ক্লাউডবার্স্ট কী, এই বিরল আবহাওয়ার ঘটনাটি কতটা বিপজ্জনক

আগের চেয়ে এখন কেন ঘন ঘন মেঘ বিস্ফোরণ বা অতিবৃষ্টির খবর পাওয়া যাচ্ছে

এক বালতি পানি মাথায় ঢেলে দিলে যেমন লাগে, আকাশ থেকে যদি ঠিক সেভাবেই পানি পড়তে শুরু করে, তবে কেমন হবে? সম্প্রতি ফেনীতে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। গত ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার সকালে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ফেনী শহর ডুবে যায়। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, মাত্র ৬০ মিনিটে সেখানে ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার এ ঘটনাটি আসলে কী, কেন হয়?

মেঘ বিস্ফোরণ কী

আমরা সাধারণত ঝিরঝিরে বৃষ্টি বা মুষলধারে বৃষ্টির কথা শুনি। কিন্তু মেঘ বিস্ফোরণ এগুলো থেকে বহুগুণ শক্তিশালী। মেঘ বিস্ফোরণ বা ‘ক্লাউডবার্স্ট’ হলো হঠাৎ খুব ছোট এলাকার ওপর অল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টি হওয়া। পাহাড়ের পাদদেশে বা উপত্যকায় যখন এ ঘটনা ঘটে, তখন তা ভয়ংকর বন্যা ও ভূমিধস হয়ে ওঠে।

পাহাড়ি অঞ্চলে কেন এটি বেশি ঘটে, তার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। আর্দ্রতা ভরা মৌসুমি বায়ু যখন বিশাল পাহাড়ের গায়ে বাধা পায়, তখন সেটি দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে। ওপরে গিয়ে বাতাস দ্রুত শীতল হয়ে ঘন মেঘ তৈরি করে। পাহাড়ের গঠন এমন হয় যে এই মেঘগুলো অনেক সময় চারপাশ থেকে আটকা পড়ে যায় এবং হঠাৎ প্রবল জলস্রোত হয়ে নিচে নেমে আসে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, যদি এক ঘণ্টায় অন্তত ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়, তবেই তাকে মেঘ বিস্ফোরণ বা ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বৃষ্টি বলা হয়।

আরও পড়ুন

হিমালয় বা হিন্দুকুশের মতো খাড়া পাহাড়ের ঢালগুলোয় এই বৃষ্টির পানি যখন নিচের দিকে নামে, তখন তা বিশাল পাথর ও কাদা সঙ্গে নিয়ে ধ্বংসাত্মক স্রোতে পরিণত হয়। ২০১৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া এলাকায় এমন এক মেঘ বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যার ফলে ঘরবাড়ি কাদামাটির নিচে ডুবে গিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সেই সময় পানির তোড়ে পাহাড় থেকে নেমে আসা বিশাল সব পাথরের আঘাতে মাটি ভূমিকম্পের মতো কাঁপতে শুরু করেছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ ধরনের চরম আবহাওয়া এখন আগের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যাপ্ত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র না থাকায় তথ্য সংগ্রহ করাও অনেক সময় সম্ভব হয় না
সিএনএন

মেঘ বিস্ফোরণ কেন এত ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী

মেঘ বিস্ফোরণ বা ক্লাউডবার্স্ট কেন সাধারণ বৃষ্টির চেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক, এর প্রধান কারণ হলো এর অনিশ্চয়তা। এই ঝড়গুলো এতই ছোট এলাকায় ও এত দ্রুত ঘটে যে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও আগেভাগে এর সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যাপ্ত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র না থাকায় তথ্য সংগ্রহ করাও অনেক সময় সম্ভব হয় না।

তবে কেবল প্রকৃতিই এর জন্য দায়ী নয়। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত সমস্যার চেয়ে বড় বাধা হলো সঠিক সময়ে মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া। পাহাড়ি এলাকাগুলোয় উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও আগাম সতর্কবার্তার অভাব থাকায় সাধারণ মানুষ প্রস্তুতির সুযোগ পায় না। তার ওপর নদী বা জলাশয়ের একদম কাছে অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করায় বিপদের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যাপক বন উজাড়। পাহাড়ের গাছপালা যখন কেটে ফেলা হয়, তখন মাটির শক্তি কমে যায়। ফলে মেঘ বিস্ফোরণ বৃষ্টি শুরু হলেই পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে ও স্রোতের সঙ্গে বিশাল বিশাল পাথর ও গাছপালা ভাসিয়ে নিয়ে আসে। এই কাদা ও পাথরের তোড় এতটাই শক্তিশালী হয়, যা চোখের পলকে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিতে পারে। একে তো মেঘ বিস্ফোরণের পানি আসার সময় খুব কম থাকে, তার ওপর এই কাদা ও পাথরের স্রোত জীবন বাঁচানোকে আরও অসম্ভব করে তোলে।

আরও পড়ুন

মেঘ বিস্ফোরণ কেন বাড়ছে

আগের চেয়ে এখন কেন ঘন ঘন মেঘ বিস্ফোরণ বা অতিবৃষ্টির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো বিশ্বের তাপমাত্রা রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যাওয়া। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাতাস যত উষ্ণ হয়, তা ঠিক স্পঞ্জের মতো আরও বেশি জলীয় বাষ্প শুষে নিতে পারে। নিয়ম হলো, বাতাসের তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে তা ৭ শতাংশ বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতা নিয়েই বাতাস যখন পাহাড়ের ঢালে বাধা পায়, তখন তা এক জায়গায় বিশাল পরিমাণ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে।

আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, যদি এক ঘণ্টায় অন্তত ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়, তবেই তাকে মেঘ বিস্ফোরণ বা ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বৃষ্টি বলা হয়

ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর আগের চেয়ে দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ফলে সেখান থেকে আসা মৌসুমি বায়ু এখন অনেক বেশি জলীয় বাষ্প বয়ে আনছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়, বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা গেছে, তা–ই আসলে এই অতিবৃষ্টির কারণ। যত প্রচণ্ড গরম পড়বে, বাতাস তত বেশি আর্দ্রতা জমাবে ও পরবর্তী সময়ে বৃষ্টির ধরন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে।

বিশ্বকে উত্তপ্ত করার জন্য দায়ী গ্যাসগুলোর মাত্র ১ শতাংশের কম নির্গত হয় আমাদের এসব অঞ্চল থেকে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকেই রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। বর্ষাকালের ধরনটাই এখন পাল্টে গেছে। এখন দীর্ঘ সময় কোনো বৃষ্টি থাকে না, আবার যখন নামে, তখন অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টি হয় যে তা সামলানো কঠিন।

শিল্পায়নের পর থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এখন পর্যন্ত মাত্র ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এই সামান্য তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও বাংলাদেশে বন্যায় যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি আমরা দেখছি, তা আসলে এক অশনিসংকেত। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর হার না কমলে এই শতাব্দীর শেষে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ৩ ডিগ্রিতে পৌঁছে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন, তাপমাত্রা যত বাড়বে, প্রকৃতির এই ধ্বংসাত্মক রূপ ততই ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন
আরও পড়ুন