শেখার জন্য কি শুধু বই পড়তে হবে, নাকি শুনেও শেখা যায়
চোখটা একটু বন্ধ করে কয়েক শ বছর পরের কথা কল্পনা করো তো! চারদিকে হয়তো উড়ন্ত গাড়ি, মানুষ হয়তো এক গ্যালাক্সি থেকে অন্য গ্যালাক্সিতে অবলীলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। হয়তো আমরা থাকছি বিশাল কোনো মহাকাশযানে কিংবা সমুদ্রের তলদেশের কোনো শহরে, যার আকাশের রং হয়তো বেগুনি।
এবার ভাবো তো, ভবিষ্যতের সেই আধুনিক কোনো কিশোরের শোবার ঘরটা কেমন হবে? হয়তো পুরো দেয়ালজুড়েই থাকবে বিশাল একটি থ্রিডি স্ক্রিন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে হয়তো শনির বলয় বা নেপচুনের নীল আলো দেখা যাবে। কিন্তু এবার নিজেকে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করো, সেই অত্যাধুনিক ঘরের কোথাও কি ছাপানো বই আছে?
এই মুহূর্তে তোমার আশপাশে তাকালে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও একটা বই চোখে পড়বে। হয়তো পড়ার টেবিলে, বিছানার ওপর কিংবা বালিশের নিচে। আজকাল তো ইন্টারনেটের যুগ। ইউটিউবে হাজারো ভিডিও, স্পটিফাইতে লাখ লাখ পডকাস্ট ও অডিওবুক। আমরা চাইলে বিশ্বের যেকোনো কিছু শুধু কানে শুনেই শিখে নিতে পারি। তাহলে মানুষ এখনো এত কষ্ট করে বই পড়ে কেন? শুধু কানে শোনার চেয়ে চোখের সামনে অক্ষর ধরে ধরে পড়ার আলাদা কোনো দাম আছে কি?
স্নায়ুবিজ্ঞান এবং ভাষা নিয়ে কাজ করেন, এমন বিজ্ঞানীরা ঠিক এ বিষয় নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন। এমআরআই এবং ইইজির মতো অত্যাধুনিক স্ক্যানিং যন্ত্র ব্যবহার করে তাঁরা দেখেছেন, আমরা যখন কোনো কিছু পড়ি এবং যখন কোনো কিছু শুনি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে ঠিক কী কী ঘটে। তুমি বই পড়ো বা অডিও শোনো, তোমার মূল লক্ষ্য কিন্তু একটাই—বিষয়টি বোঝা। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, পড়া ও শোনার কাজটা আমাদের মস্তিষ্ক একদম আলাদাভাবে করে। একটি দিয়ে কখনোই অন্যটির পুরোপুরি অভাব মেটানো সম্ভব নয়।
মস্তিষ্কের ভেতরে কী ঘটে
তুমি যখন বই পড়ো, তখন তোমার মস্তিষ্ক পর্দার আড়ালে ভীষণ পরিশ্রম করে। সে প্রথমে অক্ষরের আকারগুলো চেনে, সেগুলোকে শব্দের সঙ্গে মেলায়, তারপর সেই শব্দগুলোকে জোড়া লাগিয়ে অর্থ তৈরি করে। শুধু তা-ই নয়, একটি পুরো বইয়ের এক বাক্যের সঙ্গে অন্য বাক্যের সম্পর্কও সে মস্তিষ্কের হার্ডড্রাইভে সেভ করে রাখে। বই পড়ার সময় যতিচিহ্ন, প্যারাগ্রাফ বা বোল্ড করা শব্দগুলো তোমাকে বুঝতে খুব সাহায্য করে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তুমি নিজের গতিতে পড়তে পারো। এখানে কোনো তাড়াহুড়া নেই।
অন্যদিকে শোনার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তুমি যখন কিছু শোনো, তখন তোমার মস্তিষ্ককে বক্তার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। মুখের কথা তো বাতাসেই মিলিয়ে যায়! তাই যা শুনছ, তা মনে রাখার জন্য মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত শক্তি খরচ করতে হয়। তা ছাড়া মানুষ যখন কথা বলে, তখন অনেকগুলো শব্দ একসঙ্গে মিলেমিশে যায়। তোমার মস্তিষ্ককে খুব দ্রুত সেই শব্দগুলো আলাদা করে অর্থ বের করতে হয়। এর পাশাপাশি বক্তার গলার স্বর, আবেগ এবং আশপাশের পরিবেশও মস্তিষ্ককে খেয়াল রাখতে হয়।
পড়া সহজ নাকি শোনা সহজ
অনেকেই ভাবে, পড়ার চেয়ে শোনা বুঝি অনেক সোজা! কিন্তু গবেষণা বলছে, জটিল বা নতুন কোনো বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে শোনার চেয়ে পড়াই বেশি সহজ। গল্পের বই বা সাধারণ কোনো কাহিনি শোনার ক্ষেত্রে হয়তো খুব একটা সমস্যা হয় না। কিন্তু বিজ্ঞান, ইতিহাস বা জটিল কোনো তথ্যমূলক প্রবন্ধ পড়ার সময় তোমার মস্তিষ্কের অন্য একটি অংশ কাজ শুরু করে, যা তোমাকে কৌশলগতভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করে। কল্পকাহিনির জন্য এক রকম নেটওয়ার্ক এবং নন-ফিকশন বা তথ্যমূলক লেখার জন্য আরেক রকম নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মস্তিষ্ক।
বাস্তবতার দিক থেকেও চিন্তা করে দেখো। একটা কঠিন বই পড়ার সময় কোনো লাইন বুঝতে না পারলে তুমি সহজেই সেখানে থেমে যেতে পারো। লাইনটা বারবার পড়তে পারো কিংবা নিচে দাগ দিয়ে রাখতে পারো। কিন্তু পডকাস্ট বা অডিও শোনার সময় কিছু বুঝতে না পারলে বারবার থামিয়ে পেছনে টেনে শোনাটা বেশ বিরক্তিকর। এতে মনঃসংযোগ নষ্ট হয় এবং পুরো বিষয় বুঝতে বেশ সমস্যা হয়।
মনোযোগ ও মাল্টিটাস্কিংয়ের খেলা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো মনোযোগ। পড়ার সময় তুমি চাইলেই অন্য কোনো কাজ করতে পারবে না। তোমাকে পুরো মনোযোগ বইয়ের পাতাতেই রাখতে হবে। কিন্তু মানুষ সাধারণত অডিওবুক শোনে অন্য কাজ করতে করতে। হয়তো তুমি হাঁটছ, রান্না করছ, ব্যায়াম করছ কিংবা ইন্টারনেটে অন্য কিছু ব্রাউজ করছ; তখন কানে ইয়ারফোন গুঁজে কিছু শুনছ।
বিজ্ঞানীরা একবার কলেজের একদল শিক্ষার্থীকে একটি বিষয় বই থেকে পড়তে দেন, আরেক দলকে একই বিষয় পডকাস্টে শুনতে দেন। এরপর সবার পরীক্ষা নেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা গেল, যারা বইটি পড়েছিল, তারা পরীক্ষায় অনেক ভালো করেছে। কারণ, যারা শুনেছিল, তাদের অনেকেই শোনার পাশাপাশি কম্পিউটারে অন্য কাজ করছিল। আর নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে মনোযোগের কোনো বিকল্প নেই।
তাই সহজ কথায় বলতে গেলে, পডকাস্ট বা অডিওবুকের এই আধুনিক যুগেও বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা একবিন্দুও কমেনি। শোনারও অনেক সুবিধা আছে, কিন্তু গভীরভাবে শিখতে বা বুঝতে হলে পড়তেই হবে। তাই মস্তিষ্ককে চিন্তাশীল করতে হলে চোখ খুলে বইয়ের পাতায় ডুব দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।