গ্রহ কেন দ্রুত ছুটে চলে
কখনো কি নিজের ঘরে সোফায় চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে মনে হয়েছে, তুমি একদম স্থির হয়ে আছ? তোমার হয়তো মনে হতে পারে, তুমি কোথাও যাচ্ছ না, কিন্তু বিজ্ঞান বলছে একদম ভিন্ন কথা। তুমি এ মুহূর্তে এমন এক মহাজাগতিক রকেটে বসে আছ, যা প্রতি সেকেন্ডে অকল্পনীয় গতিতে মহাশূন্যের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে! আর সেই স্পেস রকেটটির নাম হলো পৃথিবী!
মহাশূন্যে আমাদের এই ছুটে চলার হিসাবটা শুনলে তোমার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। তুমি যদি একটি নির্দিষ্ট রেফারেন্স পয়েন্ট ধরে পৃথিবীর গতির হিসাব করো, তবে দেখবে, আমরা আসলে কয়েক স্তরে গতিশীল। পৃথিবী তার নিজের অক্ষের ওপর লাটিমের মতো ঘুরছে। দিন ও রাত কিন্তু এই ঘোরার কারণেই হয়। এই ঘূর্ণনের কারণে নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা অঞ্চলে পৃথিবীর গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ৬০৯ কিলোমিটার।
শুধু নিজের জায়গায় ঘুরলেই তো আর হবে না, পৃথিবীকে সূর্যের চারদিকেও চক্কর দিতে হয়। সূর্যের চারদিকে আমাদের গ্রহটি ঘণ্টায় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ২১৭ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছে! আমরা যে বছর গুনি, তা তো এই চক্কর দেওয়ার কারণেই হয়।
এখানেই শেষ নয়! আমাদের সূর্য এবং তার পুরো সৌরজগৎ একা বসে নেই। পুরো সৌরজগৎ আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এই ঘোরায় সৌরজগতের গতিবেগ হলো ঘণ্টায় প্রায় ৭ লাখ ৭৭ হাজার কিলোমিটার।
আরও এক ধরনের ঘূর্ণন আছে। আমাদের পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি তার প্রতিবেশী গ্যালাক্সিগুলোকে নিয়ে লোকাল গ্রুপের অংশ হিসেবে ভার্গো গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের দিকে ঘণ্টায় প্রায় ২০ লাখ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে চলেছে।
তাহলে বুঝতেই পারছ, গ্রহগুলো খুব গতিতে ছুটে চলছে। এখন প্রশ্ন হলো, মহাবিশ্বের এই গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর ইঞ্জিনে কে জ্বালানি দিচ্ছে? ওরা এত ভয়ংকর গতি পেল কোথা থেকে? বিজ্ঞানীদের মতে, মহাজাগতিক বস্তুগুলোর এই প্রচণ্ড গতির পেছনে মূলত দুটি বিষয় কাজ করে। একটি হলো মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া, অপরটি কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতা সূত্র।
বিষয়টা একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলি। আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে আমাদের সৌরজগৎ বলতে কিছুই ছিল না। মহাকাশে শুধুই ধুলা ও গ্যাসের বিশাল মেঘ ভাসছিল। ধীরে ধীরে মহাকর্ষ বলের কারণে এই মেঘ নিজের কেন্দ্রের দিকে গুটিয়ে আসতে শুরু করে।
বিজ্ঞানের কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতা সূত্র অনুযায়ী, কোনো ঘুরন্ত বস্তু যখন আকারে ছোট হয়ে আসতে থাকে, তখন তার ভরবেগ সমান রাখার জন্য ঘোরার গতি আপনা–আপনি বেড়ে যায়। তুমি হয়তো টিভিতে আইস স্কেটারদের ঘুরতে দেখেছ। তারা যখন বরফের ওপর দুই হাত ছড়িয়ে ঘোরে, তখন ঘোরার গতি একটু কম থাকে। কিন্তু যেই তারা হাত দুটো শরীরের কাছে গুটিয়ে আনে, অমনি তাদের ঘোরার গতি অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যায়!
