আমরা কেন বাঁ থেকে ডানে লিখি

অনেক শিশু নিজেদের মতো করে সাজিয়ে এনেছেন বাংলা বর্ণ। তাই দেখছে এক শিশু। ছবি: সাইফুল ইসলাম

পরীক্ষার হলে তাড়াহুড়া করে লিখতে গিয়ে কি কখনো হাতের তালুতে কালির দাগ লাগিয়েছ? জেল পেন বা ফাউন্টেন পেনের কালি শুকানোর আগেই হাত ঘষে পুরো খাতা লেপটে যাওয়ার সেই বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। এখন যদি বলি, তোমার হাতের তালুর ওই একঘেয়ে কালির দাগের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বাংলা ও আরবি লেখার দিক আলাদা হওয়ার সবচেয়ে বড় রহস্য?

হ্যাঁ, ঠিকই বলছি! তুমি যখন বাংলা বা ইংরেজি লেখো, তোমার কলম চলে খাতার বাঁ দিক থেকে ডানে। কিন্তু তোমার যে বন্ধুটি আরবি বা ফারসি শেখে, তার কলম ছোটে ঠিক উল্টো দিকে; মানে ডান থেকে বাঁয়ে! হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে, ব্যাপার কী? ভাষাগুলো কি ইচ্ছা করেই ট্রাফিক নিয়ম ভাঙার মতো উল্টো পথে চলে? নাকি ডানহাতি ও বাঁহাতিদের কোনো গোপন মারপ্যাঁচ আছে এর ভেতর?

খাতা উল্টো করে ধরে মাথা চুলকানোর কিছু নেই। ভাষাগুলো মোটেও নিয়ম ভাঙেনি, বরং মেনে চলেছে হাজার বছর পুরোনো এক দারুণ বিজ্ঞান ও প্রাচীন কারিগরদের প্রযুক্তি। চলো, আজ খাতা-কলম দূরে সরিয়ে সেই রহস্যের জট খুলি।

আরও পড়ুন
পাথরে খোদাই করা লেখাটি লেখা হয়েছিল আড়াই হাজার বছর আগে
অ্যাবেরিস্টউইথ ইউনিভার্সিটি

হাতুড়ি আর ছেনির যুগ

কাগজ ও কলমের বয়স তো এই সেদিনের। প্রাচীন যুগে মানুষ তাদের মনের ভাব প্রকাশ করত পাথরের গায়ে খোদাই করে। মধ্যপ্রাচ্যের আরবি, ফারসি বা হিব্রুর মতো প্রাচীন লিপিগুলো মূলত পাথরের বুকেই জন্ম নিয়েছিল।

পাথরে খোদাই করার কাজটা কিন্তু মোটেও সোজা ছিল না। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই ডানহাতি। প্রাচীন আমলের একজন ডানহাতি কারিগর যখন পাথরে খোদাই করতেন, তখন তাঁর বাঁ হাতে থাকত ছেনি আর ডান হাতে ভারী হাতুড়ি।

বাঁ হাতে ছেনি ধরে ডান হাত দিয়ে হাতুড়ি পেটাতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ডান দিক থেকে বাঁ দিকে যাওয়াটা সবচেয়ে সুবিধাজনক। বাঁ দিক থেকে শুরু করলে কারিগরের বাঁ হাতই তার চোখের দৃষ্টি আটকে দিত। তা ছাড়া, হাতুড়ির ঘা ফস্কে বাঁ হাতে লাগার একটা ভয়ও কাজ করত। তাই ডান দিক থেকে বাঁ দিকে খোদাই করে যাওয়াই ছিল সে আমলের সবচেয়ে নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়। ফিনিশীয় বা আরামাইক লিপি থেকে শুরু করে আজকের আরবি লিপি সেই হাজার বছর আগের ঐতিহ্যটাই এখনো ধরে রেখেছে।

আরও পড়ুন

কালি লেপটে যাওয়ার ভয়

পাথর খোদাইয়ের যুগ পেরিয়ে মানুষ যখন আরও আধুনিক হলো, তখন এল প্যাপিরাস, গাছের পাতা, পশুর চামড়া আর কালির যুগ। আর এখানেই দেখা দিল নতুন এক বিপত্তি!

