কিছুক্ষণ পড়ার পর মাথা ফাঁকা লাগে কেন
বইয়ের পাতায় চোখ তোমার। বেশ কিছুক্ষণ ধরে পড়ার টেবিলে বসে আছো। হুট করে টের পেলে, পড়ার কিছুই মাথায় ঢুকছে না। একই লাইন বারবার পড়তে হচ্ছে। একটু আগে কী পড়েছ, সেটা তো মনে থাকছেই না। হুট করে খেয়াল হলো, কতক্ষণ ধরে চোখ বইয়ের পাতায় থাকলেও মন ছিল অন্য কোথাও।
এটা শুধু তোমার একার সমস্যা নয়। পড়ার সময় মনোযোগ কমে যাওয়া, মন অন্যদিকে চলে যাওয়া বা একই তথ্য বারবার পড়েও বুঝতে না পারা বেশ স্বাভাবিক বিষয়। এর পেছনে কিছু বিষয় কাজ করতে পারে। মস্তিষ্কের ওয়ার্কিং মেমোরির সীমাবদ্ধতা, মনোযোগের ওঠানামা, মানসিক ক্লান্তি, পড়ার বিষয়টি কঠিন, আগ্রহের অভাব, ঘুমের ঘাটতি কিংবা আশপাশের নানা ধরনের মনোযোগ কেড়ে নেওয়া বিষয়।
মস্তিষ্ক একসঙ্গে কত তথ্য মনে রাখতে পারে
পড়ার সময় নতুন তথ্য প্রথমে আমাদের ওয়ার্কিং মেমোরিতে আসে। সহজ করে বললে, এটি মস্তিষ্কের সাময়িক কাজের জায়গা। এখানে নতুন তথ্য ধরে রেখে সেটি নিয়ে আমরা চিন্তা করি, আগের জানা তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি এবং অর্থ বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু এই জায়গার ধারণক্ষমতা সীমিত। একসঙ্গে অনেক নতুন তথ্য নিয়ে কাজ করতে গেলে এই ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে।
ধরো, তুমি বিজ্ঞানের একটি কঠিন অধ্যায় পড়ছ। সেখানে একসঙ্গে নতুন কয়েকটি ধারণা, সংজ্ঞা, সূত্র ও উদাহরণ দেওয়া আছে। আগে থেকে বিষয়টি সম্পর্কে তোমার ধারণা কম হলে প্রতিটি তথ্য বুঝতে মানসিক পরিশ্রম বেশি করতে হবে। ফলে কিছুক্ষণ পর মনে হতে পারে, আর কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছ, কিন্তু মন অন্য কোথাও
আরেকটি বড় কারণ হলো মনোযোগ সরে যাওয়া। পড়ার সময় হঠাৎ মনে পড়ল, বন্ধুকে কী উত্তর দেবে, কালকের পরীক্ষা কেমন হবে, বিকেলে কোথায় যাবে, এমন নানা চিন্তা মাথায় আসতে পারে। এটাকে বলা হয় মাইন্ড ওয়ান্ডারিং বা মনের অন্যদিকে চলে যাওয়া। পড়ার সময় এভাবে মন অন্যদিকে চলে গেলে পড়া বোঝার ক্ষমতা কমতে পারে।
তাই এটাকে আমরা স্মৃতির সমস্যা বলব না। এটা মনোযোগের ঘাটতি। তুমি কয়েক পৃষ্ঠা পড়েছ ঠিকই, কিন্তু পুরো সময় যদি মনোযোগ দিয়ে না পড়ো, তাহলে পরে মনে রাখার মতো তথ্যও খুব একটা থাকবে না। তাই কখনো তোমার মনে হতে পারে, ‘এতক্ষণ পড়লাম, কিন্তু কিছুই তো মনে নেই!’
একটানা পড়লে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হবে
হ্যাঁ, দীর্ঘ সময় একই ধরনের মানসিক কাজ করতে থাকলে ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তবে এর কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই যে ২৫ মিনিট বা ৪০ মিনিট পর মস্তিষ্ক অবশ্যই ক্লান্ত হয়ে যাবে। মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কাজের ধরন, আগ্রহ, ঘুম, পরিবেশ ও বিষয়টি কত কঠিন—এসবের ওপর নির্ভর করে। ব্যক্তিভেদে এটা বদলে যায়।
তাই কারও ২০ মিনিট পর বিরতির দরকার হতে পারে। আবার কেউ ৪৫ মিনিট বা তার বেশি সময় ভালোভাবে পড়তে পারে।
ফোন কি পড়ায় মনোযোগ নষ্ট করে
ফোন পাশে থাকলে মস্তিষ্কে বিপুল পরিমাণ ডোপামিন বের হয়ে পড়ার ক্ষমতা ‘বন্ধ’ হয়ে যায়, এমন দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তবে ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন বা অন্য ডিজিটাল বিষয় মনোযোগে বাধা তৈরি করতে পারে। স্মার্টফোনের উপস্থিতি ও ব্যবহারের সঙ্গে মনোযোগ, স্মৃতি ও মাথা খাটানোর মতো কাজে কিছু নেতিবাচক প্রভাবের সম্পর্ক আছে। যদিও প্রভাবটি সব ক্ষেত্রে একই নয়।
তাই পড়ার সময় ফোনে বারবার চোখ না দেওয়াই ভালো। বিশেষ করে নোটিফিকেশন বন্ধ করে ফোনটি হাতের নাগালের বাইরে রাখলে অযথা মনোযোগ সরে যাওয়ার সুযোগ কমে।
পানি ও ঘুমের কথাও মনে রাখতে হবে
শরীরে পানির ঘাটতি হলেও মনোযোগ ও কিছু মানসিক কাজের দক্ষতা কমতে পারে। পানিশূন্যতার সঙ্গে মনোযোগ ও কাজের কিছুটা ঘাটতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে পড়তে বসে মাথা ফাঁকা লাগার প্রধান কারণ হিসেবে ‘মস্তিষ্কে অক্সিজেন বা গ্লুকোজ কমে গেছে’ বলা ঠিক নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ও জ্বালানি সরবরাহের জটিল ব্যবস্থা রয়েছে। তাই শুধু বই নিয়ে বসে থাকার কারণে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়ে যায়, এমন ধারণা সঠিক নয়।
ঘুমের বিষয়টি বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, শেখা ও স্মৃতিতে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে কিশোর–কিশোরীদের জন্য ঘুম শেখা ও স্মৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাহলে কীভাবে পড়ব
একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের সামনে বসে থাকার চেয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়া ও প্রয়োজনমতো বিরতি নেওয়া বেশি কাজে দিতে পারে। তবে সবার জন্য ২৫ মিনিট পড়া ও ৫ মিনিট বিরতি নিতে হবে, এমন কোনো জাদুকরি নিয়ম নেই।
পোমোডোরো নামে পরিচিত এই পদ্ধতিতে সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পড়ার পর ছোট বিরতি নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট বিরতি নেওয়া কিছু ক্ষেত্রে ক্লান্তি ও মনোযোগের অভিজ্ঞতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তোমার জন্য যে ব্যবস্থা কাজ করে, সেটিই বেছে নাও।
বিরতিতে ফোনে ঢুকে ৫ মিনিটের বদলে ৩০ মিনিট নষ্ট করে ফেলো না। এর চেয়ে উঠে একটু হাঁটো, পানি খাও ও চোখকে বিশ্রাম দাও। শারীরিক নড়াচড়া করে ছোট বিরতি নিলে মনোযোগ বাড়তে পারে এবং শেখা সহজ হতে পারে। যদিও পড়ার ফলাফলের ওপর এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক নয়।