চীনকে ৬৪টি সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও জীবাশ্ম ফেরত দিল যুক্তরাষ্ট্র
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। সে উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন ফেরত দিয়েছে। একটি সুন্দর ও সফল উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পথ সহজ করার উদ্দেশ্যেই মূলত যুক্তরাষ্ট্র এ কাজ করেছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসে একটি হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে চীনা কর্মকর্তারা ৫৮টি অত্যন্ত মূল্যবান সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও জীবাশ্ম বুঝে নেন। এগুলো এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস’-এর সাংস্কৃতিক সম্পদ, শিল্পকলা ও প্রত্নবস্তুবিষয়ক দলের তত্ত্বাবধানে ছিল।
এর ঠিক পরের দিনই আবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটান ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় থেকে বাকি আরও ছয়টি নিদর্শন চীনের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।
ফেরত পাওয়া এই জিনিসগুলোর মধ্যে রয়েছে তিয়ানলংশান গুহা থেকে উদ্ধার করা বোধিসত্ত্ব ভাস্কর্য, প্রাচীন ভাস্কর্য এবং ডাইনোসরের জীবাশ্ম ও ডিমের জীবাশ্মের মতো অনেক মূল্যবান ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নানা সময় অভিযান চালিয়ে এসব উদ্ধার ও জব্দ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা চীনা কূটনৈতিক কার্যালয় ও মার্কিন কর্তৃপক্ষের যৌথ প্রচেষ্টাতেই এসব ঐতিহাসিক সম্পদ চীনে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর গত ১৭ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ২০টির বেশি ধাপে ৭০০টির বেশি সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও শিল্পকর্ম চীনের কাছে ফেরত দিয়েছে। এর মধ্যে আরও আছে ৭৯ বছর ধরে বিদেশে আটকে থাকা অত্যন্ত প্রাচীন জিদানকু সিল্ক ম্যানুস্ক্রিপ্ট নামের রেশমি পাণ্ডুলিপি।
হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক সম্পদ ও প্রাচীন নিদর্শন ফেরত আনা পুরো বিশ্বের জন্যই এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারণ, একবার কোনো ঐতিহ্যবাহী জিনিস বিদেশের নিলামের বাজারে পৌঁছে গেলে তা নিয়ে তৈরি হয় জটিল আইনি ঝামেলা। তবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের চুক্তি ও সহযোগিতার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের এক চমৎকার পথ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে যাতে কোনো অবৈধ চীনা প্রাচীন নিদর্শন ঢুকতে না পারে, সে জন্য ২০০৯ সালের ১৪ জানুয়ারি দুই দেশ প্রথম একটি চুক্তি করে। এর উদ্দেশ্য ছিল, চুক্তির মাধ্যমে একে অপরের ঐতিহাসিক সম্পদকে সম্মান করা এবং চুরি হওয়া নিদর্শন পাচার বন্ধে এক শক্তিশালী সুরক্ষাবলয় তৈরি করা। এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি পরে ২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪ সালে মোট ৩ বার নবায়ন করা হয়। ফলে আইনি ঝামেলা এড়িয়ে নিয়মিত ও সহজ উপায়ে নিজ দেশের সম্পদ ফেরত পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
এ উদ্যোগ প্রমাণ করে, দুই দেশ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রাখলে একসঙ্গে বড় ও ভালো কাজ করা সম্ভব। গত ১৭ বছরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের নানা চড়াই–উতরাই এলেও সাংস্কৃতিক সম্পদ ফেরত দেওয়ার পথটি কখনোই বন্ধ হয়নি।
বাস্তবতাই দেখিয়েছে, দুই দেশের মতামত ভিন্ন হলেও তা থেকে কোনো সংঘাত তৈরি হওয়া উচিত নয়; বরং আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের লাভ হয়—এমন নীতি মেনে কাজ করাই সঠিক পথ। নিদর্শন ফেরত পাঠানোর এই সফল কাজ এটিই দেখায় যে ইচ্ছা থাকলে বড় বড় দেশও নিজেদের দ্বিমত সরিয়ে রেখে ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আশা করা যায়, উভয় দেশ বড় বড় বিষয়ে নিজেদের মতামত আরও এক করবে এবং কাজের পদক্ষেপগুলোকে আরও সহজ ও কার্যকর করে তুলবে। পাশাপাশি তারা একে অপরের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়াবে। এতে পরস্পরের বিশ্বাসের জায়গাটি আরও শক্ত করবে।