মিসরের চেয়ে দ্বিগুণ পিরামিড আছে যে দেশে

মিসরের পিরামিডফাইল ছবি: রয়টার্স

পিরামিড শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে যেন বিশাল ধূসর মরুভূমি, মমির রহস্যময় গল্প ও ফারাওদের দেশ মিসরের ছবি ভেসে ওঠে। আমাদের সবারই ধারণা, পিরামিডের দেশ মানেই বুঝি মিসর। কিন্তু সত্যিটা জানলে তুমি রীতিমতো চমকে যাবে! পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পিরামিড মিসরে নয়; বরং সুদানে অবস্থিত!

আর এই সংখ্যার ব্যবধানটাও কিন্তু খুব কম নয়। মিসরে যেখানে ১০০ থেকে ১৩৮টির মতো পিরামিড আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানে সুদানে পাওয়া গেছে প্রায় ২৫৫টি। অর্থাৎ মিসরের দ্বিগুণের বেশি! সুদানের এই অজানা পিরামিডগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে কুশ সাম্রাজ্য বা প্রাচীন নুবিয়ান সভ্যতার এক দারুণ ইতিহাস। চলো, আজ সেই ইতিহাসের পাতাতেই একটু ঢুঁ মারা যাক।

কারা বানিয়েছিল এই পিরামিড

মিসরের পিরামিডগুলো যেমন সেখানকার ফারাওরা বানিয়েছিলেন, সুদানের পিরামিডগুলো বানিয়েছিলেন প্রাচীন কুশ সাম্রাজ্যের রাজা ও রানিরা। এই সাম্রাজ্যকে বলা হতো নুবিয়ান সভ্যতা। ইতিহাসবিদদের মতে, ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই কুশ সাম্রাজ্য দাপটের সঙ্গে নীল নদের অববাহিকায় রাজত্ব করেছিল। এই সাম্রাজ্যের রাজারা এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে তাঁরা একসময় মিসরও দখল করে নিয়েছিলেন। শুধু দখলই করেননি, প্রায় ১০০ বছর রাজত্ব করেছিলেন! ইতিহাসে তাঁদের কালো ফারাও বলা হয়।

আরও পড়ুন

মজার ব্যাপার হলো, মিসরীয়রা যখন পিরামিড বানানো প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল, তারও প্রায় ৫০০ বছর পর কুশ সাম্রাজ্যের রাজারা নতুন করে পিরামিড বানানো শুরু করেন। প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতি দিয়ে তাঁরা বেশ প্রভাবিত ছিলেন। তাই মৃত রাজা–রানিদের সম্মান জানাতে ও পরকালের জন্য তাঁদের মৃতদেহ বা মমি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই তাঁরা এই পিরামিডগুলো বানিয়েছিলেন।

দূর থেকে দেখা পিরামিড
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

মিসরের চেয়ে আলাদা কোথায়

সংখ্যায় বেশি হলেও সুদানের পিরামিডগুলো কিন্তু মিসরের গিজার বিখ্যাত পিরামিডগুলোর মতো অতটা বিশাল নয়। মিসরের বড় পিরামিডগুলো যেখানে প্রায় ৪৫৩ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতো, সেখানে সুদানের পিরামিডগুলোর উচ্চতা বড়জোর ২০ থেকে ৯৮ ফুটের মধ্যে।

তবে আকারে ছোট হলেও সুদানের পিরামিডগুলোর গঠন বেশ আলাদা এবং অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এগুলো মিসরের পিরামিডের চেয়ে অনেক বেশি খাড়া। ইতিহাসবিদেরা বলেন, এগুলো বানানোর সময় শাদুফ নামে একধরনের কাঠের ক্রেন ব্যবহার করা হতো। শাদুফ হলো একধরনের পানি তোলার যন্ত্র। পিরামিডের ভিত খুব সরু হওয়ায় এগুলো এত খাড়াভাবে বানানো সম্ভব হয়েছিল।

আরও পড়ুন

আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, মিসরের পিরামিডের ভেতরেই গুপ্তকক্ষ বা সমাধিকক্ষ থাকত। সেখানেই রাখা হতো মমি। কিন্তু সুদানের পিরামিডগুলোর ভেতরটা ফাঁকা থাকত না; বরং পুরোটাই মাটি ও পাথরের টুকরা দিয়ে ঠাসা থাকত! আসল সমাধিকক্ষটি থাকত পিরামিডের ঠিক নিচে, মাটির অনেক গভীরে। সেখানে যাওয়ার জন্য মাটির নিচ দিয়ে লুকানো সিঁড়ি তৈরি করা হতো।

শুধু কুশ সাম্রাজ্যের রাজারাই নন, এই সভ্যতার রানিরাও ছিলেন অত্যন্ত পরাক্রমশালী। ইতিহাসে এই রানিদের কান্ডাকে বা ক্যান্ডেস বলা হতো। এই সাহসী রানির দল একসময় প্রতাপশালী রোমান সাম্রাজ্যের আক্রমণের বিরুদ্ধেও নিজেদের রাজ্যকে সাহসের সঙ্গে রক্ষা করেছিলেন। সুদানের পিরামিডগুলোর নিচে শুধু রাজাদেরই নয়, এই বীর রানিদের সমাধিও অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছিল। তাঁদের সমাধিকক্ষে সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জের তৈরি নানা রকম অলংকার ও তৈজস দেওয়া হতো, যাতে তাঁরা পরকালেও রানির মতোই জীবন কাটাতে পারেন।

চোলুলার গ্রেট পিরামিড
ছবি: এক্সপিডিয়া

পিরামিডের এক অজানা রাজধানী

সুদানের বেশির ভাগ পিরামিডই একসঙ্গে একটি জায়গায় পাওয়া যায়। সেই জায়গাটির নাম মেরোউ। এটি ছিল প্রাচীন কুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী। এটি এমন এক জাদুকরি জায়গা, যেখানে গেলে তুমি লালচে বেলেপাথরের বুকে একসঙ্গে প্রায় ২০০ পিরামিড মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে! মরুভূমির খাঁ খাঁ রোদে এই দৃশ্য যে কতটা অদ্ভুত সুন্দর, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এই অসাধারণ ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই ২০১১ সালে ইউনেসকো এই মেরোউ শহরটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বা বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে।

আরও পড়ুন

গুপ্তধন শিকারিদের নির্মম হামলা

সুদানের পিরামিডগুলোর ছবি দেখলে একটা জিনিস তোমার চোখে পড়বেই, অনেকগুলো পিরামিডের ওপরের অংশ বা চূড়া একদম ভাঙা! এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক করুণ ইতিহাস। ১৮৩০–এর দশকে গিউসেপে ফেরলিনি নামের এক ইতালিয়ান গুপ্তধন শিকারি সুদানে এসেছিলেন। পিরামিডের ভেতরে নিশ্চয়ই সোনাদানা ও বিশাল গুপ্তধন লুকিয়ে আছে, এমন লোভে তিনি ডিনামাইট দিয়ে প্রায় ৪০টি পিরামিডের চূড়া গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন! যদিও সেখানে খুব বেশি গুপ্তধন তিনি পাননি, কিন্তু প্রাচীন সভ্যতার এই অমূল্য নিদর্শনগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি করে গিয়েছিলেন তিনি।

বিশ্বের প্রথম পিরামিড ‘দ্য স্টেপ পিরামিড অব জোসার’
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

কেন সুদানের পিরামিড এত অবহেলিত

মিসরের পিরামিডগুলো দেখতে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক ভিড় জমান। তাহলে সুদানের পিরামিডগুলো এত দিন আড়ালে রয়ে গেল কেন? এর বড় কারণ, সুদানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ ও যোগাযোগব্যবস্থার অভাব। তা ছাড়া দুর্গম মরুভূমির মধ্যে এই পিরামিডগুলো থাকায় সেখানে যাওয়া পর্যটকদের জন্য বেশ কঠিন ও বিপজ্জনক ছিল।

তবে এখন আগের চেয়ে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলাচ্ছে। অনেক রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ এখন মিসরের পাশাপাশি সুদানের এই কালো ফারাওদের জাদুকরি রাজত্ব দেখতে ছুটে যাচ্ছেন।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি
আরও পড়ুন