বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ ও প্রণালি কোনগুলো

বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সমুদ্রপথের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল কেবল হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে এই পথটি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। আসলে সমুদ্রপথই পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। পরিমাণের দিক থেকে বিশ্ববাণিজ্যের ৮০ শতাংশ পণ্যই জাহাজে আনা–নেওয়া করা হয়।

তবে এই বাণিজ্যের পথে বড় বাধা হলো সুয়েজ বা পানামা খালের মতো সরু পানিপথগুলো। এসব পথে যুদ্ধ বা জাহাজজট সৃষ্টি হলে জাহাজ চলাচলে দেরি হয়। তখন জাহাজগুলো বাধ্য হয়ে আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। এতে যাতায়াত খরচ অনেক বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে। তাই জেনে নাও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ১০ পানিপথ সম্পর্কে, যা পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে।

হরমুজ প্রণালি
ফাইল ছবি: রয়টার্স

১. হরমুজ প্রণালি

অবস্থান: এটি ইরান ও ওমানের মাঝে অবস্থিত, যা পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: এই পানিপথটি বেশ সরু; এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ৩৯ কিলোমিটার (২১ নটিক্যাল মাইল) চওড়া।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন এই পথ দিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়। ১ ব্যারেল তেল সাধারণত প্রায় ১৫৯ লিটার হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ। সারা বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ কেবল এই একটি সামুদ্রিক পথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই প্রণালিটি বর্তমানে ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন
বাব আল-মানদেব প্রণালি

২. বাব আল-মানদেব প্রণালি

অবস্থান: এটি ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝে অবস্থিত, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: এই পানিপথটি অত্যন্ত সরু; এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ৩২ কিলোমিটার (১৭ নটিক্যাল মাইল) চওড়া।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন এই পথ দিয়ে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

ভারত মহাসাগর থেকে লোহিত সাগরে প্রবেশের একমাত্র পথ হলো এই বাব আল-মানদেব। এটি সরাসরি সুয়েজ খালের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ব্যবসা–বাণিজ্য সহজ করে দেয়। প্রতিদিন বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই পথ দিয়েই সম্পন্ন হয়। বর্তমানে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এই এলাকায় ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালানোয় পথটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পথটি কোনো কারণে বন্ধ বা বিঘ্নিত হলে জাহাজগুলোকে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যা সময় ও খরচ দুটোই বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন
পাখির চোখে সুয়েজ খাল
ছবি: এএফপি

৩. সুয়েজ খাল

অবস্থান: এটি মিসরের সিনাই উপদ্বীপকে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করেছে এবং ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: খালটি অত্যন্ত সরু; এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ২২৫ মিটার বা ৭৪০ ফুট।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন এই খাল দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

১৮৬৯ সালে চালু হওয়া এই কৃত্রিম খালটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাতায়াতের দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কিলোমিটার কমিয়ে দিয়েছে। এটি না থাকলে জাহাজগুলোকে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যেতে হতো। ২০২১ সালে এভার গিভেন নামের একটি বিশাল কনটেইনার জাহাজ এই খালে আটকে যাওয়ায় টানা ছয় দিন বিশ্ববাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছিল।

আরও পড়ুন
তুর্কি প্রণালি

৪. তুর্কি প্রণালি

অবস্থান: এটি বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালি নিয়ে গঠিত, যা কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ৭০০ মিটার বা ২ হাজার ৩০০ ফুট প্রশস্ত।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন এই পথ দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

এই প্রণালিটি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর জন্য বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক পথ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যাবশ্যকীয় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনে এই পথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন
জিব্রাল্টার প্রণালি

৫. জিব্রাল্টার প্রণালি

অবস্থান: স্পেন ও মরক্কোর মাঝে অবস্থিত এই প্রণালিটি আটলান্টিক মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি ১৩ কিলোমিটার বা ৭ নটিক্যাল মাইল চওড়া।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন এই পথ দিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যারেল তেল পার হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের এটিই একমাত্র প্রাকৃতিক পথ। সুয়েজ খালের দিকে যাওয়া সব জাহাজের জন্য এটি পশ্চিমের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। কৌশলগত অবস্থানের কারণে দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে এই পানিপথটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে অনেক বিতর্ক ও যুদ্ধ হয়েছে।

আরও পড়ুন
ড্যানিশ প্রণালি

৬. ড্যানিশ প্রণালি

অবস্থান: এটি ডেনমার্ক ও সুইডেনকে আলাদা করেছে এবং বাল্টিক সাগরকে উত্তর সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ৩ দশমিক ৭ কিমি বা ২ নটিক্যাল মাইল।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন এই পথ দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

বাল্টিক সাগরের বন্দরগুলো থেকে রাশিয়ার তেল বিশ্ববাজারে পাঠানোর জন্য এই পথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ইউরোপকে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে এই সরু ড্যানিশ প্রণালি বড় ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন
মালাক্কা প্রণালি

৭. মালাক্কা প্রণালি

অবস্থান: মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই পথটি ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরকে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: এর সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন প্রায় ২ দশমিক ৩ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

এটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত জাহাজ চলাচলের পথ। বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ ও চীনের তেল আমদানির ৮০ শতাংশ এই পথেই সম্পন্ন হয়। এমনকি তেলের প্রবাহের দিক থেকে এটি হরমুজ প্রণালিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

আরও পড়ুন
তাইওয়ান প্রণালি
ছবি: আইআইএসএস

৮. তাইওয়ান প্রণালি

অবস্থান: এটি চীনের মূল ভূখণ্ড ও তাইওয়ান দ্বীপের মাঝে অবস্থিত এবং দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরকে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি ১৩০ কিলোমিটার।

বাণিজ্যিক গুরুত্ব

বিশ্বের কনটেইনারবাহী জাহাজের অর্ধেক ও উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বা কম্পিউটার চিপের বেশির ভাগই এই পথ দিয়ে যায়। বার্ষিক বিশ্ববাণিজ্যের ২০ শতাংশেরও বেশি এই পথের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে চীন ও তাইওয়ানের সামরিক উত্তেজনার কারণে এই পথটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন
পানামা খাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সব জাহাজকে মাশুল দিতে হয়
ছবি: রয়টার্স

৯. পানামা খাল

অবস্থান: পানামার ভেতর দিয়ে যাওয়া এই কৃত্রিম খালটি ক্যারিবিয়ান সাগরকে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

প্রস্থ: এর সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ২২২ মিটার।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

১৯১৪ সালে চালু হওয়া এই খালে বিশেষ লক ব্যবস্থা আছে, যা জাহাজকে পানির স্তরের ওপর ভিত্তি করে ওঠাতে বা নামাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার পরিবহনের ৪০ শতাংশ এবং এশিয়ায় তাদের জ্বালানি গ্যাস রপ্তানির প্রায় ৯৫ শতাংশই এই খালের ওপর নির্ভরশীল।

আরও পড়ুন

১০. কেপ অব গুড হোপ

অবস্থান: দক্ষিণ আফ্রিকার একদম দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত।

বৈশিষ্ট্য: এটি উন্মুক্ত মহাসাগর হওয়ায় যেকোনো বিশাল জাহাজ এখান দিয়ে যেতে পারে।

তেলের প্রবাহ: প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

সুয়েজ খাল বা বাব আল-মানদেব প্রণালিতে যুদ্ধ বা কোনো সমস্যা দেখা দিলে জাহাজগুলো এই দীর্ঘ পথটি বেছে নেয়। এই পথে যেতে সময় ১০ থেকে ১৪ দিন বেশি লাগে এবং ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৪০০ কিমি বাড়তি পথ পাড়ি দিতে হয়। তবু সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়াতে এটিই একমাত্র কার্যকর বিকল্প।

সূত্র: আল–জাজিরা

আরও পড়ুন