জিরাফের পা এত লম্বা কেন

আফ্রিকান জিরাফছবি: এআই দিয়ে তৈরি

জিরাফকে দেখলে প্রথমেই হয়তো মাথায় আসে, বেচারার গলাটা এত লম্বা কেন? উত্তরটা আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি। আফ্রিকার উঁচু উঁচু একাশিয়াগাছের মগডালের কচি পাতাগুলো যাতে সহজে পেড়ে খেতে পারে, সে জন্যই প্রকৃতি তাকে এমন লম্বা গলা দিয়েছে। ছোটখাটো হরিণ বা জেব্রারা যখন নিচের ঘাস নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, জিরাফ তখন রাজার হালে ওপরের খাবার সাবাড় করে একা।

কিন্তু জিরাফের পা দুটি কেন এত লম্বা, তা কি একটু ভেবে দেখেছ? এটা কি শুধু গাছের মগডালের পাতা খাওয়ার জন্য? মোটেও না। বিজ্ঞান বলছে, এই লম্বা পায়ের পেছনে লুকিয়ে আছে এক জীবন-মরণ রহস্য, যা সরাসরি জিরাফের হার্ট বা হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

ভাবো তো, জিরাফের হার্টকে অভিকর্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করে রক্ত পাম্প করতে হয় এবং সেই রক্ত দোতলা সমান উঁচুতে থাকা মাথায় পাঠাতে হয়! কাজটা কিন্তু মোটেও সহজ নয়। নিজেরাই একটু চেষ্টা করে দেখো না! না, না রক্ত পাঠাতে বলছি না। সামান্য ড্রাম থেকে পাইপের সাহায্যে পানি ৫ মিটার ওপরের পাঠিয়ে দেখো না, কেমন ঝক্কির কাজ! বলা যতটা সহজ, কাজটা করা তত সহজ নয়। এ কথা জিরাফের জন্যও একই। জিরাফের পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রায় দোতলা দালানের সমান। তাই এদের হার্ট হতে হয় প্রচণ্ড শক্তিশালী। একটা পূর্ণবয়স্ক জিরাফের রক্তচাপ ২০০-এর ওপরে থাকে, যা মানুষের প্রায় দ্বিগুণ!

আরও পড়ুন

জিরাফ যখন বিশ্রাম নেয়, তখনো এর হার্টকে যে পরিমাণ খাটুনি খাটতে হয়, তা একই সাইজের অন্য যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক বেশি।

সম্প্রতি জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক অদ্ভুত পরীক্ষা চালিয়েছেন। তাঁরা কম্পিউটারে একটা কাল্পনিক প্রাণী তৈরি করলেন। নাম দিলেন ইলাফ।

এই ইলাফ দেখতে অনেকটা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের মতো। এর শরীরটা আফ্রিকার হরিণ বা ইল্যান্ডের হরিণের মতো। মানে খাটো পা। কিন্তু গলাটা জিরাফের মতো লম্বা। বিজ্ঞানীরা দেখতে চাইলেন, পা খাটো হলে জিরাফের কী সমস্যা হতো?

ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীরা অবাক! যদি জিরাফের পা খাটো হতো, তবে রক্ত পাম্প করে মাথায় পাঠাতে তার শরীরের মোট শক্তির ২১ শতাংশ শুধু হার্টের পেছনেই খরচ হয়ে যেত!

আরও পড়ুন

এখানেই জিরাফের লম্বা পায়ের জাদু। পা লম্বা হওয়ার কারণে জিরাফের হার্ট মাটি থেকে অনেক উঁচুতে থাকে। ফলে গলা পর্যন্ত রক্ত পাঠাতে দূরত্বটা কিছুটা কমে যায়। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, শুধু পা লম্বা হওয়ার কারণেই জিরাফ তার খাবারের শক্তির ৫ শতাংশ বাঁচিয়ে ফেলে।

মনে হচ্ছে মাত্র ৫ শতাংশ আর এমন কী? আফ্রিকার মতো জায়গায় এই ৫ শতাংশ মানে বছরে প্রায় দেড় টন বাড়তি খাবার! জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

প্রাণিবিদ গ্রাহাম মিচেল তাঁর বইয়ে লিখেছেন, পরিবর্তনের ধারায় জিরাফের পূর্বপুরুষদের আগে পা লম্বা হয়েছে, তারপর গলা। এটা খুবই যৌক্তিক। কারণ, পা লম্বা হওয়ার পরই হার্ট ওপরের দিকে রক্ত পাঠানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।

লম্বা পায়ের সুবিধা যেমন আছে, অসুবিধাও কম নয়। জিরাফকে কখনো পানি খেতে দেখেছ? বেচারাকে সামনের দুই পা অদ্ভুতভাবে দুই দিকে ছড়িয়ে নিচু হতে হয়। এই সময়টায় ওরা খুব অসহায় থাকে। সিংহ বা অন্য কোনো শিকারি চলে এলে চট করে উঠে দৌড় দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান বলে, পানি খেতে গিয়েই জিরাফ সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে।

আরও পড়ুন

তোমার মনে হতে পারে, ডাইনোসরদের গলা তো আরও লম্বা ছিল। জিরাফাটাইটান নামের ডাইনোসরের গলা ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ মিটার। তাহলে ওরা রক্ত পাম্প করত কীভাবে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, জুরাসিক পার্ক মুভিতে যা-ই দেখাক, বাস্তবে এই ডাইনোসররা কখনোই জিরাফের মতো মাথা খাড়া করে রাখতে পারত না। যদি করত, তবে রক্ত মাথায় পৌঁছাত না এবং ওরা অজ্ঞান হয়ে ধপাস করে পড়ে যেত! পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো প্রাণীই সম্ভবত জিরাফের চেয়ে বেশি উঁচুতে মাথা তুলে রাখতে পারেনি।

তাই চিড়িয়াখানায় গিয়ে জিরাফ দেখলে শুধু ওর লম্বা গলার প্রশংসা কোরো না, ওর পা দুটিকেও মনে মনে একটা প্রশংসা করতে পারো! পা দুটি না থাকলে বেচারা জিরাফ হার্ট অ্যাটাক করেই মরে যেত!

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

আরও পড়ুন