একটি বিড়ালকে আটক করতে লাগল তিন বছর

নিউজিল্যান্ডের উত্তরে একটা উপদ্বীপ আছে, নাম পুরেরুয়া। সমুদ্রঘেঁষা, জলাভূমি আর বনে ঢাকা। সেখানে বাস করত ধূসর রঙের একটা বুনো বিড়াল। যেটি আগে বুনো ছিল না। বাসাবাড়ির সাধারণ বিড়ালের প্রজাতি। এর শরীরটা বেশ বড়। চোখে-মুখে সতর্কতা। মানুষ দেখলেই মিলিয়ে যেত ঝোপের আড়ালে। স্থানীয় লোকজন নাম দিয়েছিলেন ‘নাইন লাইভস’। ৯ জীবনের বিড়াল। কারণটা সহজ। যতবারই তাকে ধরার চেষ্টা হয়েছে, ততবারই ফসকে গেছে।

গল্পটা শুরু ২০২৩ সালে। তখন পুরেরুয়া উপদ্বীপে ছাড়া হচ্ছিল পাতেকে। খুদে একটা হাঁস, নিউজিল্যান্ডের একেবারে নিজস্ব প্রজাতি। উড়তে পারে না ভালোভাবে। রাতে বের হয়। আকারে সাধারণ হাঁসের অর্ধেক। একসময় লাখে লাখে ছিল এই পাখি। তারপর বিড়াল, স্টোট, উইজেল এসব শিকারি প্রাণী এল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে। নব্বইয়ের দশকে সংখ্যাটা নেমে দাঁড়াল মোটে ৭০০–তে। এখন প্রায় দুই হাজার, তা–ও ২০ বছরের যত্ন-আত্তির ফল। পৃথিবীর চতুর্থ বিরলতম হাঁস প্রজাতি বলা হয় একে।

তো সেই বিরল পাতেকে যখন পুরেরুয়ায় ছাড়া হলো, ২১টি পাখিকে। মানে গোটা প্রজাতির প্রায় ১ শতাংশ। কিছুদিনের মধ্যেই একে একে হারিয়ে যেতে লাগল। কাজ করছিলেন যাঁরা, তাঁরা টের পেলেন, কেউ একজন শিকার করে চলেছেন নিয়মিত। ক্যামেরা বসানো হলো বনজুড়ে। ছবিতে ধরা পড়ল সেই ধূসর বিড়াল। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পাতেকে মারা গিয়েছিল এর হাতে, এমনটাই ধারণা করছেন সংরক্ষণকর্মীরা। অ্যান্ড্রু মেন্টর এই প্রকল্পের সমন্বয়কারী। তিনি বলেছেন, কিউই পাখির ছানাও বাদ যায়নি এর তালিকা থেকে।

এবার প্রশ্ন হলো, একটা বিড়াল ধরা এত কঠিন কেন?

আরও পড়ুন

উত্তরটা লুকিয়ে আছে বিড়ালের স্বভাবে। নিউজিল্যান্ডের বেশির ভাগ বুনো বিড়াল এসেছে উত্তর আফ্রিকার শিকারি বিড়ালের বংশ থেকে। শিকার এদের রক্তে।

নাইন লাইভস কখনো একই জায়গায় দুইবার ফাঁদের কাছে আসত না। আবহাওয়া বদলাত, চাঁদের আলো বদলাত, আর সে বদলে ফেলত নিজের পথ। মেন্টর বলছিলেন, রাতের পর রাত অপেক্ষা করেও কিছু মেলেনি বহুবার। জঙ্গলে বসে থাকা, নিঃশব্দে, ঠান্ডায়। অথচ বিড়ালটা যেন জানত কখন কোথায় ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

এই লড়াই এত কৌতূহল উদ্দীপক হয়ে উঠেছিল, সিএনএনের একটা দল এ বছরের শুরুতে নিউজিল্যান্ডে গিয়েছিল প্রামাণ্যচিত্র বানাতে। রেডিও পডকাস্টেও জায়গা পেয়েছিল নাইন লাইভসের গল্প। একটা বিড়াল, অথচ তাকে ঘিরে এত আয়োজন। অবাক লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকৃতিতে একটি মাত্র শিকারি প্রাণীও পুরো বাস্তুতন্ত্র ওলট–পালট করে দিতে পারে। বিশেষত সেই বাস্তুতন্ত্র যদি হয় দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন, ভঙ্গুর।

তিন বছর ধরে চলল লুকোচুরি। ফাঁদের ধরন বদলানো হলো বারবার। টোপ বদলানো হলো। ক্যামেরার নেটওয়ার্ক বাড়ানো হলো ধীরে ধীরে, যতক্ষণ না পুরো এলাকা ঢেকে গেল নজরদারিতে। তারপর এল সেই রাত। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। নাইন লাইভস ফিরে এল একই জায়গায়। টানা তৃতীয় রাতের মতো। এমনটা সে আগে কখনো করেনি।

সেই সুযোগেই কাজ সারলেন সংরক্ষণকর্মীরা।

আরও পড়ুন

খবরটা যখন ছড়াল, অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগবে, বিড়ালটাকে মেরে ফেলাই কি একমাত্র উপায় ছিল? মেন্টর নিজেও স্বীকার করেছেন, এটা সহজ সিদ্ধান্ত না। তাঁর কথায় স্পষ্ট, পোষা বিড়াল আর বুনো বিড়াল এক জিনিস নয়। ঘরের বিড়াল মানুষের সঙ্গী, ভালোবাসার প্রাণী। কিন্তু জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া বা হারিয়ে যাওয়া বিড়াল একসময় বুনো হয়ে ওঠে। আর তখন সে হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় বন্য প্রাণীর জন্য সরাসরি হুমকি। নিউজিল্যান্ডের বনে হাজার হাজার এমন বুনো বিড়াল ঘুরে বেড়ায় আর প্রতিটিই পাতেকে বা কিউইর মতো অরক্ষিত প্রাণীর জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

এই ঘটনা থেকে একটা শিক্ষাও পেয়েছেন সংরক্ষণকর্মীরা। ২০২৩ সালে যখন পাতেকে ছাড়া হয়েছিল, তাঁরা ভেবেছিলেন, এলাকাটা যথেষ্ট নিরাপদ। পোসাম প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল তত দিনে। ইঁদুর আর স্টোটের সংখ্যাও কমেছিল অনেকখানি। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, একটা মাত্র চতুর বিড়ালই যথেষ্ট গোটা প্রকল্প ভেস্তে দেওয়ার জন্য। তাই আপাতত নতুন করে পাতেকে ছাড়া বন্ধ রাখা হয়েছে, যতক্ষণ না এলাকাটা পুরোপুরি নিরাপদ প্রমাণিত হয়।

তবে গল্পটা শুধু হতাশার নয়। পুরেরুয়া উপদ্বীপে এখন কিউই পাখির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। সম্ভবত গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে ঘন কিউই বসতি এলাকা এটাই। ছোট্ট নীল পেঙ্গুইন কোরোরা, সামুদ্রিক পাখি ওই, নানা জাতের গিরগিটি, জলাভূমির পাখি, সবাই টিকে আছে এই এলাকায়। শুধু বছরের পর বছর ধরে চলা এই নীরব পরিশ্রমের কারণে। যাঁরা রাতের পর রাত জঙ্গলে কাটিয়েছেন, ক্যামেরা বসিয়েছেন, ফাঁদ পেতেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে মেন্টর নাকি সবাইকে নিয়ে একবেলা খাওয়াদাওয়ারও আয়োজন করছেন।

নাইন লাইভসের গল্পটা আসলে একটা মাত্র বিড়ালের গল্প নয়। এটা দেখায়, প্রকৃতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা কঠিন কাজ। মানুষ যখন কোনো প্রাণী, এমনকি নিজের প্রিয় পোষা প্রাণীও বনে ছেড়ে দেয় বা হারিয়ে ফেলে, তার প্রভাব গিয়ে পড়ে এমন সব প্রাণীর ওপর, যাদের সঙ্গে হয়তো তার কোনো সরাসরি সম্পর্কই নেই। একটা ছোট্ট, উড়তে না পারা হাঁস। একটা লাজুক কিউই ছানা। এদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে এমন সব সিদ্ধান্তের ওপর, যেগুলো নেওয়া হয় বহু দূরে, মানুষের ঘরবাড়িতে।

তিন বছরের অপেক্ষা শেষ হলো এক রাতে। কিন্তু পুরেরুয়ার জঙ্গলে কাজ এখনো শেষ হয়নি। নতুন কোনো বিড়াল, নতুন কোনো হুমকি হয়তো আবারও আসবে সেই দুই কিলোমিটার চওড়া স্থলভাগ পেরিয়ে, যেটা উপদ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে। সংরক্ষণকর্মীরা তাই আবার ফিরে যাচ্ছেন তাদের পুরোনো কাজে। নজর রাখা, খুঁজে বের করা আর সাড়া দেওয়া। ঠিক যেমনটা তাঁরা করছিলেন নাইন লাইভস আসার আগেও।

তথ্যসূত্র; নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড
আরও পড়ুন