১০ বছর পর আবার ফিরেছে নাইজেরিয়ার ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার উৎসব আরগুঙ্গু
হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছেন। কেউ দ্রুত হাঁটছেন, কেউ দৌড়াচ্ছেন। সবার হাতে মাছ ধরার জাল আর মাছ রাখার বিশাল গোল পাত্র। সবার একটাই লক্ষ্য—কে কার আগে নদীতে নামবেন আর কে সবচেয়ে বেশি মাছ ধরবেন। দুধের মতো সাদা টলটলে পানির নদীটি মুহূর্তেই জেলেদের ভিড়ে ভরে গেল। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বেশ কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
তবে দৃশ্যটি কোনো সাধারণ মাছ ধরার ছিল না। সেটি ছিল নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমের আরগুঙ্গু শহরের এক ঐতিহাসিক মাছ ধরার উৎসবের। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়া ঐতিহ্যবাহী মাতান ফাদান নদীতে আয়োজিত হয় এই বিশেষ আরগুঙ্গু উৎসব।
হাজার হাজার জেলের উপস্থিতিতে নদীটি এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়। নিরাপত্তার কারণে কিছুটা কড়াকড়ি থাকলেও দর্শকদের উল্লাসে কোনো কমতি ছিল না। খোদ দেশটির প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবুসহ হাজার হাজার মানুষ এই মাছ ধরার প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
আরগুঙ্গু উৎসবের সবচেয়ে মজার দিক হলো মাছ ধরার সরঞ্জাম। এখানে জেলেরা মাছ ধরার জন্য আধুনিক কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করেন না। তাঁরা ব্যবহার করেন নিজেদের হাতে বোনা জাল আর ক্যালাবাশ নামে একধরনের বড় মাছ রাখার পাত্র। ক্যালাবাশ তৈরি করা হয় একধরনের বড় লাউ দিয়ে। যার ভেতরের অংশ ফেলে দিয়ে খোলটি রোদে শুকিয়ে শক্ত করা হয়। উৎসবে অনেকে নিজের খালি হাত দিয়েই বিশাল সব মাছ ধরেন।
এবারের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছেন এমন একজন জেলে, যিনি একাই ৫৯ কেজি ওজনের একটি বিশাল ক্রোকার মাছ ধরেছেন। পুরস্কার হিসেবে তাঁকে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে যাঁরা পুরস্কার জিততে পারেননি, তাঁরাও কিন্তু খালি হাতে ফেরেননি। তাঁদের ধরা মাছগুলো বাজারে বিক্রি করার সুযোগ থাকায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের গতি ফিরে এসেছে এ শহরে।
তবে চাইলেই যে কেউ যেকোনো সময় এই নদীতে মাছ ধরতে পারেন না। বছরের বাকিটা সময় নদীটি সবার জন্য বন্ধ থাকে। সারকিন রুওয়া নামের একজন নদীপ্রধান এই নদীর দেখাশোনা করেন। নাইজেরিয়ার ঐতিহ্যবাহী কুস্তি আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই এই মৎস্য উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
প্রায় ১০ বছর পর আবার মাছ ধরতে পেরেছেন সেই অঞ্চলের জেলেরা। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ৬৩ বছর বয়সী জেলে আলিউ মুহাম্মদু আনন্দ প্রকাশ করেন, ‘আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ যে আমার পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো কিছু একটা পেয়েছি। এখানে আসতে পেরে আমি সত্যিই খুব খুশি।’
উৎসবের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরোনো। ১৯৩৪ সালে এটি প্রথম শুরু হয়েছিল। ১৯ শতকের বিশাল এক সাম্রাজ্য সোকোটো খিলাফত এবং শক্তিশালী আরগুঙ্গু আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘ ১০০ বছর ধরে শত্রুতা চলছিল। সেই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতেই মূলত এই উৎসবের সূচনা হয়।
মাছ ধরার এই উৎসবকে দেখা হয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা উৎসবটি ২০১০ সালে স্থগিত হয়ে যায়। মূলত এলাকার রাস্তাঘাট ও পরিকাঠামোর সমস্যা ও নাইজেরিয়ার উত্তর দিকে নিরাপত্তাব্যবস্থার অবনতির কারণে এটি বন্ধ ছিল। ২০২০ সালে একবার এটি চালু করা হলেও আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশেষে এ বছর আবার তা প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
নাইজেরিয়া বর্তমানে এক কঠিন নিরাপত্তাসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সেই আতঙ্ক এখন দক্ষিণ দিকেও ছড়িয়ে পড়ছে। এই অস্থিরতার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট টিনুবু মনে করেন, উৎসবের ফিরে আসা মানেই শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসা। স্থানীয়দের কাছে এটি নিজেদের ঐতিহ্য আর গর্ব ফিরে পাওয়ার মতো।
তবে ভয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি। আরগুঙ্গুর সারকিন রুওয়া হুসেইন মুকওয়াশে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের ভয় দূর করা। নিরাপত্তার অভাবে অনেকেই এখন আর আগের মতো এই উৎসবে যোগ দিতে সাহস পান না।’
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট ও আল–জাজিরা