জীবনের কোন পর্যায়ে মানুষ সবচেয়ে দ্রুত লম্বা হয়
কখনো কি এমন হয়েছে, সেপ্টেম্বরে কেনা নতুন জিনস প্যান্টটা ডিসেম্বরেই ছোট হয়ে গেছে? প্যান্টটা একই আছে, কিন্তু হঠাৎ করেই যেন তোমার পা লম্বা হয়ে গেছে। বয়ঃসন্ধিকালের এই হঠাৎ লম্বা হয়ে যাওয়া সত্যিই অবাক করার মতো। এই সময়ে অনেক কিশোর-কিশোরী এক বছরেই প্রায় ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়ে যায়। কিন্তু শরীরের এই যে রকেটের গতিতে বেড়ে ওঠা, এটাই কি মানুষের দ্রুততম বৃদ্ধির সময়? বিজ্ঞানীরা কিন্তু বলছেন অন্য কথা। আমাদের জীবনের এমন এক পর্যায় আছে, যখন আমরা এর চেয়েও অনেক বেশি গতিতে লম্বা হই, যা আমরা সচরাচর খেয়াল করি না।
বয়ঃসন্ধিকালের হঠাৎ লম্বা হওয়া দেখে আমাদের মনে হতে পারে, এটাই বুঝি মানুষের দ্রুততম বৃদ্ধির সময়। কিশোর বয়সে আমরা হুটহাট লম্বা হয়ে যাই ঠিকই। কিন্তু জানলে অবাক হবে, বেড়ে ওঠার এই গতি আমাদের জীবনের দ্রুততম সময় নয়, বরং দ্বিতীয়।
যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শন কামিং জানান, জন্মের পর প্রথম দুই বছরই হলো মানুষের সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠার সময়। শৈশব থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত মানুষের বৃদ্ধির গতি মেপে দেখা গেছে, এই শুরুর সময়টাই সবচেয়ে দ্রুত। সহজ করে বললে, বর্তমানে তোমার উচ্চতা যে গতিতে বাড়ছে, তুমি যখন একদম ছোট ছিলে তখনকার গতির কাছে তা কিছুই না।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে দ্রুত বাড়ার সময়টি হলো তার প্রথম জন্মদিন পর্যন্ত। একটি শিশু জন্মের পর প্রথম এক বছরেই প্রায় এক ফুট লম্বা হয়ে যায়। বৃদ্ধির এই হার বয়ঃসন্ধিকালের গতির চেয়েও দ্বিগুণের বেশি। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাডাম ব্যাক্সটার-জোনস একটি মজার তথ্য দিয়েছেন। মেয়েরা মাত্র ১৮ মাস বয়সেই তাদের প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থার মোট উচ্চতার অর্ধেক হয়ে যায়। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এই উচ্চতায় পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ২৪ মাস।
এরপর শৈশবের শেষ দিকে লম্বা হওয়ার গতি কিছুটা কমে আসে। চার বছর বয়স থেকে বয়ঃসন্ধির শুরু পর্যন্ত বৃদ্ধির হার কমে বছরে প্রায় ২ থেকে ২ দশমিক ৫ ইঞ্চিতে দাঁড়ায়। এর পরেই শুরু হয় মানুষের বেড়ে ওঠার দ্বিতীয় দ্রুততম পর্যায় বা বয়ঃসন্ধিকাল। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে গড়ে মেয়েরা বছরে ৩ দশমিক ৫ ইঞ্চি এবং ছেলেরা ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
তবে এই হিসাবগুলো কেবলই একটা গড় ধারণা। আমাদের শরীর সব সময় সমান গতিতে বাড়ে না। মাঝে মাঝে শরীরের ভেতরে হরমোন এমনভাবে কাজ করে যে হুট করে বৃদ্ধির গতি বছরে প্রায় ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যদিও পরে শরীর আবার নিজের মতো করে গতি কমিয়ে সবটুকু মানিয়ে নেয়।
শৈশবের মতো বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। সাধারণত মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে একটু আগেভাগে লম্বা হতে শুরু করে। প্রায় ১১ বছর বয়স থেকেই তাদের উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে ছেলেরা সাধারণত এর দুই বছর পর লম্বা হতে শুরু করে। তবে দেরিতে শুরু করলেও ছেলেদের লম্বা হওয়ার গতি কিন্তু অনেক সময় বেশি হয়। এর কারণ হলো তাদের শরীরে থাকা গ্রোথ হরমোন ও টেস্টোস্টেরন, যা হাড়ের দৈর্ঘ্য বাড়াতে কাজ করে।
মেয়েদের এই দ্রুত বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া সাধারণত ১৬ বছর বয়সের দিকে থেমে যায়। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে তা চলে প্রায় ১৮ বছর পর্যন্ত। ছেলেরা গড়ে মেয়েদের চেয়ে বেশি লম্বা হওয়ার পেছনে দুটি মূল কারণ কাজ করে। এক হচ্ছে তাদের বৃদ্ধির তীব্রতা বেশি। আর দ্বিতীয়ত তারা মেয়েদের চেয়ে প্রায় দুই বছর বেশি সময় ধরে বাড়তে থাকে।
তবে বয়ঃসন্ধি বা লম্বা হওয়া একটু আগে বা পরে শুরু হলে চিন্তার কিছু নেই। কারও বৃদ্ধি আগে শুরু হওয়া মানেই যে সে অনেক বেশি লম্বা হবে, তা কিন্তু নয়। যার বয়ঃসন্ধি আগে শুরু হয়, তার উচ্চতা বাড়াও আগে থেমে যায়। অন্যদিকে যার একটু দেরিতে শুরু হয়, সে বেড়ে ওঠার জন্য হাতে অনেকটা বাড়তি সময় পায়। শেষ পর্যন্ত কার উচ্চতা কত হবে তা শরীরের জিনগত গঠনের ওপরও নির্ভর করে।
আমাদের শরীরের বেড়ে ওঠা কিন্তু সব জায়গায় একসঙ্গে শুরু হয় না। এটি বাইরের দিক থেকে ভেতরের দিকে ঘটে। বয়ঃসন্ধিতে প্রথমে আমাদের হাত ও পা লম্বা হতে শুরু করে। হাত পা বড় হয়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে আগের জামা প্যান্ট ছোট হয়ে যায়। এরপর শরীরের মাঝখানের অংশ বাড়ে সবার শেষে।
এই অদ্ভুতভাবে বেড়ে ওঠার কিন্তু কিছু সুবিধাও আছে। যাদের বৃদ্ধি আগে শুরু হয়, তারা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে বলে ফুটবল বা অ্যাথলেটিকসের মতো খেলায় এগিয়ে থাকে। তবে দ্রুত বেড়ে ওঠার একটা নেতিবাচক দিকও আছে। এই সময়ে আমাদের হাড়গুলো বেশ নরম থাকে। হাড় লম্বা হওয়ার পর তাতে খনিজ পদার্থ জমে শক্ত হতে প্রায় নয় মাস সময় লাগে। ঠিক এই কারণেই কিশোর বয়সে হাড় ভাঙার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।