ভুল করে আবিষ্কার করা জনপ্রিয় ১০ খাবার

কখনো কি রান্নাঘরে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছ? মা হয়তো বকা দিয়েছেন। কিন্তু জানো কি, পৃথিবীর অনেক জনপ্রিয় খাবারই তৈরি হয়েছিল এমন সব অদ্ভুত ভুল থেকে। ইংরেজিতে এটাকে খুব সুন্দর করে বলা হয় সেরেন্ডিপিটি (Serendipity)। মানে সৌভাগ্যক্রমে হওয়া আবিষ্কার। চলো তাহলে জেনে নেওয়া যাক জনপ্রিয় ১০ খাবারের দুর্ঘটনাক্রমে আবিষ্কারের গল্প।

চকলেট-কফি আইসক্রিম
ছবি: সুমন ইউসুফ

১. আইসক্রিম কোন

আইসক্রিম খেতে গিয়ে কুড়মুড়ে কোনের কামড় কার না ভালো লাগে। কিন্তু জানো কি, এই কোন কিন্তু শুরুতে আইসক্রিমের অংশই ছিল না? ১৯০৪ সালের কথা, সেন্ট লুইস ওয়ার্ল্ড ফেয়ারে এক আইসক্রিম বিক্রেতার দোকানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। একপর্যায়ে আইসক্রিম দেওয়ার মতো কাপ বা বাটি সব শেষ হয়ে গেল। পাশেই ছিল এক পেস্ট্রি বিক্রেতার দোকান। তিনি চটজলদি বুদ্ধি খাটিয়ে তাঁর তৈরি পাতলা ওয়াফেলগুলোকে মুড়িয়ে কোনের মতো বানিয়ে দিলেন। আর তাতেই বাটির বদলে কোনের ভেতরে আইসক্রিম রাখা শুরু হলো, যা আজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়।

২. পটেটো চিপস

মচমচে পটেটো চিপস কিন্তু কোনো পরিকল্পিত রেসিপি নয়। এটা একজন শেফের রাগ করা থেকে তৈরি হয়েছে। শেফ জর্জ ক্রাম একবার এক ক্রেতাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বানিয়ে দেন। কিন্তু সেই ক্রেতা অভিযোগ করেন, আলুর টুকরোগুলো অনেক মোটা হয়ে গেছে। রাগের মাথায় শেফ ক্রাম তখন আলুগুলোকে কাগজের মতো পাতলা করে কেটে ডুবো তেলে কড়া করে ভেজে দেন। ভাবেননি যে এই অখাদ্য জিনিসটিই ওই ক্রেতা এত পছন্দ করবেন। এভাবেই আমাদের প্রিয় পটেটো চিপসের জন্ম।

আরও পড়ুন
এগ ক্লাব স্যান্ডউইচ
ছবি: প্রথম আলো

৩. স্যান্ডউইচ

১৭ শতকের দিকে জন মন্টাগু নামের এক ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক টেবিল গেম বা বাজি খেলতে খুব ভালোবাসতেন। তিনি চাইতেন না খাওয়ার জন্য টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে। তাই তিনি বাবুর্চিকে নির্দেশ দেন দুই টুকরা পাউরুটির মাঝখানে মাংস দিয়ে এমন কিছু বানাতে, যা এক হাতেই সহজে খাওয়া যায়। তাঁর এই অলসতা আর বুদ্ধি থেকেই জন্ম নিল স্যান্ডউইচ।

ঘরে পাতা দই
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

৪. দই

দইয়ের ইতিহাস কিন্তু অনেক পুরোনো। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের। প্রাচীন তুরস্কের পশুপালকেরা যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেন, তখন তাঁরা ছাগলের দুধ সংরক্ষণের জন্য পশুর পাকস্থলী দিয়ে তৈরি একধরনের বিশেষ থলি ব্যবহার করতেন। রোদে দীর্ঘ পথ চলার পর তাঁরা দেখতেন থলির পাতলা দুধ ঘন হয়ে টক দইয়ে পরিণত হয়েছে। আসলে পশুর পাকস্থলীতে থাকা কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া দুধের সংস্পর্শে এসে ‘ফার্মেন্টেশন’ বা গাঁজন প্রক্রিয়াই অনিচ্ছাকৃতভাবে এই দই বানিয়েছিল।

কর্ন ফ্লেক্স দুধে ভিজিয়ে খান অনেকে
ছবি: পেক্সেলস

৫. কর্ন ফ্লেক্স

সকালের নাশতায় কর্ন ফ্লেক্স তো অনেকের খুব প্রিয়। কিন্তু এটি তৈরি হয়েছিল রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার বানাতে গিয়ে। ১৮৯৮ সালে ডাক্তার জন হার্ভে কেলগ ও তাঁর ভাই উইলিয়াম কিথ কেলগ ভুল করে কিছু সেদ্ধ গম বাইরে রেখে দেন। দীর্ঘ সময় পর সেগুলো বাসি আর শক্ত হয়ে যায়। তাঁরা যখন সেই শক্ত মণ্ডটিকে বেলতে গেলেন, তখন তা রুটির মতো না হয়ে ছোট ছোট টুকরা বা ফ্লেক্স হয়ে ফেটে গেল। পরে সেগুলো সেঁকে নেওয়ার পর দেখা গেল তা খেতে দারুণ চমৎকার। এভাবেই জন্ম নিল জনপ্রিয় এই নাশতা।

আরও পড়ুন
প্রচণ্ড গরমে আইসক্রিম খেলে কিছুটা স্বস্তি মেলে
ছবি: আনস্প্ল্যাশ

৬. পপসিকল

পপসিকল বা আইস ললিপপের আবিষ্কারক ছিল ১১ বছর বয়সী এক কিশোর। ১৯০৫ সালের এক রাতে ফ্র্যাঙ্ক এপারসন নামের সেই ছেলেটি বারান্দায় এক কাপ সোডা ও পানি গোলানো মিশ্রণ রেখে দেয়। ভুল করে সেই কাপের ভেতর নাড়ানোর কাঠিটিও রয়ে গিয়েছিল। রাতভর কনকনে ঠান্ডায় সেই মিশ্রণ কাঠিসহ জমে শক্ত হয়ে যায়। পরদিন সকালে ফ্র্যাঙ্ক আবিষ্কার করল আইস ললি।

সাদিয়া আইরিনের চকলেট চাংক কুকিজ।
ছবি: সাদিয়া আইরিন

৭. চকলেট চিপস কুকিজ

১৯৩০ সালের কথা। রুথ ওয়েকফিল্ড নামের এক নারী কুকিজ বানাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন কুকিজে দেওয়ার মতো সাধারণ চকলেট শেষ হয়ে গেছে। তিনি তখন বুদ্ধি খাটিয়ে নেসলের চকলেটের কিছু ছোট টুকরা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে ওভেনে দেন। তিনি ভেবেছিলেন চকলেটগুলো গলে মিশে যাবে, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলেন চকলেটের দানাগুলো গলে না গিয়ে কুকিজের গায়েই আটকে আছে। আর এভাবেই জন্ম নিল বিশ্বখ্যাত চকলেট চিপস কুকিজ।

কোকাকোলা
ছবি: রয়টার্স

৮. কোকা-কোলা

আজকের জনপ্রিয় পানীয় কোক কিন্তু শুরুতে ছিল একটি ওষুধ বা টনিক। জন স্টিথ পেম্বারটন নামের একজন ফার্মাসিস্ট মাদকাসক্তি ছাড়ানোর জন্য একটি বিশেষ পানীয় তৈরির চেষ্টা করছিলেন। ১৮৮৬ সালে তিনি ক্যাফেইন ও কোকেনের সংমিশ্রণে একটি টনিক তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে আসা ক্যান্ডলার নামের আরেকজন ব্যক্তি এই ফর্মুলাটি কিনে নেন ও দারুণ সব প্রচারণার মাধ্যমে একে একটি ঠান্ডা পানীয় হিসেবে পুরো বিশ্বে পরিচিত করে তোলেন।

আরও পড়ুন
টোফু

৯. টোফু

পনিরের মতো দেখতে স্বাস্থ্যকর টোফু কিন্তু প্রাচীন চীনে দুর্ঘটনাক্রমে তৈরি হয়েছিল। কথিত আছে, একবার সেদ্ধ সয়াবিনের দুধের সঙ্গে ভুল করে কিছু অবিশুদ্ধ সামুদ্রিক লবণ মিশে গিয়েছিল। সেই লবণে থাকা ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালসিয়ামের প্রভাবে তরল সয়াবিন জমাট বেঁধে পানির মতো নরম হয়ে যায়। প্রোটিনের এই জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া থেকেই আজকের জনপ্রিয় টোফু।

কিশমিশ

১০. কিশমিশ

মিষ্টি কিশমিশ কিন্তু কোনো মানুষের বানানো রেসিপি নয়। আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে মানুষ প্রথম আঙুরগাছেই শুকিয়ে যাওয়া কিছু আঙুর খুঁজে পেয়েছিল। রোদ আর বাতাসের প্রভাবে আঙুরের পানি শুকিয়ে গিয়ে সেগুলো কিশমিশে পরিণত হয়েছিল। শুরুতে মানুষ এগুলো কেবল সাজসজ্জার জন্য ব্যবহার করত। কিন্তু পরে যখন এর স্বাদের কথা জানাজানি হলো, তখন তা দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি একটা সময় কিশমিশকে ওষুধ ও খেলার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবেও দেওয়া হতো।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট, ফার্ম ফ্লেবার
আরও পড়ুন