৫৫ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার সাঁতরে রেকর্ড গড়লেন পোলিশ সাঁতারু

টানা ৫৫ ঘণ্টা সাঁতার কাটার রেকর্ড গড়েছেন পোল্যান্ডের সাঁতারু বার্তোমিয়েই কুবকোভস্কিইন্সটাগ্রাম থেকে নেওয়া

সমুদ্রে সাঁতারের অবিশ্বাস্য সব রেকর্ড আছে। দীর্ঘ পথে দীর্ঘ সময় ধরে সাঁতারের রেকর্ডে এবার বুঝি নতুন পালক যুক্ত হলো। টানা ৫৫ ঘণ্টা সাঁতার কাটার রেকর্ড গড়েছেন পোল্যান্ডের সাঁতারু বার্তোমিয়েই কুবকোভস্কি। সুইডেন থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত বাল্টিক সাগর সাঁতরে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। দূরত্ব প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সুইডেন থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত বাল্টিক সাগর সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার নজির গড়েছেন তিনি।

আগস্টের ১ তারিখ সুইডেনের উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন কুবকোভস্কি। তবে এবার পানিতে নামার সময় তাঁর সামনে শুধু বিশাল একটি সাগর ছিল না, ছিল বহু বছরের ব্যর্থতা আর অপেক্ষাও। এর আগে চারবার এই পথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। ২০২২ সালে প্রথমবার চেষ্টা করেন। সেবার ১১৫ কিলোমিটার সাঁতার কাটার পর তাঁকে থামতে হয়। ২০২৫ সালে লক্ষ্যপূরণের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। প্রায় ১৫৯ কিলোমিটার সাঁতার কেটে ৫৩ ঘণ্টা পানিতে ছিলেন তিনি। তখন পোল্যান্ডের উপকূল ছিল মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু প্রচণ্ড ক্লান্তির কারণে শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টাও থামিয়ে দিতে হয়।

এবার তাই আগের সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলেন কুবকোভস্কি। রোববার সন্ধ্যায় অবশেষে পোল্যান্ডের উপকূলে পৌঁছান তিনি। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন অসংখ্য সমর্থক। তাঁকে তীরে উঠতে দেখে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন সবাই। তবে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর কুবকোভস্কির নিজেরই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না, কী অসম্ভব কাজ সেরে ফেলেছেন তিনি।

আরও পড়ুন

দুই দিনের বেশি ঘুমহীন সাঁতার

৫৫ ঘণ্টা পানিতে থাকার মানে ২ দিনের বেশি সময় ঘুম ছাড়া সাঁতার কাটা। মাঝখানে কোনো বিশ্রামের স্বাভাবিক সুযোগ নেই। এত দীর্ঘ সময় সাঁতার কাটার পর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় ক্লান্তি। দীর্ঘ সময় না ঘুমিয়ে থাকার কারণে কুবকোভস্কির মনোযোগে সমস্যা দেখা দিতে থাকে। কখনো কখনো স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। শরীর ও মস্তিষ্ককে তখন প্রচণ্ড চাপ সামলাতে হয়।

তাঁর সঙ্গে থাকা দলটি পুরো সময় নজর রাখছিল। কুবকোভস্কির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁরা দিকনির্দেশনাও দিচ্ছিলেন। নিয়মিত পানি ও শক্তি পাওয়া যায়, এমন খাবার দেওয়া হচ্ছিল। তবে পুরো যাত্রা সফল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মানতে হয়েছে। কোনো সময় নৌকা থেকে সাহায্য নেওয়া যাবে না। মানে নৌকা ধরে সামনে আগানো যাবে না বা নৌকায় ওঠা যাবে না। নিজের শক্তিতেই পানির মধ্য দিয়ে এগিয়ে তীরে উঠতে হবে। কুবকোভস্কি সেই শর্ত পূরণ করেছেন।

আরও পড়ুন

পাঁচবারের চেষ্টা

বাল্টিক সাগর পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন কুবকোভস্কির বহুদিনের। প্রথমবার ২০২২ সালে চেষ্টা করার পর থেকেই প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে নতুন অভিজ্ঞতা নিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে নিজের সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। শারীরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসিকভাবেও তৈরি হয়েছেন এমন একটি চ্যালেঞ্জের জন্য, যেখানে ভুলের সুযোগ খুব কম।

২০২৫ সালের চেষ্টাটি ছিল বেশ কঠিন। প্রায় ১৫৯ কিলোমিটার সাঁতার কেটে ৫৩ ঘণ্টা পানিতে থাকার পরও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। পোল্যান্ডের উপকূল তখন মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু শরীর আর সায় দেয়নি। প্রচণ্ড ক্লান্তির কারণে সেই চেষ্টা থামিয়ে দিতে হয়। এত কাছাকাছি গিয়েও ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই সহজ ছিল না। তবু সেখান থেকেই আবার নতুন প্রস্তুতি নেন তিনি।

আরও পড়ুন

মানসিক শক্তি

এমন দূরত্বের সাঁতারের জন্য শুধু শক্তিশালী শরীর থাকলেই হয় না। প্রয়োজন দীর্ঘ সময় ধরে একই ছন্দে কাজ করে যাওয়ার ক্ষমতা। দরকার মানসিক দৃঢ়তা। কুবকোভস্কির প্রস্তুতিও ছিল সেভাবে। দীর্ঘ সময় সাঁতারের অনুশীলনের পাশাপাশি সহনশীলতার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। মানসিক চাপ সামলানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল খাবার ও পানীয় গ্রহণের পরিকল্পনা।

কারণ, ৫৫ ঘণ্টা ধরে শরীরকে কাজ করাতে হলে শুধু সাঁতার জানলেই চলে না। কখন কতটা শক্তি প্রয়োজন, কখন শরীরকে পানি দিতে হবে, কখন খাবার নিতে হবে, সবকিছুর হিসাব করতে হয়। তার ওপর বাল্টিক সাগরের পানি সব সময় শান্ত থাকে না। আবহাওয়া বদলে যেতে পারে, ঢেউ বাড়তে পারে, ঠান্ডা পানি শরীরকে দুর্বল করে দিতে পারে। সময়ের সঙ্গে সাঁতারে ক্লান্তি তৈরি হয়। সবকিছু একসঙ্গে সামলে এগিয়ে যেতে হয়েছে কুবকোভস্কিকে।

কুবকোভস্কির এই যাত্রার উদ্দেশ্য শুধু ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখানো নয়। তিনি তাঁর সাফল্য উৎসর্গ করেছেন ‘ক্যানসার ফাইটার্স’ ফাউন্ডেশনের জন্য। তাঁর এই চ্যালেঞ্জ ঘিরে তহবিল সংগ্রহের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই সাঁতারের মধ্য দিয়ে ২ লাখ ৬৮ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ হয়েছে।

এক্সট্রিম স্পোর্টস বা চরম ক্রীড়ার সঙ্গে দাতব্য কাজকে আগেও যুক্ত করেছেন কুবকোভস্কি। ২৪ ঘণ্টা সাঁতারের বিশ্বরেকর্ড তাঁর দখলে আছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একাধিক পদক জিতেছেন। ‘আলট্রা বাল্টিক সুইম’ প্রকল্পেরও উদ্যোক্তা তিনি। তবু তাঁর নিজের ক্যারিয়ারে বাল্টিক সাগর পাড়ি দেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন

একা ছিলেন না

কুবকোভস্কির পাশাপাশি একই সময়ে বাল্টিক সাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন আরেক পোলিশ সাঁতারু কারোলিনা শেপানিয়াক। অলিম্পিকের এই সাঁতারু বেইজিং ও লন্ডন—দুই অলিম্পিকেই অংশ নিয়েছেন। ৭২ ঘণ্টা টানা সাঁতারের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁর রয়েছে।

শেপানিয়াকের এবারের লক্ষ্য ছিল পোল্যান্ডের পবিয়েরোভো উপকূলে পৌঁছানো, তবে তাঁর এই চেষ্টার সঙ্গে ছিল আরও একটি মানবিক উদ্দেশ্য। ১৪ বছর বয়সী পিওত্র মালেপশির চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৫৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার পর সাঁতার থামান শেপানিয়াক। তখনো পোল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ছিলেন তিনি।

দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতার এমনিতেই কঠিন। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় ঠান্ডা পানি, ঢেউ, পরিবর্তনশীল আবহাওয়া এবং ঘুমহীন অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা শরীর চালিয়ে যাওয়ার চাপ, তাহলে কাজটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন