মানুষের মস্তিষ্ক গঠনে ‘পড়া’ কেন জরুরি

পড়া আসলে একটি ‘সম্পূর্ণ ব্রেন অ্যাকটিভিটি’মিডজার্নি

তুমি যখন এই লেখা পড়ছ, তখন তোমার মস্তিষ্কের কিছু স্নায়ুপথ সক্রিয় হয়ে উঠছে।

কোনো লেখা ‘পড়া’ খুব সাধারণ একটি কাজ। শুধু রিডিং পড়তে শিখলে বিশেষ কোনো কষ্ট করতে হয় না লেখা পড়তে। সাধারণ এ কাজই মস্তিষ্কের এমন কিছু স্নায়ুপথকে সক্রিয় করছে, যেগুলো গড়ে উঠতে মানুষের হাজার হাজার বছর লেগেছে। আমরা প্রায়ই ভাবি, ভাষা যেহেতু মা-বাবার কাছ থেকে সন্তানেরা খুব সহজে শেখে, তাহলে কোনো লেখা পড়া নিশ্চয়ই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ‘পড়া’ মোটেই স্বাভাবিক বা জন্মগত কোনো ক্ষমতা নয়। এটি মানবসভ্যতার এক আশ্চর্য আবিষ্কার। রিডিং পড়াই মস্তিষ্ককে নতুন করে গড়ে তোলে।

মানুষ জন্মায় কিছু মৌলিক ক্ষমতা নিয়ে। যেমন দেখার ক্ষমতা। কিছুদিন পর কথা বলতে পারে। এটাও জন্মগত বিষয়। চোখ আলো চিনতে পারে, কণ্ঠস্বর শব্দ তৈরি করতে পারে, কানে শোনা যায়। কিন্তু লেখা পড়ার জন্য আলাদা কোনো ‘রিডিং ব্রেন’ নিয়ে আমরা জন্মাই না। মানুষের ইতিহাসে পড়া বিষয়টা খুব নতুন। আমাদের মস্তিষ্কে আলাদা করে পড়ার জন্য বিশেষ কোনো অংশ তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ, আগে পড়ার সুযোগ ছিল না তেমন। ফলে মানুষ পড়তে শিখেছে দারুণ এক উপায়ে।

পড়তে গেলে অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে ঘটে—দেখা, শোনা, ভাষা বোঝা, মনোযোগ দেওয়া এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা। এসব মিলিয়ে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করে পড়া কাজটা করা যায়।

আরও পড়ুন

পড়ার ইতিহাসটাও কিন্তু দারুণ। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে সুমেরীয় সভ্যতায় জন্ম নেয় কিউনিফর্ম লিপি। মানুষের ইতিহাসে জানা প্রাচীনতম লেখার এক ধরন এটি। একই সময়ের কাছাকাছি মিসরে গড়ে ওঠে হায়ারোগ্লিফিকস। শুরুতে এসব চিহ্ন ছিল ছবি ও প্রতীকের মতো। মানুষ যত বেশি পড়েছে, লিখেছে, ততই সেই প্রতীকগুলো রূপ নিয়েছে আজকের পরিচিত অক্ষর ও বর্ণমালায়। পড়া ও লেখা শুধু যোগাযোগের কাজটা করেনি, সঙ্গে মানুষের চিন্তার ধরনকে ধীরে ধীরে জটিল ও সূক্ষ্ম করে তুলেছে।

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান দেখিয়েছে, পড়া আসলে একটি ‘সম্পূর্ণ ব্রেন অ্যাকটিভিটি’। আমরা যখন পড়ি, তখন মস্তিষ্কের চারটি লোব বা অংশই সক্রিয় হয়। অক্ষর চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো শব্দের সঙ্গে মেলে। শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে আমরা অর্থ তৈরি করি। এ প্রক্রিয়ায় শুধু মস্তিষ্কের কাজের ধরন বদলায়। সঙ্গে বদলায় এর গঠন ও সংযোগব্যবস্থা। অর্থাৎ নিয়মিত পড়া মানুষের মস্তিষ্ককে শারীরিকভাবেও নতুন করে সাজিয়ে তোলে।

ভাষাভেদে পড়ার প্রভাবও আলাদা। ইংরেজির মতো বর্ণভিত্তিক ভাষায় অক্ষরগুলো মূলত ধ্বনির প্রতীক। কিন্তু চীনা ভাষার মতো লোগোগ্রাফিক লেখায় প্রতিটি চিহ্ন একটি বস্তু বা ধারণাকে নির্দেশ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের ভাষা পড়ার সময় মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল মেমোরি ও ভিজ্যুয়াল সংযোগের অংশগুলো বেশি সক্রিয় হয়। দুই ভাষায় কথা বলা এক রোগীর ঘটনা এ ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে। স্ট্রোকের পর তিনি চীনা ভাষা পড়ার ক্ষমতা হারালেও ইংরেজি পড়তে পারছিলেন অনায়াসে। একই মস্তিষ্কে দুই ভাষার জন্য দুই ধরনের সার্কিট তৈরি হয়েছিল।

আরও পড়ুন

পড়ার প্রভাব শুধু মস্তিষ্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না, শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। কোনো গল্পের চরিত্রের ভয়, দুঃখ বা যন্ত্রণা আমরা অনেক সময় ‘পেটে’ অনুভব করি। মানে আমাদের পেটে মোচড় দিয়ে ওঠে। মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র ইনসুলা নামের অংশ, যা বমি ভাব, ব্যথা বা অস্বস্তির মতো শারীরিক অনুভূতির সঙ্গে জড়িত, সেটিই সহমর্মিতার অনুভূতির সঙ্গেও যুক্ত। গভীরভাবে পড়া মানে অন্যের অনুভূতিকে সত্যিই শরীর দিয়ে অনুভব করা।

কিন্তু এই গভীর পড়ার অভ্যাস এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফোন বা ট্যাবলেটে পড়লে বেশির ভাগ সময়ই পড়াটা হয়ে যায় দ্রুত স্ক্রল করার মতো। নোটিফিকেশনের কারণে মনোযোগ দিয়ে পড়া আর হয় না। স্ক্রিনে আমরা কাগজের বইয়ের তুলনায় বেশি স্কিম করি বা চোখ বুলিয়ে যাই। স্কিম করলে ভুল তথ্যের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে। গবেষণা বলছে, ছোট বয়সে অতিরিক্ত ডিজিটাল এক্সপোজার শিশুদের মনোযোগ ও একাডেমিক পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আট বছর বয়সেই কারও স্ক্রিন ব্যবহারের মাত্রা দেখে ভবিষ্যতের মনোযোগ ও পড়াশোনার ফলাফল অনেকটা আন্দাজ করা সম্ভব, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক।

তবে গবেষকরা ভিন্ন কথাও বলেছেন। সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন ব্যবহার উপকারী হতে পারে। তবু সমাধান হিসেবে যেটা সবচেয়ে সহজ, তা হলো পড়ার অভ্যাস করা। শিশুরা যদি বইয়ের জগতে ডুবে যায়, মা-বাবা ও শিক্ষকেরা যদি নিজে পড়ার উদাহরণ তৈরি করেন, তবেই সবার মধ্যে পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে।

সূত্র: বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

আরও পড়ুন