কিছু মাছ স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটে কেন
নদীতে যারা নৌকা চালিয়েছ বা সাঁতার কেটেছ, তারা নিশ্চয়ই জানো স্রোতের অনুকূলে চলা কত সহজ। নৌকার পাল তুলে দিলে কিংবা হাত-পা একটু নাড়ালেই স্রোত তোমাকে অনায়াসেই টেনে নিয়ে যাবে। কিন্তু সমস্যা বাধে যখন স্রোতের উল্টো দিকে যেতে হয়। তখন দাঁড় টানতে যেমন কষ্ট হয়, তেমনি সাঁতার কাটতেও লাগে দ্বিগুণ শক্তি। অথচ কিছু মাছ স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটে। কেন মাছ এই কঠিন কাজটি বেছে নেয়?
মাছগুলো কি আসলেই বোকা? কেন অহেতুক কষ্ট করে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটছে? বিশেষ করে স্যামন মাছের কথাই ধরো। এরা মাইলের পর মাইল স্রোতের উল্টো দিকে সাঁতার কাটে। এমনকি উঁচু জলপ্রপাত পার হওয়ার জন্য বারবার লাফ দেয়। এদের এই অদ্ভুত আচরণের কারণ কী? চলো জেনে নেওয়া যাক, কিছু মাছ কেন স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটে।
নদীতে মাছের সাঁতার কাটার দৃশ্য আমরা সবাই কমবেশি দেখেছি। সাধারণ নিয়ম হলো পানির স্রোত যেদিকে যায় মাছও সেদিকেই ভেসে চলে। এতে মাছের শক্তি অনেক কম খরচ হয় এবং খুব সহজে অনেক পথ পাড়ি দিতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির সব তো আর এক নিয়মে চলে না। এমন কিছু বিচিত্র মাছ আছে, যারা স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, জানপ্রাণ দিয়ে স্রোতের উল্টো দিকে চলে।
আমাদের দেশের মানুষের কাছে স্রোতের বিপরীতে চলা মাছ বলতে সবার আগে ইলিশের নাম মাথায় আসে। ডিম পাড়ার জন্য ইলিশ সমুদ্র ছেড়ে দল বেঁধে নদীর মিঠাপানিতে চলে আসে।
তীব্র স্রোত যেখানে এদের পেছনে ঠেলে দিতে চায়, সেখানে এরা শরীরের সব শক্তি দিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকে। দৃশ্যটি দেখে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য। পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রজাতির মাছ আছে। যেসব মাছ জীবনের একটি বিশেষ সময়ে সমুদ্রের লোনাপানি ছেড়ে নদীর মিঠাপানিতে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটে, এদের বলা হয় ‘অ্যানাড্রোমাস’ মাছ।
অ্যানাড্রোমাস মাছের সবচেয়ে অবাক করা বৈশিষ্ট্য হলো এদের প্রখর স্মৃতিশক্তি। বিজ্ঞানীরা একে বলেন অলফ্যাক্টরি ইমপ্রিন্টিং বা ঘ্রাণজ স্মৃতি। ছোট থাকা অবস্থায় এদের জন্মস্থানের পানির ঘ্রাণ মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। বড় হওয়ার পর যখন ডিম পাড়ার সময় আসে, তখন হাজার মাইল দূরের মহাসাগর থেকেও এরা সেই পুরোনো ঘ্রাণ খুঁজে পায়। যেটা দিয়ে ঠিক নিজের জন্মস্থানেই ফিরে আসে এরা। যেন এদের মস্তিষ্কে আগে থেকেই কোনো অদৃশ্য জিপিএস সেট করা আছে। এই ক্ষমতার কারণেই শত বাধা সত্ত্বেও মাছগুলো ভুল পথে যায় না।
এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, কেন জন্মস্থানেই এদের ফিরে আসতে হবে? অন্য স্থানের পানিতে ক্ষতি কী? এই দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দেওয়ার পেছনে রয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপত্তা। সমুদ্রের লোনাপানি আর বিশাল ঢেউ ছোট ছোট পোনা মাছের বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত নয়। তাই ডিম পাড়ার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এরা মিঠাপানির শান্ত প্রবাহ বেছে নেয়। এই যাত্রাপথ মোটেও সহজ নয়। মাইলের পর মাইল স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা, উঁচু জলপ্রপাত পার করা এবং ওত পেতে থাকা শিকারিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এদের এগোতে হয়।
সমুদ্র থেকে নদীতে ঢোকার সময় এদের গায়ের রং বদলে যায় এবং শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো লোনাপানির বদলে মিঠাপানির উপযোগী হয়ে ওঠে।
আমাদের দেশের মানুষের কাছে স্রোতের বিপরীতে চলা মাছ বলতে সবার আগে ইলিশের নাম মাথায় আসে। ডিম পাড়ার জন্য ইলিশ সমুদ্র ছেড়ে দল বেঁধে নদীর মিঠাপানিতে চলে আসে। তবে ইলিশ একা এই কাজ করে, এমন নয়। পৃথিবীতে আরও অনেক অ্যানাড্রোমাস মাছ আছে, যারা একই নিয়ম মেনে চলে। এ তালিকায় স্যামন মাছের পরেই আসে স্টার্জন। এ ছাড়া স্ট্রাইপড ব্যাস, স্পটেড সি ট্রাউট কিংবা বিশেষ প্রজাতির অ্যালোসা মাছগুলোও বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্রোতের উল্টো পথে সাঁতার শুরু করে।
সময়ের সঙ্গে এই মাছগুলোর শরীরের গঠনও অদ্ভুতভাবে এ লড়াইয়ের জন্য মানিয়ে নেয়। সমুদ্র থেকে নদীতে ঢোকার সময় এদের গায়ের রং বদলে যায় এবং শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো লোনাপানির বদলে মিঠাপানির উপযোগী হয়ে ওঠে। কিছু মাছ তো এই দীর্ঘ যাত্রায় কোনো খাবারই খায় না। শরীরের জমানো চর্বি ব্যবহার করে এরা শক্তি জোগায়। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র আর স্মৃতির সাহায্যে এরা টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যায়।