কেন সব যন্ত্রের পাওয়ার বাটন দেখতে একই রকম
আমাদের জীবন এখন নানা রকম ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে পূর্ণ। দিনভর স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ড্রয়িংরুমের টেলিভিশন—কিছু না কিছু ব্যবহার করছি। এই যন্ত্রগুলো একেকটা দেখতে একেক রকম, কোনোটা আকারে ছোট, আবার কোনোটা অনেক বড়। কিন্তু কখনো কি খেয়াল করে দেখেছ, প্রতিটি যন্ত্র চালু করার বোতাম বা পাওয়ার বাটনের চিহ্নটি কিন্তু একদম হুবহু এক।
একটি গোল বৃত্ত আর তার ওপরের দিকে একটি সোজা দাগ। এই বাটন আমরা প্রতিদিন, এমনকি দিনে বহুবার ব্যবহার করি। পিসি, ল্যাপটপ সবখানেই এই বাটন আমাদের চোখের সামনে থাকে। এটি আমাদের কাছে এত পরিচিত হয়ে গেছে যে এর পেছনে কোনো বিশেষ অর্থ থাকতে পারে, তা হয়তো আমরা কখনো দ্বিতীয়বার ভেবেই দেখিনি।
কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন সারা পৃথিবীর সব কোম্পানি তাদের যন্ত্রে ঠিক এই একই নকশা ব্যবহার করে? কেন কেউ সেখানে অন্য কোনো জ্যামিতিক চিহ্ন বা ছবি এঁকে দেয় না?
বর্তমানে সব আধুনিক পিসি বা ল্যাপটপে আমরা যে পাওয়ার চিহ্নটি দেখি, তা ব্যবহার শুরু হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে। সেই সময়ের যন্ত্রগুলোতে এখনকার মতো সফট বাটন ছিল না। তখন হাত দিয়ে ঘোরানো বা জোরে টিপতে হয়, এমন সব যান্ত্রিক সুইচ ব্যবহার করা হতো। সেই সুইচগুলোতে কোন দিকে চাপ দিলে যন্ত্রটি চালু হবে আর কোন দিকে বন্ধ, তা বোঝাতে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ, ‘অন’ ‘অফ’ লেখা থাকত সেসব সুইচে।
তখন বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রনিক পণ্য আর গাড়ি কেনাবেচা ও আমদানি–রপ্তানি বাড়তে শুরু করে। কিন্তু এর ফলে তখন একটি বড় সমস্যা দেখা দিল। একেক দেশের মানুষ একেক ভাষায় কথা বলে। সব দেশের মানুষ তো আর ইংরেজি বোঝে না। তাই এমন একটি চিহ্নের প্রয়োজন পড়ল, যা ভাষা না জানলেও যে কেউ এক দেখাতেই চিনে নিতে পারে। এই সমস্যার চমৎকার এক সমাধান পাওয়া গেল কম্পিউটারের নিজস্ব ভাষা বাইনারি থেকে।
কম্পিউটার আসলে আমাদের মতো মানুষের ভাষা সরাসরি বোঝে না। এর নিজস্ব ভাষা হলো মেশিন ল্যাংগুয়েজ বা মেশিন কোড। এই ভাষা কেবল ০ (শূন্য) এবং ১ (এক) এই দুটি বাইনারি সংখ্যা ব্যবহার করে তৈরি। কম্পিউটার প্রসেসর বা সিপিইউ সরাসরি এই কোডগুলো বুঝতে পারে।
ইলেকট্রনিক সার্কিটে বিদ্যুৎপ্রবাহের দুটি অবস্থাকে এই সংখ্যাগুলো দিয়ে প্রকাশ করা হয়। বাইনারি পদ্ধতিতে ‘১’ মানে হলো বিদ্যুৎপ্রবাহ চালু বা ‘অন’ অবস্থা। একেই আমরা সহজ ভাষায় ‘সক্রিয়’ বলে থাকি। অন্যদিকে ‘০’ মানে হলো বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ বা ‘অফ’ অবস্থা, যাকে ‘নিষ্ক্রিয়’ বলা হয়।
এই সর্বজনীন ভাষা ব্যবহারের ফলেই এখন বিশ্বের যেকোনো দেশের মানুষ ভাষা না জানলেও পাওয়ার বাটন দেখে যন্ত্রটি চালু বা বন্ধ করার উপায় বুঝে নিতে পারে। এই ১ এবং ০ সংখ্যা দুটিকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করেই তৈরি হলো আজকের চেনা পাওয়ার চিহ্ন। একটি গোল বৃত্ত (০) এবং তার মাঝখানে একটি সোজা দাগ (১)—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে সর্বজনীন এই নকশা।
১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (IEC) তাদের প্রতীকের তালিকায় পাওয়ার চিহ্নটি যুক্ত করে। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এটি একই রকম রয়ে গেছে। যন্ত্রপাতিতে কোন চিহ্ন কেন ব্যবহার করা হবে, তার একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়ম বা স্ট্যান্ডার্ড আছে। একে বলা হয় আইইসি ৬০৪১৭ (IEC 60417)। এটি মূলত আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন কর্তৃক তৈরি করা একটি মানদণ্ড। যেখানে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে ব্যবহৃত বিভিন্ন ছবির মতো চিহ্নের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এই নিয়মে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এমন কিছু সংকেত বা প্রতীক রয়েছে, যা দেখে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারে, যন্ত্রটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, এর সংযোগ কোথায় দিতে হবে এবং এটি কতটা নিরাপদ। এই প্রতীকগুলো তৈরি করার মূল উদ্দেশ্য হলো ভাষার বাধা দূর করা। ফলে কোনো মানুষ যদি যন্ত্রের গায়ে লেখা ভাষা বুঝতে নাও পারে, তবুও এই সর্বজনীন চিহ্নগুলো দেখে সে অনায়াসেই এর কার্যকারিতা বা প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি বুঝে নিতে পারে।
এই নিয়ম অনুযায়ী চিহ্নগুলোর আলাদা আলাদা অর্থ রয়েছে। শুধু একটি সোজা দাগ (|) মানে হলো যন্ত্রটি পুরোপুরি চালু। আবার শুধু একটি গোল বৃত্ত ( ) মানে হলো যন্ত্রটি বিদ্যুৎ–সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন বা পুরোপুরি বন্ধ। আর আমরা সচরাচর যে বাটন দেখি, বৃত্তের ভেতরে দাগ, সেটির আসল অর্থ হলো স্ট্যান্ডবাই। এর মানে যন্ত্রটি পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং অল্প বিদ্যুৎ খরচ করে ঘুমের মতো এক অবস্থায় আছে, যেন বাটন চাপলেই দ্রুত জেগে উঠতে পারে।
তবে এই স্ট্যান্ডবাই চিহ্ন নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। যন্ত্রটি কি পুরোপুরি বন্ধ নাকি সচল তা, অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা মেটাতে ক্যালিফোর্নিয়া এনার্জি কমিশন ও আইইইই (IEEE) এর মতো সংস্থাগুলো একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। তারা বলছে, কম বিদ্যুৎ খরচ করে যন্ত্রকে সচল রাখা বা স্লিপ মোড বোঝাতে পাওয়ার চিহ্নের বদলে একটি অর্ধচন্দ্র বা চাঁদের মতো চিহ্ন ব্যবহার করা উচিত। ২০০৪ সালে এই নতুন নিয়মটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। অবশেষে ২০১৫ সালে সেই দাবি মেনে নেওয়া হয়।