পুদিনাপাতা খেলে মুখে ঠান্ডা অনুভূত হয় কেন
পুদিনাপাতা মুখে দিলে বা পুদিনা স্বাদের কিছু চিবোলে পুরো মুখে একটা ঠান্ডা ভাব টের পাওয়া যায়। পুদিনাপাতা বরফের মতো ঠান্ডা কিছু নয়। আবার এটি ফ্রিজ থেকেও বের করা হয়নি। স্বাভাবিক তাপমাত্রার একটি পাতা মুখে দেওয়ার পরও মুখ এমন ঠান্ডা হয়ে যায় কেন? আসলে পুদিনার ভেতরে এমন কী আছে, যা কোনো বরফ ছাড়াই আমাদের মুখে এই ঠান্ডার অনুভূতি তৈরি করে?
পুদিনাপাতা মুখে দিলে যেমন ঠান্ডা লাগে, আর মরিচ খেলে যে ঝাল লাগে—এই দুটি বিষয়ের মধ্যে কিন্তু সম্পর্ক আছে। পুদিনা আর মরিচগাছের এই অদ্ভুত গুণের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এদের ভেতর তৈরি হওয়া বিশেষ কিছু উপাদানের মধ্যে। মরিচের মধ্যে থাকে ক্যাপসাইসিন নামের একটি উপাদান, আর পুদিনায় থাকে মেন্থল।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোটি কোটি বছর আগে এই গাছগুলোর পূর্বপুরুষেরা নিজেদের লতাপাতা খাওয়া বিভিন্ন প্রাণীর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই রাসায়নিকগুলো তৈরি করেছিল। যাতে কোনো প্রাণী এদের খেতে এলে ঝাল বা ঠান্ডার কারণে পাতা না খেয়ে পালিয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মোনেল কেমিক্যাল সেন্সেস সেন্টারের বিজ্ঞানী পল ওয়াইজ জানান, গাছপালা মূলত নিজেদের বাঁচানোর জন্যই শরীরের ভেতর এসব রাসায়নিক তৈরি করেছিল। প্রকৃতির মধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ে এরা একসময় এমন কিছু উপাদান পেয়ে যায়, যা শত্রুদের হাত থেকে এদের রক্ষা করতে দারুণ কাজ করে।
যেসব গাছ এই রাসায়নিক যৌগগুলো তৈরি করত, বনের পশুপাখিরা সেগুলো কম খেত। ফলে এই গাছগুলো সহজে মারা যেত না এবং বংশবৃদ্ধি করার জন্য যথেষ্ট দিন বেঁচে থাকত। এরা নিজেদের বীজ ছড়িয়ে দিতে পারত এবং এদের জিন পরবর্তী প্রজন্মের গাছের মধ্যে পৌঁছে দিত।
গাছদের টিকে থাকার এই লড়াইয়ের কারণেই পুদিনাপাতা ভেতরে মেন্থল তৈরি করে। কিন্তু এই পুদিনাপাতা মুখে দিলে আমাদের কেন ঠান্ডা লাগে? সহজ কথায় এর উত্তর হলো, মেন্থল আসলে আমাদের শরীরকে ধোঁকা দিয়ে ঠান্ডার অনুভূতি তৈরি করায়। অথচ বাস্তবে আমাদের মুখের ভেতর মোটেও ঠান্ডা হয়ে যায় না। মেন্থল ও মরিচের ক্যাপসাইসিন উভয় উপাদানই আমাদের শরীরের সেন্সরি সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। এই সিস্টেম স্পর্শ, তাপমাত্রা ও ব্যথার মতো বিষয়গুলো বুঝতে পারে। নিউরনের এই জটিল নেটওয়ার্কটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় সোমাটোসেন্সরি সিস্টেম বলা হয়। এটি আমাদের স্বাদ ও গন্ধ বোঝার সাধারণ ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির প্রাণরসায়নের সহযোগী অধ্যাপক সিওক–ইয়ং লি এই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, ‘আমাদের ত্বকের ঠিক নিচেই এমন কিছু বিশেষ নিউরন বা স্নায়ুকোষ থাকে, যা গরম ও ঠান্ডার মতো আলাদা আলাদা অনুভূতি টের পেতে পারে। এই নিউরনগুলো এদের কোষের দেয়ালে থাকা কিছু বিশেষ প্রোটিন ব্যবহার করে চারপাশের পরিবেশের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে। এই প্রোটিনগুলো কোষের গায়ে আয়ন চ্যানেল নামের কিছু ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে, যা কোষের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন উপাদান যাতায়াত করতে সাহায্য করে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই রিসেপ্টর প্রোটিনটি তার নির্দিষ্ট উদ্দীপনা খুঁজে না পায়, ততক্ষণ এই আয়ন চ্যানেলগুলো বন্ধ থাকে।’
কোনো বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ অনুভব করার সঙ্গে সঙ্গেই এই প্রোটিনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন এরা আয়ন নামের কিছু অতি ক্ষুদ্র কণাকে কোষঝিল্লি বা কোষের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়। বাইরের জগৎ থেকে আসা এই নতুন আয়নগুলো কোষের ভেতর একটি ছোট্ট বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে। একে বলা হয় অ্যাকশন পটেনশিয়াল। আমাদের নিউরন বা স্নায়ুকোষগুলো এই সংকেতটিকেই সরাসরি মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়।
এই অ্যাকশন পটেনশিয়াল মস্তিষ্কে গিয়ে বার্তা দেয়, জিবের কিছু ঠান্ডা–সংবেদী রিসেপ্টর বা গ্রাহক কোষ এখন সক্রিয় হয়েছে। মস্তিষ্ক এই বার্তা পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয় যে জিব ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমাদের শরীরের বেশির ভাগ রিসেপ্টর প্রোটিনই এমনভাবে তৈরি, যাতে এরা নির্দিষ্ট কোনো একটি উদ্দীপনা পেলেই কেবল এদের আয়ন চ্যানেলের পথগুলো খুলে দেয়। বিজ্ঞানীরা যে বিশেষ প্রোটিনকে টিআরপিএম–৮ বলেন, সেটি মূলত ঠান্ডার অনুভূতি বোঝার কাজ করে। তুমি যখন একটি বরফ–ঠান্ডা আইসক্রিম খাও, তখন এই প্রোটিন সক্রিয় হয়ে ওঠে।
পুদিনাপাতা তোমার মুখে যে ঠান্ডা অনুভূতি দেয়, তার আসল কারণ হলো মেন্থল অণু। এই অণু সরাসরি টিআরপিএম–৮ রিসেপ্টরগুলোকে এদের আয়ন চ্যানেলের পথ খুলতে বাধ্য করে। এর ফলে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে একটি বৈদ্যুতিক সংকেত বা অ্যাকশন পটেনশিয়াল পৌঁছায়। মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুতের এই ক্ষুদ্র সংকেতটিকে জিবের ঠান্ডা হয়ে গেছে হিসেবে ধরে নেয়। যদিও বাস্তবে তখন মুখের ভেতর মোটেও ঠান্ডা হয় না।