নাসার সিমুলেশনে এবার পৃথিবীতে বসে মঙ্গলের অভিজ্ঞতা
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা এক বছরের জন্য বিশেষ একটি মিশন বা সিমুলেশন তৈরি করছে। যেটি ব্যবহার করে পৃথিবীতে বসে মঙ্গল গ্রহে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে।
মহাকাশে ভ্রমণ করা খুব কঠিন কাজ। ভবিষ্যতে যখন মানুষ আরও দূরের কোনো গ্রহে যাবে, তখন দীর্ঘদিন মহাকাশের সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে থাকতে হবে। এমন পরিবেশে মানুষের শরীর ও মন কীভাবে মানিয়ে নেয়, তা বিজ্ঞানীদের আগে থেকেই ভালোভাবে বুঝতে হবে।
এই সমস্যার সমাধানের জন্যই নাসা মাটির ওপর এমন কিছু কৃত্রিম বাসস্থান বা সিমুলেশন তৈরি করছে, যা দেখতে হুবহু মহাকাশের পরিবেশ ও মহাকাশচারীদের থাকার জায়গার মতো।
নাসার নতুন এই মিশনের নাম ‘মুন অ্যান্ড মার্স এক্সপ্লোরেশন অ্যানালগ’। এটি ২০২৭ সালের আগস্টে শুরু হতে যাচ্ছে। এখানে অংশগ্রহণকারীরা একদম অন্য গ্রহে থাকার মতো কঠিন পরিস্থিতিতে বসবাস ও কাজ করবেন। আর এই অভিযানের জন্যই নাসা সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবক খুঁজছে। চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহের অভিযানের নানা বিষয় পরীক্ষা করার জন্য এটিই হবে প্রথম কোনো মিশন, যা মহাকাশে না গিয়ে মাটির ওপর তৈরি কৃত্রিম পরিবেশে চালানো হবে।
প্রজেক্টটি নাসার আগের দুটি মিশন, হেরা (HERA) এবং চাপিয়ার (CHAPEA) অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর আগে তারা মহাকাশচারীদের ওপর গবেষণা করার জন্য আলাদাভাবে এই দুটি প্রজেক্ট চালিয়েছিল। হেরা মিশনে দেখা হতো মহাশূন্যে একদম একা ও ছোট জায়গায় আটকে থাকলে মানুষের মনের ওপর কী প্রভাব পড়ে। আর চাপিয়া মিশনে থ্রিডি-প্রিন্টারে তৈরি কৃত্রিম মঙ্গলের বাড়িতে মানুষ কীভাবে টিকে থাকে, তা পরীক্ষা করা হতো।
হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারে অবস্থিত একটি বিশেষ গবেষণাগারে এই পুরো কাজটি হবে। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও একটি আবদ্ধ পরিবেশে থেকে গভীর মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নেবেন।
এরপর, তারা মাটির ওপরে তৈরি একটি কৃত্রিম বাসস্থানে গিয়ে থাকবেন। সেখানে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখবেন, সীমিত সম্পদ ও অন্য কোনো গ্রহের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে মহাকাশচারীরা কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে কাজ সম্পন্ন করেন।
ধারণা করা হচ্ছে, এই দুটি ব্যবস্থা একসঙ্গে চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের সম্ভাব্য সব পরিস্থিতিতে মহাকাশচারীদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য একটি নিখুঁত পদ্ধতি তৈরি করবে।
মঙ্গলে যাওয়ার বিভিন্ন ধাপের অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য এই মিশনে একাধিক প্ল্যাটফর্ম বা কাঠামো ব্যবহার করা হবে। এর একটি হলো ‘ট্রানজিট ভেহিকেল’। এটি মূলত পৃথিবী থেকে মঙ্গলে যাওয়ার সময় মহাকাশযানের ভেতরের পরিবেশ কেমন হবে, তা বোঝানোর জন্য তৈরি একটি দ্বিতল ও চার দরজাবিশিষ্ট বাসস্থান। এর ভেতরে একটি কাজের জায়গা, শোবার ঘর এবং বাথরুমের মতো সুবিধা রয়েছে।
অন্যদিকে, মঙ্গলের মাটিতে থাকার জন্য যে বাসস্থানটি তৈরি করা হয়েছে, সেটি মাত্র একতলা। থ্রিডি-প্রিন্টারে তৈরি এই বিশেষ বাড়িটি বর্তমানে দ্বিতীয় চাপিয়া মিশনে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কৃত্রিম পরিবেশটি স্বেচ্ছাসেবকদের অন্য কোনো গ্রহের পৃষ্ঠে বসবাসের আসল অভিজ্ঞতা দেবে।
এর ভেতরে রয়েছে প্রত্যেকের জন্য আলাদা শোবার ঘর, সবার একসঙ্গে কাজ করার জায়গা, বিনোদন কক্ষ, ফসল চাষের এলাকা, চিকিৎসা কক্ষ, রান্নাঘর ও দুটি বাথরুম। এ ছাড়া ভিনগ্রহের মাটিতে হাঁটার অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য বাইরে একটি বালু দিয়ে ঘেরা বিশেষ জায়গাও তৈরি করা হয়েছে।
নাসা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্বেচ্ছাসেবকেরা মূল বাসস্থানের বাইরে অন্য কোনো গবেষণা কেন্দ্রে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য একটি রোভার মডিউল বা বিশেষ গাড়িও ব্যবহার করতে পারবেন। এই গাড়িতে দুজনের বসার আসন, দুটি বিছানা, একটি বিশেষ টয়লেট ও মহাজাগতিক নমুনা সংগ্রহের জন্য একটি ছোট এয়ারলক পথ রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের আশা, এই মিশন থেকে পাওয়া তথ্য নাসাকে দীর্ঘ সময়ের মহাকাশ অভিযানে মহাকাশচারীদের স্বাস্থ্য ও কাজের সুরক্ষায় সাহায্য করবে। ফলে মহাকাশ অভিযানের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও নিয়মকানুনগুলো আগে থেকে যাচাই করে নেওয়া যাবে। আর এই সবকিছুর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে না গিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
এই তথ্যগুলো নাসার হিউম্যান রিসার্চ প্রোগ্রামে ব্যবহার করা হবে। এই প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য, মহাকাশচারীদের সুস্থ রাখা ও মহাকাশে তাঁদের কাজের ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়গুলো খুঁজে বের করা। এছাড়া এই মিশন থেকে পাওয়া তথ্য চাঁদে নাসার স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করতে ও ভবিষ্যতের আর্টেমিস অভিযানেও বড় সাহায্য করবে।
নাসা অবশ্য চাইলেই যে কাউকে এই কাজের জন্য নিতে পারবে না। এই মিশনে অংশ নিতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী হতে হবে। আর তাদের বয়স হতে হবে ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে বয়সের নিয়মে কিছুটা ছাড় দেওয়া হতে পারে। উচ্চতা কোনোভাবেই ১.৯ মিটার বা ৭৪ ইঞ্চির বেশি হওয়া চলবে না।
দুটি আলাদা আবদ্ধ স্থানে স্বেচ্ছায় টানা ১২ মাস থাকার পাশাপাশি, স্বেচ্ছাসেবকদের মিশনের আগে ও পরে দুই মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের কাজে অংশ নিতে হবে। এ ছাড়া বেশ কয়েক দিন ধরে চলা একটি কঠোর বাছাইপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হবে। যেখানে আবেদনকারীকে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই সম্পূর্ণ সুস্থ থাকার প্রমাণ দিতে হবে।
অংশগ্রহণকারীদের প্রযুক্তিগত কাজে দক্ষ হতে হবে। তাদের কোনো বিশেষ খাবারের ব্যাপারে অ্যালার্জি থাকা চলবে না। পাশাপাশি, ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস থাকলে হবে না।
যেহেতু এটি একটি কৃত্রিম মহাকাশ অভিযান, তাই অংশগ্রহণকারীদের মহাকাশচারীদের মতোই শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে। আবেদনকারীর ইঞ্জিনিয়ারিং, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান বা গণিতে স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে। তবে উচ্চতর ডিগ্রি বা মাস্টার্স করা থাকলে তারা অগ্রাধিকার পাবেন।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স