উগান্ডার পথশিশুদের নিয়ে বিশ্বকাপের গানে শাকিরা
২০১৪ সালের কথা। একটা ভিডিও নিয়ে বেশ কথা হয়। ভিডিওতে উগান্ডার এক ধুলোমাখা রাস্তায় খালি পায়ে নেচেছিল কয়েকটি শিশু। কে জানত, সেই অবহেলা আর অভাবের নাচই একদিন তাদের পৌঁছে দেবে বিশ্বমঞ্চে। উগান্ডার সেই অনাথ আর অসহায় শিশুদের নিয়ে গড়ে ওঠা নৃত্যদল ‘গেটো কিডস’ এবার যাচ্ছে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। যেখানে অনুষ্ঠিত হবে এবারের ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ। নিজেদের অবিশ্বাস্য ও আনন্দময় নৃত্যশৈলী দিয়ে ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাখ লাখ মানুষের মন জয় করেছে দলটি। এবার তারা হাজির হচ্ছে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর সামনে।
পপ তারকা শাকিরা গত সপ্তাহে এক ঘোষণায় জানান, আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে তাঁর সঙ্গে পারফর্ম করবে এই শিশুরা। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম সং শাকিরার ‘ডাই ডাই’ গানের মিউজিক ভিডিওতেও গেটো কিডস নেচেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা একটি ভিডিওতে শাকিরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি উগান্ডার গেটো কিডসদের ইতিমধ্যে ফাইনালে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।’ পরিবেশনাটিকে ফুটবল ইতিহাসে অবিস্মরণীয় করে রাখতেই তিনি এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন।
‘আমরা সবাই ভীষণ উত্তেজিত!’ গত সপ্তাহে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলে গেটো কিডসের সদস্যরা। তাদের চোখেমুখে তখন বিশ্বমঞ্চে নাচার আনন্দ। দলের মাত্র ১১ বছর বয়সী খুদে সদস্য তিয়োমা কেইশা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলল, ‘আমাদের ভেতর যে কী দারুণ প্রতিভা লুকিয়ে আছে, তা পুরো বিশ্বকে দেখানোর জন্য আমি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারছি না।’
উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার এই দলে রয়েছে ৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৬০টি শিশু। এদের সবার জীবনই কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। কয়েক দশকের যুদ্ধ আর তীব্র অভাবের কারণে উগান্ডায় প্রায় ১৭ লাখ শিশু অনাথ হয়ে পড়েছে। যাদের অনেকেরই আশ্রয় হয়েছে এই দলে।
মজার ব্যাপার হলো, পপ তারকা শাকিরা নিজে থেকে আমন্ত্রণ জানানোর অনেক আগে থেকেই এই গেটো কিডস তাঁর গানের তালে নাচত। ২০১০ সালে আফ্রিকার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘ওয়াকা ওয়াকা’র সঙ্গেও তারা দুর্দান্ত পারফর্ম করে নজর কেড়েছিল। এবার সেই কলম্বিয়ান সুপারস্টারের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে, বিশ্বকাপের কোটি কোটি দর্শকের সামনে নাচার সুযোগ পাওয়াটা এই শিশুদের কাছে রূপকথার মতো।
গেটো কিডসের ১৫ বছর বয়সী সেগিরিনিয়া মাদওয়ানা কিং বলে, ‘আমরা তো সব সময়ই শাকিরার গানে নাচতাম, তাই তাঁর আমন্ত্রণের খবরটা পেয়ে আমাদের মন আনন্দে ভরে গিয়েছিল। খবরটা শুনে আমরা খুশিতে লাফালাফি শুরু করেছিলাম, সবাই মিলে দারুণ উদ্যাপন করেছি।’
আমেরিকান স্টাইলে সুপার বোলের মতো জমকালো হাফটাইম শো এবার যুক্ত হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপেও। যেখানে থাকবেন শাকিরা, ম্যাডোনা ও বিটিএসের মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা। ১১ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাজুড়ে শুরু হতে যাওয়া এই ফুটবল বিশ্বকাপে এটিই হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক উদ্ভাবন। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, গত বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি বিশ্বজুড়ে প্রায় এক বিলিয়নেরও বেশি দর্শক উপভোগ করেছিলেন। আর এবার সেই বিশাল দর্শকদের সামনেই পারফর্ম করার সুযোগ হচ্ছে উগান্ডার গেটো কিডসদের।
পপ তারকা শাকিরার কাছ থেকে ফাইনাল মঞ্চের আমন্ত্রণ পেয়ে বেশ আনন্দে এই নাচের দলে। মূলত একটি চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশনের হাত ধরে এই গেটো কিডস দলটির জন্ম। যারা উগান্ডার অসহায় ও অনাথ শিশুদের আশ্রয় এবং দেখভাল করে থাকে। আর এ মহৎ উদ্যোগটি নিয়েছিলেন দলটির বর্তমান ম্যানেজার দাউদা কাভুমা।
দলটির নাচ প্রথম সবার নজরে আসে ২০১৪ সালে। সে সময় দলটির পাঁচ শিশু উগান্ডার জনপ্রিয় গায়ক এডি কেনজোর ‘সিটিয়া লস’ গানের সঙ্গে একটি চমৎকার নাচের ভিডিও তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে। গায়ক নিজে সেই ভিডিওটি তাঁর প্রোফাইল থেকে শেয়ার করার পরপরই তা ভাইরাল হয়ে যায়। এর পর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাদের। দিনবদলের সঙ্গে ইউটিউব ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ভিডিওগুলোর মান আরও উন্নত হতে থাকে। একসময় ধুলোমাখা রাস্তায় খালি পায়ে নাচা সেই শিশুদের পায়ে এখন জুতা দেখা যায়, আর তাদের নাচের কোরিওগ্রাফিও হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও পেশাদার।
তবে এই স্বপ্নের মধ্যেও কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এক স্বাস্থ্যগত সংকটের কারণে। উগান্ডার প্রতিবেশী দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে মারাত্মক ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। সেটি যেন উগান্ডায় ছড়াতে না পারে, সে জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে দেশটির সরকার। ইতিমধ্যে উগান্ডায় বেশ কয়জন ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উগান্ডা কর্তৃপক্ষ কঙ্গোর সঙ্গে তাদের সীমান্ত জরুরি ভিত্তিতে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিয়মের কারণে ২১ দিনের মধ্যে যাঁরা কঙ্গো, উগান্ডা বা দক্ষিণ সুদান ভ্রমণ করেছেন, মার্কিন নাগরিক ছাড়া তাঁদের সবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ আপাতত নিষিদ্ধ। এত সব বাধা সত্ত্বেও ম্যানেজার কাভুমা কিন্তু হাল ছাড়ছেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।’