডিনার করতেন, তবে তাঁদের আয়োজন ছিল খুব সাধারণ। পরবর্তী সময়ে বাতি বা কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বাড়লে রাতের সময় ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে পিছিয়ে যেতে থাকে। এখন যা মধ্যরাত পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।

১৮ শতকের দিকে শহরগুলোতে মানুষ দিনে তিনবার খাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ১৯ শতকের শুরুতে কাজ শেষে ঘরে ফিরে পরিবারের সবার সঙ্গে মিলেমিশে রাতের খাবার খাওয়াই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, যা এখন আর দেখা যায় না তেমন একটা।

সূত্র: হিস্টোরি ফ্যাক্ট, মেটাবলিক, ক্রাস্ট ফুড সার্ভিস, বিবিসি হিস্টোরি

আরও পড়ুন