নীল তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণীতে পরিণত হলো কীভাবে

একবার চোখ বন্ধ করে তোমার দেখা সবচেয়ে বড় হাতিটার কথা কল্পনা করো তো। করেছ? এবার সেই হাতিটার পাশে ও রকম আরও ৩০টা হাতি পাশাপাশি কল্পনা করো। হ্যাঁ, ঠিক এতটুকুই বিশাল একটি নীল তিমি! পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে বড় কোনো প্রাণী আর কখনোই জন্ম নেয়নি।

সমুদ্রে রাজত্ব করা এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটির ওজন হতে পারে প্রায় ১৫০ টন। লম্বায় এরা হতে পারে ১০০ ফুটেরও বেশি। অর্থাৎ, আস্ত একটি বোয়িং–৭৩৭ বিমানের সমান! তুমি জেনে অবাক হবে, পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়ানো সবচেয়ে বড় ডাইনোসরটির ওজনও ছিল বড়জোর ৭৫ টন, যা একটি নীল তিমির ওজনের অর্ধেকের চেয়েও কম।

কিন্তু তোমার মনে কি কখনো এই প্রশ্ন জেগেছে, নীল তিমি কীভাবে এত বিশাল আকৃতির হলো? এর পেছনের বিজ্ঞানটা কী? চলো, আজ সেই বিজ্ঞানটাই জানার চেষ্টা করি।

মহাকর্ষের শিকল ভাঙার গল্প

ডাঙায় থাকা যেকোনো প্রাণীর বড় হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো মহাকর্ষ শক্তি বা গ্র্যাভিটি। একটি প্রাণী যত বড় হয়, এর ওজন বওয়ার জন্য হাড় এবং পায়ের পেশিগুলোও তত বেশি শক্ত হতে হয়। কিন্তু প্রাণীর আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের হাড়ের শক্তি সেভাবে বাড়ে না। ফলে ডাঙায় কোনো প্রাণী যদি নীল তিমির সমান বড় হতো, তবে মহাকর্ষ শক্তির টানে তার নিজের শরীরের ভারেই পা ভেঙে চুরমার হয়ে যেত!

কিন্তু পানিতে এই মহাকর্ষের কোনো ভয় নেই। পানির প্লবতা বা ভাসিয়ে রাখার ক্ষমতা জলজ স্তন্যপায়ীদের ওজন সামলাতে সাহায্য করে। আর এই পানিতে থাকার সুবিধাই নীল তিমিকে এত বিশাল হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে নীল তিমির এত বড় হওয়ার পেছনে শুধু পানির ভাসিয়ে রাখার ক্ষমতাই একমাত্র কারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব লুইজিয়ানার জীববৈচিত্র্যের অধ্যাপক ক্রেইগ ম্যাকক্লেন জানিয়েছেন, পানি শুধু প্রাণীকে ভাসিয়েই রাখে না; বরং উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট স্তন্যপায়ীদের বড় হতে বাধ্য করে!

বাতাসের চেয়ে পানিতে শরীরের তাপ অনেক দ্রুত হারিয়ে যায়। তাই পানিতে শরীর গরম রাখতে হলে প্রাণীদের আকার বড় হতে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, শরীর যত বড় হবে, তা চালানোর জন্য তত বেশি শক্তিরও দরকার হবে। তাই জলজ প্রাণীদের আকার এমন একটা নিখুঁত ব্যালান্সে এসে দাঁড়ায়, যেখানে তাদের খাবার থেকে পাওয়া শক্তি এবং শরীর গরম রাখার জন্য খরচ হওয়া শক্তির মধ্যে চমৎকার একটা ভারসাম্য থাকে। নীল তিমি বিশালদেহী হওয়ার কারণে খুব সহজেই তাদের শরীর গরম রাখতে পারে।

ক্যারিবীয় দেশ ডোমিনিকায় বিশ্বের প্রথম স্পার্ম তিমি সংরক্ষণাগার প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে। পাশাপাশি রেইনফরেস্ট আর ঝরনা মুগ্ধ করবে ভ্রনণপিপাসুদের
ছবি: স্পার্ম হোয়েল সুইমস ডটকম

খুদে চিংড়ি আর বিশাল পেট

নীল তিমি যে এত বিশাল, তাদের প্রধান খাবার কী জানো? ক্রিল নামে ছোট্ট, অনেকটা চিংড়ির মতো দেখতে একধরনের প্রাণী! এরা লম্বায় মাত্র ২ ইঞ্চির মতো হয় এবং সমুদ্রে বিশাল ঝাঁক বেঁধে সাঁতার কাটে।

এত ছোট খাবার খেয়ে এত বড় শরীর চালানো কীভাবে সম্ভব? এই রহস্য লুকিয়ে আছে তিমির গলার নিচে থাকা এক অদ্ভুত থলেতে। তিমির চোয়ালের নিচ থেকে নাভি পর্যন্ত লম্বা ভাঁজ করা একটি অংশ থাকে। যখন তারা ক্রিলের ঝাঁকের দিকে তেড়ে যায়, তখন এই থলেটি বিশাল বেলুনের মতো ফুলে ওঠে। একবার হাঁ করেই এরা প্রায় ৩৬০ কেজি ক্রিল গিলে নিতে পারে!

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেরেমি গোল্ডবোজেন হিসাব করে দেখেছেন, নীল তিমি একবার হাঁ করে খাবার গিলতে যে পরিমাণ শক্তি খরচ করে, ওই খাবার থেকে তার চেয়ে ২০০ গুণ বেশি শক্তি সে ফেরত পায়!

আরও পড়ুন

শুরু থেকেই কি তিমি এত বিশাল ছিল

জেনে অবাক হবে, নীল তিমির পূর্বপুরুষেরা কিন্তু মোটেও এমন বিশাল ছিল না। জীবাশ্ম বা ফসিল থেকে জানা যায়, প্রায় চার কোটি বছর আগে পাকিকেটাস নামে তিমির পূর্বপুরুষদের আকার ছিল নেকড়ের মতো এবং এরা ডাঙাতেই থাকত! এরপর যখন এরা পানিতে থাকতে শুরু করল, তখনো তাদের আকার খুব একটা বড় ছিল না।

তবে গল্পটা বদলে যায় আজ থেকে প্রায় ৩০ লাখ বছর আগে। তখন পৃথিবীতে বরফ যুগ চলছে। সাগরে বরফ জমতে শুরু করল এবং শক্তিশালী বাতাসের কারণে সমুদ্রের তলদেশ থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি ওপরে উঠে আসতে লাগল। এই পুষ্টি পেয়ে সমুদ্রের উপকূলগুলোয় খুদে ক্রিলের বিশাল বিশাল ঝাঁক তৈরি হলো। ক্রিলের এই বিশাল ঝাঁকই তিমিদের সহজে প্রচুর খাবার পাওয়ার সুযোগ করে দিল। আর পর্যাপ্ত খাবার পেয়ে পরিবর্তনের ধারায় তিমিরা ধীরে ধীরে আজকের এই বিশাল আকার ধারণ করল।

জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে তিমি মৃত্যুর হার বাড়ছে
ছবি: আর্থ ডট কম

এর চেয়েও বড় হওয়া কি সম্ভব?

বিজ্ঞানীদের মতে, নীল তিমি এখন এর আকৃতির একদম শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। এর চেয়ে বড় হওয়া এদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। কারণ, প্রাণী যত বড় হয়, তার হৃৎপিণ্ডকে শরীরের সব প্রান্তে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছে দিতে তত বেশি কষ্ট করতে হয়।

২০১৯ সালের এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি নীল তিমির হৃৎস্পন্দন মেপেছিলেন। তিমিরা পানির নিচে ডুব দিলে শ্বাস নিতে পারে না। তাই অক্সিজেন বাঁচানোর জন্য তারা তাদের হৃৎস্পন্দন কমিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গভীর পানিতে ডুব দেওয়ার সময় একটি নীল তিমির হৃৎপিণ্ড মিনিটে মাত্র দুইবার স্পন্দিত হয়! এটি শরীরকে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখার একেবারে শেষ সীমা। এর চেয়ে বড় শরীর হলে সেই শরীরকে বাঁচিয়ে রাখার মতো রক্ত পাম্প করা হৃৎপিণ্ডের পক্ষে সম্ভব হবে না। তা ছাড়া আরও বড় শরীর চালানোর জন্য যে পরিমাণ খাবার দরকার, তা-ও হয়তো সমুদ্রে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স
আরও পড়ুন