অন্যের বিপদে কি পশুপাখিরাও আনন্দ পায়

২০২৩ সালের ঘটনা। জ্যাক নামের একটি আফ্রিকান ধূসর তোতা পাখি ভাইরাল হয়। কারণটি ছিল বেশ অদ্ভুত। তোতা পাখিটি তার মালিকের বাবার কাশি আর শ্বাসকষ্টের আওয়াজ হুবহু নকল করতে পারত। ওই ভদ্রলোক ফুসফুসের জটিল রোগে ভুগছিলেন ও তাঁর প্রায়ই মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হতো।

তবে জ্যাক কিন্তু শুধু কাশির আওয়াজ নকল করার জন্য ভাইরাল হয়নি। পেছনের ঘটনাটি ছিল আরও অদ্ভুত। যে মানুষটিকে জ্যাক হয়তো একদমই পছন্দ করত না, তাঁর কষ্ট দেখেই নাকি তোতা পাখিটি দারুণ আনন্দ পেত। ভিডিওতে তোতার মালিক দাবি করেন, তাঁর বাবার কাশির বিশেষ ভঙ্গিটি তোতা পাখির খুব পছন্দের ছিল।

তোতা পাখিটির এই আচরণে মানুষের একটি জটিল মানসিক অনুভূতির মিল পাওয়া যায়। এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘শ্যাডেনফ্রয়ডে’ (Schadenfreude)। এটি একটি জার্মান শব্দ, যার সহজ অর্থ হলো অন্যের ক্ষতি বা কষ্ট দেখে আনন্দ পাওয়া। খেলায় অপছন্দের কোনো দলের হেরে যাওয়া কিংবা অপছন্দের বন্ধুর হাত থেকে আইসক্রিম পড়ে যাওয়ার পর মনে একধরনের আনন্দ জাগে, সেটাই হলো শ্যাডেনফ্রয়ডে।

আরও পড়ুন

ভুল করে পায়ে ব্যথা পাওয়ার দৃশ্য দেখে অনেক সময় পোষা বিড়ালটিকে বেশ খুশি মনে হয়। এমন ঘটনা দেখলে মালিকদের মনে হতেই পারে, পশুপাখিরাও মানুষের কষ্টে আনন্দ পাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, পশুপাখিরা কি সত্যিই এমন জটিল মনের ভাব বুঝতে পারে? নাকি এটি মানুষের শুধুই একপ্রকার ভুল ধারণা? মানুষ কি প্রাণীদের মধ্যেও নিজেদের মতো চিন্তাভাবনা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে?

পশুপাখির আচরণ ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁদের মতে প্রাণীরা সম্ভবত ‘শ্যাডেনফ্রয়ডে’ অর্থাৎ অন্যের বিপদে আনন্দ পাওয়ার মতো জটিল অনুভূতি বুঝতে পারে না। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এই বিষয়কে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর মূল কারণ হলো, প্রাণীদের মনের ভাষা বোঝার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা। তা ছাড়া আবেগ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি এবং প্রাণীরা তা কীভাবে প্রকাশ করে, সেই জটিল প্রশ্নের সঙ্গেও বিষয়টিকে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের অক্সিডেন্টাল কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জ্যাকারির সিলভার। তিনি জানান, কিছু পাখি মানুষের মতো কথা বলতে পারলেও নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না। এদের এমন সূক্ষ্ম আবেগ নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত কঠিন। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যে ধরনের নিখুঁত প্রমাণ প্রয়োজন হয়, এ ক্ষেত্রে তা পাওয়া বেশ কষ্টকর।

আরও পড়ুন

কোনো পশুপাখি ঠিক কেমন অনুভব করছে, তা বুঝতে বিজ্ঞানীরা সাধারণত এদের শরীরের অঙ্গভঙ্গি, মস্তিষ্কের সংকেত বা হরমোনের পরিবর্তন খেয়াল করেন। কোনো কুকুর যদি লেজ গুটিয়ে কান পেছনের দিকে টেনে রাখে, তবে বোঝা যায় সে কোনো কারণে মন খারাপ বা ভয় পেয়েছে। আবার আনন্দের সঙ্গে লেজ নাড়াতে দেখলে বোঝা যায় সে ভালো অনুভব করছে।

তবে অধ্যাপক সিলভার মনে করেন, শুধু ভালো কিংবা খারাপ অনুভূতির বাইরে নির্দিষ্ট আবেগটিকে চিহ্নিত করা বেশ শক্ত। কারণ, পশুপাখির তো আর কথা বলার ভাষা নেই। লেজ নাড়ানো দেখে হয়তো মনে হতে পারে কুকুরটি খুব খুশি। কিন্তু হতে পারে সে নতুন কিছু দেখে কেবল কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। তাই নির্দিষ্ট কোন অনুভূতিটি কাজ করছে, তা নিশ্চিত হয়ে বলা সত্যিই কঠিন।

বিজ্ঞানীরা কোনো শক্ত প্রমাণ ছাড়া পশুপাখির ওপর মানুষের গুণ চাপিয়ে দিতে চান না। যেমন কোনো পোষা বিড়াল বা কুকুর যখন কেঁদে ওঠা মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন তা নিঃস্বার্থ ভালোবাসার চেয়েও অনেক সময় পুরোনো অভ্যাসের কারণে হতে পারে। হয়তো আগে এমন মন খারাপের মুহূর্তে পাশে যাওয়ার পর সে খাবার বা আদর পেয়েছিল। একইভাবে তোতা পাখি জ্যাক হয়তো অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ পাচ্ছিল না, কেবল সবার মনোযোগ কাড়ার জন্যই কাশির শব্দ হুবহু নকল করছিল।

আরও পড়ুন

অন্যের বিপদে আনন্দ পাওয়ার জন্য অন্যের মনের অবস্থা বোঝার ক্ষমতা প্রয়োজন, যাকে বিজ্ঞানে বলা হয় থিওরি অব মাইন্ড। গবেষকদের মতে, কুকুরের মতো প্রাণীদের মধ্যে এই বোধ খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের। ফলে মানুষের মতো অন্যের কষ্টে আনন্দ পাওয়ার জটিল আবেগ এদের থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

তবে শিম্পাঞ্জির মতো সামাজিক ও বুদ্ধিমান প্রাণীদের ক্ষেত্রে এমন আচরণ কিছুটা দেখা যেতে পারে। কারণ, দলে বাস করার কারণে একজনের ক্ষতি অন্যজনের সুবিধায় আসতে পারে। আবার কাকজাতীয় পাখির মধ্যেও গভীর আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও ন্যায়বোধের প্রমাণ মেলে।

বিজ্ঞানীদের মতে, পশুপাখির আবেগ বোঝার গবেষণা কেবল শুরু হয়েছে। তাই এরা আসলেই অন্যের বিপদে আনন্দ পায় কি না, তা নিশ্চিত করে বলার মতো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স
আরও পড়ুন