দুই ভাইয়ের অভিযানে যেভাবে পাল্টে যাচ্ছে পৃথিবীর মানচিত্র

এরিক গিলবার্টসন ও ম্যাথু গিলবার্টসন, যারা মাপছেন সর্বোচ্চ পর্বতগুলোর উচ্চতানিউইয়র্ক টাইমস

এরিক গিলবার্টসন ও ম্যাথু গিলবার্টসন যমজ ভাই। ছোটবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির পাহাড়ে দাপিয়ে বেড়াতেন। বড় হয়ে এমআইটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করেছেন। কিন্তু পাহাড়ের নেশা তাঁদের পিছু ছাড়েনি।

২০২০ সালে এরিক ভাবলেন, কলোরাডোর ১০০টি উঁচু পাহাড় জয় করবেন। কিন্তু একটা পাহাড়ে উঠে তাঁর খটকা লাগল। মনে হলো, সরকারি নথিতে পাহাড়ের উচ্চতা আর আকৃতি যা লেখা আছে, বাস্তবের সঙ্গে তা মিলছে না!

ব্যস, শুরু হলো তাঁদের নতুন এক অভিযান। দুই ভাই ঠিক করলেন, তাঁরা শুধু পাহাড় জয় করবেন না, পাহাড়ের উচ্চতা মেপে দেখবেন সরকারি নথিতে তথ্য ঠিক আছে কি না!

এরিক দেখলেন, কলোরাডোর বিখ্যাত ক্রেস্টোন পিকের পাশের আরেকটি শৃঙ্গ আসলে কিছুটা উঁচু হতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার উপায় কী? উপায় একটাই, ওখানে গিয়ে ফিতা বা যন্ত্র দিয়ে মাপা।

এই দুই ভাই যখন পাহাড়ে যান, তখন খাবার ও তাঁবুর সঙ্গে থাকে ডিফারেনশিয়াল গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেমের মতো আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। এই যন্ত্রগুলো সাধারণ জিপিএসের চেয়ে হাজার গুণ বেশি নিখুঁত।

আরও পড়ুন

এরিক আবার গেলেন সেই পাহাড়ে। ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়টির চূড়ায় উঠলেন। এরিক এই পাহাড়ের নাম দিয়েছেন ইস্ট ক্রেস্টোন, তাই এই লেখায় পাহাড়টিকে আমরা এ নামেই ডাকব। যাহোক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁরা ডেটা নিলেন। পরে দেখা গেল, ইস্ট ক্রেস্টোন আসলে ক্রেস্টোন পিকের চেয়ে এক ফুটের তিন ভাগের এক ভাগ উঁচু! অর্থাৎ, ১০০ বছর ধরে মানুষ যাকে সর্বোচ্চ চূড়া ভেবে জয় করে আসছে, সেটা আসলে ভুল ছিল!

গিলবার্টসন ভাইদের লক্ষ্য শুধু আমেরিকায় থেমে থাকেনি; তাঁরা ঠিক করেছেন, পৃথিবীর সব দেশের সর্বোচ্চ চূড়া জয় করবেন এবং সেগুলোর উচ্চতা মেপে দেখবেন। এখন পর্যন্ত তাঁরা ১৪৯টি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছেন। আর এই অভিযানে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ সব তথ্য।

সৌদি আরবে গিয়ে তাঁরা দেখলেন, সরকারিভাবে যে পাহাড়টিকে (জাবাল সাওদা) সবচেয়ে উঁচু বলা হয়, আসলে তার চেয়ে জাবাল ফেরওয়া পাহাড়টি ১০ ফুট বেশি উঁচু! গাম্বিয়া, উজবেকিস্তান, টোগো আর গিনি-বিসাউতেও তাঁরা একই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। উজবেকিস্তানের নতুন সর্বোচ্চ চূড়া মাপতে তাঁদের ২০ মাইল পথ হেঁটে দুর্গম পাহাড়ে দুবার চড়তে হয়েছে!

আরও পড়ুন
দুই ভাই পাহাড়ের উচ্চতা মেপে দেখবেন সরকারি নথিতে তথ্য ঠিক আছে কি না
নিউইয়র্ক টাইমস

এখন প্রশ্ন হলো, তাঁদের এই মাপায় কি মানচিত্র বদলাবে? দুই ভাই সাতটি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ার নামই বদলে দিয়েছেন তাঁদের নিখুঁত ডেটা দিয়ে। কলম্বিয়া আর বতসোয়ানাতেও নতুন সর্বোচ্চ চূড়ার খোঁজ দিয়েছেন তাঁরা। কলম্বিয়ার আগের সর্বোচ্চ চূড়াটি বরফে ঢাকা ছিল, যা এখন গলে ছোট হয়ে গেছে।

এমনকি আমেরিকার মাউন্ট রেইনিয়ারের সর্বোচ্চ বিন্দুও এখন আর কলম্বিয়া ক্রেস্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলে যাওয়ায় এর দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি পাথুরে অংশ এখন ১০ ফুট বেশি উঁচু হয়ে গেছে।

সমস্যা হলো, যে কেউ মাপলেই তো আর ম্যাপ বদলে যাবে না। আমেরিকার জিওলোজিক্যাল সার্ভে বা অন্যান্য দেশের সরকারি সংস্থাগুলো হুট করে ম্যাপ বদলাতে চায় না। কলোরাডোর নতুন চূড়া ইস্ট ক্রেস্টোনের নাম সরকারিভাবে পাস হতে হয়তো বছর কয়েক লেগে যাবে।

কিন্তু গিলবার্টসন ভাইয়েরা থামছেন না। এরিক বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সত্যটা খুঁজে বের করা।’ ১৯২০-এর দশকে এভারেস্টের প্রথম দিকের অভিযানে অংশ নেওয়া বিখ্যাত ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালরি বলেছিলেন, পাহাড় আছে বলেই তিনি পাহাড়ে চড়েন। আর এই দুই ভাই পাহাড়ে চড়েন এটা নিশ্চিত হতে যে পাহাড়টা আসলেই যতটা বলা হয়েছে, ততটা আছে কি না!

পৃথিবীর মানচিত্র বদলাক আর না বদলাক, এই দুই ভাইয়ের অভিযানে বিজ্ঞানের জয় হচ্ছে ঠিকই। কে জানে, হয়তো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়টাও আসলে ভুল মাপা আছে!

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন