আর্টেমিস–২ মিশনের নভোচারীরা পৃথিবীতে ফিরবেন যেভাবে
মিশনের ষষ্ঠ দিনে পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে পৌঁছে চারজন নভোচারী এক নতুন ইতিহাস গড়েছেন। এর আগে কোনো মানুষ পৃথিবী থেকে এত দূরে যাত্রা করেনি। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণের পাঁচ দিন পর গত সোমবার বিকেলে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মহাকাশযানটি তার গতি বাড়িয়েছে। এর উদ্দেশ্য চাঁদের উল্টো পিঠ বা দূরবর্তী অংশ প্রদক্ষিণ করা।
হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোল থেকে কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেনি গিবন্স ক্রুদের জানান, তাঁরা আজ পুরো মানবজাতির জন্য এক নতুন সীমা অতিক্রম করছেন। এর জবাবে মিশনের সদস্য জেরেমি হ্যানসেন আগের মহাকাশ অভিযাত্রীদের কাজের প্রশংসা করেন।
জেরেমি হ্যানসেন বলেন, এই রেকর্ড গড়ার মূল উদ্দেশ্য বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মহাকাশ গবেষণায় আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিতে উৎসাহিত করা। তিনি চান এই নতুন রেকর্ডও যেন খুব দ্রুত অন্য কেউ ভেঙে দেয়। কয়েক ঘণ্টা পর জেরেমি হ্যানসেন, রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ—এই চারজন নভোচারী গত ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের পেছনের অংশে প্রদক্ষিণ করেন।
আর্টেমিস ২ মহাকাশযানটি চাঁদের উল্টো পিঠে গেলে পৃথিবীর সঙ্গে ভিডিও ও রেডিও যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মহাকাশযান যখন চাঁদের এই অংশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন নভোচারীরা পৃথিবী থেকে ২ দশমিক ৫ লাখ মাইলের বেশি দূরে এবং চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৪ হাজার মাইল উচ্চতায় ছিলেন। এটি ছিল মানুষের তৈরি মহাকাশযানের জন্য পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বের রেকর্ড।
অর্থাৎ নাসার আর্টেমিস–২ মহাকাশযানটি তার ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযানের অর্ধেক পথ সফলভাবে শেষ করেছে। এখন বাকি পৃথিবীতে ফেরা। এটি পৃথিবী থেকে চাঁদে গিয়ে আবার ফিরে আসার জন্য ইংরেজি আট অক্ষরের মতো একটি বিশেষ পথ বা ‘ফ্রি রিটার্ন ট্রাজেক্টরি’ ব্যবহার করছে। এখন মহাকাশযানটি তার যাত্রার দ্বিতীয় অংশ অর্থাৎ পৃথিবীতে ফেরার যাত্রা শুরু করেছে।
১ এপ্রিল শুরু হওয়া নাসার আর্টেমিস–২ মিশন এখন সপ্তম দিনে রয়েছে। কিছু ছোটখাটো কম্পিউটার ত্রুটি ও শৌচাগারের সমস্যা হলেও মহাকাশযানটি বেশ ভালোভাবেই কাজ করছে। এই ফিরে আসার জন্য ওরিয়নকে তার ইঞ্জিনের ওপর খুব একটা নির্ভর করতে হচ্ছে না। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এটি নিজে থেকেই পৃথিবীর দিকে ঘুরে গেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফ্রি রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’। এখানে ‘ফ্রি’ বা মুক্ত বলার কারণ, রকেট ইঞ্জিনের সাহায্য ছাড়াই মহাকাশযানটি অনেকটা ঢালু রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে পড়ার মতো করে পৃথিবীতে ফিরে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পথে ফেরার দুটি উপায় ছিল। একটি হলো চাঁদের আড়ালে থাকা অবস্থায় ইঞ্জিন চালু করা, যেখানে পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকে না। অন্যটি হলো পৃথিবীর কাছাকাছি থাকতেই ইঞ্জিন চালিয়ে পথ ঠিক করে নেওয়া। নাসা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছে। কারণ, এতে ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা হলেও নভোচারীদের ঝুঁকি অনেক কম থাকে। এই নিরাপদ পথটি বেছে নেওয়ার কারণেই মূলত দূরত্বের এই বিশ্ব রেকর্ডটি তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ওরিয়ন ক্যাপসুলটি প্রায় ছয় মিনিট ধরে তার রকেট ইঞ্জিন চালু রেখেছিল। এতে প্রায় ১ হাজার পাউন্ড জ্বালানি খরচ হয়। এই ধাক্কাটিই মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর আকর্ষণ কাটিয়ে চাঁদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এ প্রক্রিয়াটি এত নিখুঁত ছিল যে মাঝপথে গতিপথ ঠিক করার জন্য আরও যে তিনটি ছোট ছোট ইঞ্জিন পরীক্ষা করার কথা ছিল, তার মধ্যে দুটিই আর প্রয়োজন হয়নি।
আর্টেমিস–২ মিশনে এই ফিরে আসার পথটি অনেকটা মার্বেল খেলার মতো। মহাকাশযানটিকে এমন একটি নির্দিষ্ট গতি ও উচ্চতায় পাঠানো হয়েছে, যা চাঁদের চারপাশের বক্রপথ ঘুরে আবার পৃথিবীর আকর্ষণের সীমানায় চলে আসে। একবার এই নির্দিষ্ট পথে উঠে পড়লে বাড়তি কোনো শক্তি বা জ্বালানি ছাড়াই মহাকাশযানটি সেই পথ অনুসরণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। একেই বলা হয় ‘ফ্রি রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’।
এই পদ্ধতির প্রথম ব্যবহার হয়েছিল ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা ৩ মিশনে। তবে এর সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যবহার দেখা যায় ১৯৭০ সালে নাসার অ্যাপোলো ১৩ অভিযানে। মাঝপথে বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর এই ফ্রি রিটার্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেই তিনজন নভোচারীকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।
বিজ্ঞানের ভাষায় এই জটিল হিসাবকে বলা হয় ‘থ্রি-বডি প্রবলেম’। এখানে তিনটি বস্তু হলো পৃথিবী, চাঁদ ও মহাকাশযান। যখন মহাকাশযানটি পৃথিবীর আকর্ষণের সীমানা ছাড়িয়ে চাঁদের সীমানায় প্রবেশ করে, তখন চাঁদ তাকে নিজের দিকে টেনে নেয় ও ঘুরিয়ে দেয়। এর ফলে মহাকাশযানটি আগের চেয়ে দ্রুত ও ভিন্ন একটি পথে পৃথিবীর দিকে ফিরে আসে।
এই একই কৌশল ব্যবহার করে নাসার ভয়েজার ২–এর মতো দূরপাল্লার মহাকাশযানগুলো সৌরজগতের এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে যাত্রা করে। একে বলা হয় মহাকর্ষীয় স্লিংশট। যখন কোনো মহাকাশযান কোনো বড় গ্রহ বা চাঁদের সামনে দিয়ে যায়, তখন সেই বড় বস্তুর আকর্ষণ মহাকাশযানের গতিপথ বদলে দেয়। আর্টেমিস–২ মিশনের ক্ষেত্রেও পদার্থবিজ্ঞানের এ নিয়মটি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ১০ এপ্রিল নভোচারীদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওরিয়ন ক্যাপসুলটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের অবতরণ করবে। অবতরণের পর নাসা ও মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ উদ্ধারকারী দল সমুদ্র থেকে ক্যাপসুল এবং চারজন নভোচারীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসবে।