আর্টেমিস-২ মিশনে চাঁদের এত কাছে গিয়েও কেন অবতরণ করবেন না নভোচারীরা

নাসার আর্টেমিস ২ মিশনে চাঁদে উদ্দেশ্যে যাবেন চারজন নভোচারীছবি: নাসা

চাঁদের বুকে মানুষের শেষবার পা রাখার পর কেটে গেছে ৫০ বছরের বেশি সময়। দীর্ঘ এই বিরতির পর একদল নভোচারী নতুন এক ইতিহাস তৈরি করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এ অভিযানে এখনই চাঁদের মাটিতে অবতরণের কথা ভাবছে না নাসা। কারণ, এবার তারা চাঁদের মাটিতে না নেমে কেবল এর চারপাশ ঘুরে আসার মিশনে যাচ্ছেন।

নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেট ও ওরিয়ন ক্যাপসুল এখন ইতিহাস গড়ার পথে। এই রকেটে চড়েই চার নভোচারী পাড়ি দেবেন চাঁদে। ইতিমধ্যে রকেটটিকে ভেহিকেল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং থেকে বের করে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের মূল লঞ্চপ্যাডে নিয়ে আসা হয়েছে।

কেনেডি স্পেস সেন্টারের বিজ্ঞানীরা এসএলএস রকেটটি নিয়ে একটি ড্রেস রিহার্সাল চালাচ্ছেন। তাঁদের লক্ষ্য রকেটের জ্বালানি পরীক্ষাটি সফল করা। এই পরীক্ষা সফল হলেই চার নভোচারীর চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসার মিশন শুরু হবে।

গত শনিবার সন্ধ্যায় শুরু হওয়া এই রিহার্সালের কাউন্টডাউন চলবে সোমবার রাত ৯টা পর্যন্ত। আসলে ফ্লোরিডায় তীব্র ঠান্ডা আর তুষারপাতের মতো আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষাটি দুই দিন পিছিয়ে গেছে। এই বিলম্বের কারণে আর্টেমিস-২ মিশনের চূড়ান্ত উৎক্ষেপণের সময়ও কিছুটা বদলে গেছে। এখন ঠিক হয়েছে, ৬ ফেব্রুয়ারির বদলে ৮ ফেব্রুয়ারি রাতের আগে রকেটটি চাঁদে যাবে না।

আরও পড়ুন

সবকিছু ঠিক থাকলে ১০ দিনের মহাকাশযাত্রা হবে আর্টেমিস-২। এই অভিযানে মহাকাশচারীরা হলেন মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এত টাকা খরচ করে চাঁদের এত কাছে গিয়েও কেন নভোচারীরা চাঁদের মাটিতে নামবেন না? এককথায় এ প্রশ্নের উত্তর, এই রকেটের চাঁদে নামার ক্ষমতাই নেই। নাসার ডেপুটি লিড প্যাটি ক্যাসাস হর্ন বিষয়টি নিয়ে কথাও বলেন। তিনি জানিয়েছেন, আর্টেমিস-২ কোনো ল্যান্ডার নয়, অর্থাৎ এটি মাটিতে নামার জন্য তৈরি করা হয়নি।

আর্টেমিস-২ মিশনের মূল লক্ষ্য হলো নভোচারীদের মহাকাশের অনেক গভীরে নিয়ে যাওয়া। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই অভিযানের মাধ্যমেই ১৯৬০ ও ’৭০-এর দশকের সেই যুগান্তকারী অ্যাপোলো মিশনের পর আবারও চাঁদের মাটিতে মানুষের ফেরার পথ তৈরি হবে। নাসা শেষবার চাঁদে মানুষ পাঠিয়েছিল ৫৩ বছর আগে, ১৯৭২ সালের ‘অ্যাপোলো-১৭’ মিশনে। এরপর দীর্ঘ সময় মানুষ আর চাঁদের মাটি স্পর্শ করেনি।

আরও পড়ুন

নাসার কাজের ধরনই হলো ধাপে ধাপে এগোনো। মহাকাশে চরম ঝুঁকি। আর নাসা চায় সেই ঝুঁকি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে। তাদের পদ্ধতিটা হলো প্রথমে একটি প্রযুক্তি তৈরি করা, তারপর সেটি পরীক্ষা করা। আর্টেমিস-২ মিশনের মূল লক্ষ্য চাঁদে নামা নয়; বরং মহাকাশচারীরা এই নতুন যানে চড়ে মহাকাশে কতটুকু নিরাপদ থাকতে পারছেন, তা পরীক্ষা করা।

তবে চাঁদের মাটিতে নামার সেই কাঙ্ক্ষিত অভিযানটি হবে আর্টেমিস-৩ মিশনে। ইলন মাস্কের স্পেসএক্স বর্তমানে এই ল্যান্ডারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্পেসএক্স জানিয়েছে, ২০২৮ সালের দিকে মিশনটি চালু হতে পারে। তবে মহাকাশবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘টাইম’–এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞই খুব একটা নিশ্চিত হতে পারছেন না। অর্থাৎ চাঁদে নামার জন্য আমাদের হয়তো আরও কিছুটা ধৈর্য ধরতে হতে পারে।

আরও পড়ুন

চাঁদের মাটিতে পা না রাখলেও আর্টেমিস-২ মিশনের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। অভিযানটি আসলে নাসার জন্য একটি বিশাল রাজনৈতিক ও কৌশলগত মাইলফলক। পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে মানুষকে এত দূরে পাঠাতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রচুর অর্থায়ন এবং উন্নত প্রযুক্তি। এই ক্রু মিশনটি বিশ্বের কাছে প্রমাণ করবে, নাসা আবারও মহাকাশ অভিযানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। এটি দেখে বিভিন্ন দেশ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নাসার সঙ্গে কাজ করতে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।

অভিযানে চার নভোচারী হতে যাচ্ছেন প্রথম মানুষ, যাঁরা চাঁদের ওই রহস্যময় উল্টো পিঠ নিজের চোখে দেখবেন। তবে কেবল দৃশ্য দেখাই নয়, মিশনটি একটি বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও বটে। নভোচারীরা যখন কাজ শেষ করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসবেন, তখন তাঁদের গতি হবে ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল। এর আগে কোনো মানুষ এত দ্রুতগতিতে ভ্রমণ করেননি। তাই এই প্রচণ্ড গতি সামলে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসাটাই হবে এই মিশনের সবচেয়ে বড় জয়।

সূত্র: নাসা, সিএনএন, স্পেস ডটকম, পিপলস ডটকম, ইউরো নিউজ

আরও পড়ুন