ডানহাতি কোনো মানুষ যখন কালিতে পালক বা কলম ডুবিয়ে ডান দিক থেকে বাঁ দিকে লিখতে যায়, তখন হাতের তালু ঘষে গিয়ে সদ্য লেখা কাঁচা কালি লেপটে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। তুমি নিজেই একবার ডান হাত দিয়ে ডান দিক থেকে বাঁ দিকে কালি দিয়ে লিখে দেখো, দেখবে হাতের ঘষায় পুরো খাতা নোংরা হয়ে গেছে!

এই কালি লেপটে যাওয়া ঠেকাতেই গ্রিক, লাতিন এবং আমাদের উপমহাদেশের লিপিগুলো নিজেদের দিক পরিবর্তন করে নিল। বাঁ দিক থেকে ডান দিকে লিখলে হাতের তালু সব সময় লেখার সামনের ফাঁকা জায়গায় থাকে। ফলে কালি শুকানোর জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায় এবং লেখা একদম পরিচ্ছন্ন থাকে।

আরও পড়ুন
বাঁ থেকে শ্রাবণ, নাহিয়ান, দিশা, ধ্রুব ও ইমামা। তাঁদের হাতের কাগজে স্প্যানিশ, জাপানি, রুশ, বাংলা ও কোরীয় ভাষায় লেখা আছে, ‘ভাষার জন্য ভালোবাসা’। ছবি: খালেদ সরকার

ষাঁড়ের হালচাষের সঙ্গে লেখার সম্পর্ক

জানলে অবাক হবে, প্রাচীন গ্রিকরা শুরুতে এক অদ্ভুত উপায়ে লিখত। তারা প্রথম লাইন বাঁ দিক থেকে ডান দিকে লিখে, দ্বিতীয় লাইন ঠিক তার নিচ থেকে আবার ডান দিক থেকে বাঁ দিকে লিখত! ফসলের মাঠে ষাঁড় যেভাবে একবার এদিকে গিয়ে আবার উল্টো দিকে ঘুরে হাল চাষ করে, ঠিক সেভাবে। এই পদ্ধতির নাম ছিল বউস্ট্রোফেডন। তবে পরে তারা পুরোপুরি বাঁ দিক থেকে ডানে লেখার নিয়মই পাকাপাকিভাবে গ্রহণ করে নেয়।

অন্যদিকে প্রাচীন চীনা বা জাপানি ভাষার দিকে তাকালে দেখবে, তারা আবার ওপর থেকে নিচে লেখে। কারণ, তারা বাঁশের কঞ্চির তুলি দিয়ে লিখত। তুলি সোজা করে ধরে ওপর থেকে নিচে লিখলে হাতের সঙ্গে কাগজের ঘষা লাগার কোনো ভয়ই থাকে না। আবার বাঁশ যেহেতু লম্বা, তাই তারা ওপর থেকে নিচের দিকে লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত।

এই হলো আমাদের নানা ভাষার ডান থেকে বাঁয়ে, বাঁ থেকে ডানে আবার ওপর থেকে নিচের দিকে লেখার রহস্য। আরবি বা বাংলা কোনোটাই ইচ্ছা করে উল্টো পথে লেখা শুরু করেনি। হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে অস্ত্র বা উপকরণ দিয়ে লিখতেন, সেই হাতিয়ারের সুবিধার্থেই ভাষার এই দিক ঠিক হয়েছিল। পাথরের কারিগরেরা দিয়েছেন আরবির ডান থেকে বাঁয়ের চল, আর কালির লেখকেরা দিয়েছেন বাংলার বাঁ থেকে ডানের নিয়ম।

সূত্র: সায়েন্স এবিসি ও ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি এনসাইক্লোপিডিয়া
আরও পড়ুন