১১ বছর বয়সে জাদুঘরের দায়িত্ব নিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম

অ্যান্ডারসন টেলরের বর্তমান বয়স ১১ বছর

৯ বছরের কোনো শিশুর ডাইনোসর পছন্দ হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে এত ছোট বয়সে জীবাশ্ম আর প্রাকৃতিক ইতিহাস নিয়ে নিজের জাদুঘর বানিয়ে ফেলা সত্যি বিরল ঘটনা।

অ্যান্ডারসন টেলরের বর্তমান বয়স ১১ বছর। সম্প্রতি সে একটি জাদুঘরের সর্বকনিষ্ঠ পুরুষ কিউরেটর হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট সে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের কেমব্রিজে ‘কেমব্রিজ ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম’ তৈরি করেছে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর ৩৪০ দিন।

অ্যান্ডারসন অনেক আগে থেকে এই জাদুঘরের স্বপ্ন দেখে আসছিল। এক সাক্ষাৎকারে সে বলেছে, ‘আমার বয়স যখন মাত্র ৩ বছর, তখন আমি টিভিতে ডাইনোসরের একটি অনুষ্ঠান দেখি। এরপর নিজেই কিছু জীবাশ্ম খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিই। তখন ঘরের বাইরের রাস্তায় চলে যাই।’

কাকতালীয়ভাবে সে বাড়ির উঠানেই একটি প্রাচীন জীবাশ্ম পেয়ে যায়। সেই একটি আবিষ্কারই তার মনে প্রাচীন ইতিহাস জানার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।

আরও পড়ুন

এর পর থেকে সে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জীবাশ্ম সংগ্রহ করতে শুরু করে। এর কিছু ছিল নিজের কেমব্রিজ এলাকার, আর কিছু ছিল পরিবারের সঙ্গে স্কটল্যান্ড ভ্রমণের সময়ের। স্কটল্যান্ডের এক ছোট জাদুঘর তাকে নিজের জাদুঘর বানাতে অনুপ্রাণিত করে। এমনকি স্কুলেও বন্ধুদের নিয়ে খেলার মাঠের নুড়িপাথর খুঁড়ে বহু মূল্যবান জিনিস খুঁজে বের করত সে।

সাত বছর বয়সেই অ্যান্ডারসন টেলর তার কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখার কথা ভাবে। একই সঙ্গে অন্যদের প্রাকৃতিক বিশ্ব সম্পর্কে জানানোর জন্য একটি জাদুঘর বানানোর পরিকল্পনা করে। সে বিভিন্ন জায়গায় তার ইচ্ছার কথা জানাতে থাকে। এতে শহর থেকে কিছু অনুদান পায়। পরে একটি ‘গো ফান্ড মি’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সে ও তার পরিবার একটি নতুন ভবন কেনে।

অ্যান্ডারসন টেলর বলে, ‘ভবিষ্যতে আমরা আমাদের ভবনটি আরও বড় করতে চাই। নতুন একটি অংশ তৈরির পরিকল্পনাও আছে। পরিকল্পনা অবশ্য সব সময়ই বদলায়। তাই নতুন পরিস্থিতি এলে আমাদের অন্য উপায় খুঁজে বের করতে হবে।’

কেমব্রিজের ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই জাদুঘর এখন শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ এখানে এসে বিভিন্ন প্রাচীন জিনিস দান করছেন। পাশাপাশি প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী জাদুঘরটি দেখতে আসছেন।

আরও পড়ুন
সম্প্রতি সে একটি জাদুঘরের সর্বকনিষ্ঠ পুরুষ কিউরেটর হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছে

জাদুঘরের সংগ্রহ সম্পর্কে অ্যান্ডারসন টেলর জানায়, ‘আমাদের এখানে প্রচুর জীবাশ্ম, চমৎকার সব খনিজ, আমেরিকার প্রাচীন অধিবাসীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও প্রক্রিয়াজাত করে রাখা কিছু প্রাণীর দেহাবশেষ রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৩টি প্রদর্শনী চালু আছে। আমরা প্রতিনিয়ত নতুন জিনিস যুক্ত করছি।’

অ্যান্ডারসন টেলর আরও বলে, ‘কখনো কখনো কোনো বিশেষ বস্তুর পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল গল্পটি জানতে পারাটাই সবচেয়ে রোমাঞ্চকর।’

বর্তমানে এই জাদুঘরে প্রায় ১ হাজারটি জীবাশ্ম রয়েছে। এর মধ্যে টেলরের সবচেয়ে পছন্দের জিনিস হলো প্রাগ্রৈতিহাসিক ম্যাসটোডন প্রাণীর পায়ের হাড় ও বিশেষ একধরনের চকচকে ডাইনোসরের হাড়। তবে দর্শনার্থীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস হলো ‘টুলিমনস্ট্রাম’ (Tullimonstrum) নামক এক অদ্ভুত প্রাণীর জীবাশ্ম। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় রাজ্যের বিশেষ এই বিরল জীবাশ্মের তিনটি নমুনা টেলরের জাদুঘরে সযত্নে রাখা আছে।

আরও পড়ুন

কেমব্রিজ ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম তৈরির আগে ইলিনয়ের মাত্র দুই হাজার মানুষের এই ছোট্ট শহরে সাধারণ কিছু ঐতিহাসিক জায়গা ছিল। সেখানে একটি খেলনার জাদুঘর থাকলেও তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অ্যান্ডারসন টেলর যে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে, তেমন কিছু আগে এই শহরে ছিল না।

অ্যান্ডারসন শুধু জাদুঘরের কাজই করে না, সে আশপাশের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে বিজ্ঞানবিষয়ক তথ্য উপস্থাপনও করে। অ্যান্ডারসনদের প্রতিবেশী করিনা স্প্রাং জানান, তিনি নিয়মিত এই জাদুঘর দেখতে আসেন। বিজ্ঞানের প্রতি অ্যান্ডারসনের এই ভালোবাসা সবাইকে ছুঁয়ে গেছে। মানুষের সামনে সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলার ক্ষমতা তার অসাধারণ। এত কম বয়সেই সে সবাইকে নতুন বিষয় শেখাতে ভীষণ পছন্দ করে। তার দেখে মনে হয়, এই জাদুঘর যেন কেবল একটা ভবনের ভেতর আটকে নেই, এর প্রভাব আরও অনেক বড়।

অ্যান্ডারসনের বাবা জনের সহকর্মী লোগান মেয়ার বলেন, ‘আমাদের এই ছোট শহরের জন্য অ্যান্ডারসন দারুণ একটি কাজ করেছে। মানুষ এমন একটি সুন্দর জায়গার জন্যই অপেক্ষা করছিল, যেখানে তারা বাচ্চাদের নিয়ে একটু ঘুরতে পারবে ও নতুন নতুন তথ্য শিখতে পারবে।’

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস
আরও পড়ুন