সৌরজগতের জন্মের সময় ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছিল। বিশাল গ্যাসের মেঘটি যখন মহাকর্ষের টানে সংকুচিত হয়ে ছোট হতে লাগল, তখন তার ভরবেগ ধরে রাখার জন্য এর ঘোরার গতি প্রচণ্ডভাবে বেড়ে যায়। এই মেঘের একেবারে কেন্দ্রে জন্ম নেয় আমাদের সূর্য। আর চারপাশে যে গ্যাস ও ধুলার চাকতি প্রচণ্ড বেগে ঘুরছিল, তা থেকে ধীরে ধীরে জমাট বেঁধে তৈরি হয় পৃথিবীসহ অন্য গ্রহ, উপগ্রহ ও গ্রহাণুগুলো।
পৃথিবীতে তুমি যদি একটি বল গড়িয়ে দাও, সেটি মাটির ঘর্ষণে একসময় থেমে যায়। কিন্তু মহাকাশ হলো প্রায় সম্পূর্ণ বায়ুশূন্য একটি জায়গা। সেখানে কোনো বাতাস বা ঘর্ষণ বল নেই, যা গ্রহগুলোর এই আদিম গতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সৃষ্টির সেই আদিম গতির রেশ ধরে গ্রহগুলো আজও কোটি কোটি বছর ধরে একই রকম প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলেছে।
পৃথিবী বা সৌরজগতের ক্ষেত্রে যা সত্যি, আমাদের বিশাল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটিও যখন একটি অতিকায় ঘূর্ণমান গ্যাসের মেঘ থেকে সংকুচিত হয়ে তৈরি হয়েছিল, তখন এটিও অনেক দ্রুত ঘুরতে শুরু করে। আর সেই গ্যাসের মেঘের ভেতরে জন্ম নেওয়া কোটি কোটি তারা ও নক্ষত্র সেই আদিম উচ্চ ঘূর্ণনগতি আজও ধরে রেখেছে।
ভাবতে পারো, তাহলে সব গ্রহের গতি কি সমান? সূর্যের চারদিকে ঘোরার ক্ষেত্রে সব গ্রহের গতি সমান নয়। যে গ্রহ সূর্যের যত কাছে, তার ওপর সূর্যের মহাকর্ষ টান তত বেশি। ফলে তাকে তত বেশি বেগে ঘুরতে হয়, না হলে সে সূর্যের বুকেই আছড়ে পড়বে!
আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধ। গ্রহটি সেকেন্ডে প্রায় ৪৭ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার বা ঘণ্টায় প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার ৮২ মাইল বেগে ছুটে চলে। বুধ গ্রহ আমাদের পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ গুণ বেশি বেগে ঘোরে। অন্যদিকে সবচেয়ে দূরের গ্রহ নেপচুনের ওপর মহাকর্ষ টান অনেক কম হওয়ায় এটি সূর্যের চারপাশে মাত্র ৫ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ডে বা ঘণ্টায় ১২ হাজার ১৪৬ মাইল বেগে ঘোরে। এই গতি পৃথিবীর গতির মাত্র ১৮ শতাংশ।
তাহলে আমরা কেন সেই গতি টের পাচ্ছি না? আমরা ছিটকে পড়ে যাচ্ছি না কেন? কারণ, আমরা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং পৃথিবীর সব বস্তু একসঙ্গে একই গতিতে ঘুরছি। ঠিক যেমন একটি দ্রুতগামী বিমানের ভেতরে বসে থাকলে তোমার মনে হয় না যে বিমানটি উড়ছে, পৃথিবীর ক্ষেত্রেও ঠিক একই ব্যাপার ঘটে।
তাই তুমি আসলে কখনোই চুপচাপ বসে থাকো না। যখন তুমি একা বসে অলস সময় কাটাচ্ছ, তখন কিন্তু পৃথিবীসহ সবকিছু লাখ লাখ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছে!