আমাদের মাথায় মহাকাশের বর্জ্য পড়ার আশঙ্কা কতটা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তো চিন্তার কোনো শেষ নেই! বাজারদর, অফিসের কাজ, জ্যামসহ কত কী! কিন্তু একবার ভাবো তো, তুমি হয়তো নিশ্চিন্তে পার্ক দিয়ে হাঁটছ, আর হঠাৎ মহাকাশ থেকে খসে পড়া আস্ত একটা রকেটের টুকরা এসে তোমার ঘাড়ে পড়ল! শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও বাস্তবে কিন্তু আমাদের মাথার ওপর এই বিপদ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্যমতে, পৃথিবীর ইতিহাসে মহাকাশের আবর্জনা বা স্পেস জাঙ্ক গায়ে পড়ার মাত্র একটিই নিশ্চিত ঘটনা আছে। নারীটির নাম লটি উইলিয়ামস।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯৭ সালের ২২ জানুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের তুলসা শহরের একটি পার্কে তিনি হাঁটছিলেন। হঠাৎ আকাশ থেকে কালো রঙের প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা একটি ফাইবার গ্লাসের টুকরা এসে তাঁর কাঁধে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছিটকে ঘাসের ওপর পড়ে যান!
টুকরাটি ছিল একদম হালকা, অনেকটা খালি সোডার ক্যানের মতো। মহাকাশ থেকে প্রচণ্ড বেগে এলেও পৃথিবীতে ঢুকতে ঢুকতে বাতাসের ঘর্ষণে এর গতি একদম কমে গিয়েছিল। এ কারণে লটির গায়ে কোনো আঘাত বা কালশিটেও পড়েনি। তুমি হয়তো ভাবছ, ‘ধুর! এমন তুলার মতো আবর্জনা গায়ে পড়লে আর কী এমন ক্ষতি!’
কিন্তু একটু দাঁড়াও! ওই টুকরাটি আসলে ছিল ডেলটা টু নামের একটি বিশাল রকেটের ধ্বংসাবশেষ। ওই একই রকেটের আরেকটি আড়াই শ কেজি ওজনের বিশাল তেলের ট্যাংক টেক্সাসের একটি খামারবাড়ির মাত্র ৫০ মিটার দূরে আছড়ে পড়েছিল! একটু এদিক-ওদিক হলে পুরো বাড়িটাই হয়তো ধূলিসাৎ হয়ে যেত!
তবে ওই ঘটনার প্রায় ৩০ বছর পর আজকের চিত্রটা পুরোপুরি বদলে গেছে। বিজ্ঞানীরা এখন আমাদের মাথার ওপর বর্জ্য পড়া নিয়ে যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত মহাকাশের কক্ষপথগুলো নিয়ে। এই ভয়ের বৈজ্ঞানিক নাম হলো কেসলার সিনড্রোম।
ব্যাপারটা একটু সহজ করে বলি। ধরো, মহাকাশে ঘুরতে থাকা একটি অকেজো স্যাটেলাইটের টুকরার সঙ্গে একটি ভালো স্যাটেলাইটের ধাক্কা লাগল। ফলে সেগুলো ভেঙে হাজার হাজার টুকরা হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ল। ওই টুকরাগুলো গিয়ে ধাক্কা মারল আরও কিছু স্যাটেলাইটকে, সেগুলো আবার ধাক্কা মারল অন্যগুলোকে! এভাবে একটা চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক দুর্ঘটনা শুরু হয়ে যাবে।
পৃথিবীর মানুষের গায়ে হয়তো এগুলো সরাসরি পড়বে না। কারণ, বেশির ভাগই বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু মহাকাশে থাকা আমাদের জিপিএস, ইন্টারনেট এবং আবহাওয়ার স্যাটেলাইটগুলো সব ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের আধুনিক সভ্যতার যোগাযোগব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়বে!
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, মহাকাশে আমাদের এই ট্রাফিক জ্যাম জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। একটু তুলনা দিলেই বুঝবে। ১৯৯৬ সালে সারা বিশ্বে মাত্র ৭৭টি রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। আর ২০২৫ সালে এক বছরেই মহাকাশে পাঠানো হয়েছে ৪ হাজারের বেশি নতুন বস্তু!
বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে ১৮ হাজারের বেশি স্যাটেলাইট ঘুরছে, যার অর্ধেকের বেশি ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের স্টারলিংক মেগাকনস্টেলেশন। স্পেসএক্স চাইছে, মহাকাশে ১০ লাখ স্যাটেলাইট পাঠাতে! এতে আমাদের রাতের আকাশের সুন্দর দৃশ্য তো নষ্ট হবেই, সেই সঙ্গে স্পেস জাঙ্কের ঝুঁকিও বাড়বে জ্যামিতিক হারে।
মহাকাশযানের টুকরাগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়, যেন সেগুলো বায়ুমণ্ডলেই পুড়ে যায় অথবা প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জনমানবহীন কোনো জায়গায় পড়ে। কিন্তু সব সময় হিসাব মেলে না!
সম্প্রতি স্পেসএক্সের রকেটের বিশাল এক টুকরা কানাডার একটি খামারে পাওয়া গেছে। এমনকি ফ্লোরিডার একটি পরিবারের বাড়ির ছাদ ফুটো করে নাসার একটি স্পেস জাঙ্ক সোজা ঘরের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল! ভাগ্য ভালো যে কেউ হতাহত হয়নি। ওই পরিবার নাসার বিরুদ্ধে রীতিমতো মামলা ঠুকে দিয়েছে!
বিজ্ঞানীদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যেসব রকেট পৃথিবীতে ফিরে এসেছে, তার প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন! এই তথ্য এবং জনসংখ্যার হিসাব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। ২০৩২ সালের মধ্যে পৃথিবীর বুকে কোনো না কোনো মানুষের গায়ে মহাকাশের আবর্জনা পড়ার অন্তত ১০ শতাংশ আশঙ্কা রয়েছে!
তবে আশার কথা হলো, মহাকাশের বর্জ্য পড়ে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কেউ মারা যায়নি। তাই এখনই আতঙ্কিত হয়ো না। নিশ্চয়ই এগুলো ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা কোনো পন্থা বের করবেন।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স