মানসিক চাপ কমাতে যে স্টুডিওর মুভি দেখা যেতে পারে

একদল গবেষক জানিয়েছেন, স্টুডিও গিবলির মুভি দেখা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অভাবনীয় কার্যকরনিউইয়র্ক টাইমস

সারা দিনের পড়াশোনা আর ব্যস্ততার পর অবসরে অনেকেই একটু গেম খেলেন। কেউ মুভি দেখেন, কেউ বই পড়েন আবার কেউ বাইরে খেলতে যান। যাঁরা মুভি দেখেন বা গেম খেলে সময় কাটান, তাঁদের প্রায়ই মা-বাবার বকুনি শুনতে হয়। আর যাঁরা অ্যানিমে দেখেন, তাঁদের তো আরও বেশি কথা শুনতে হয় ‘কী সব বাচ্চাদের কার্টুন দেখছ।’

তবে অ্যানিমের বিশাল জগতের মধ্যে স্টুডিও গিবলির (Studio Ghibli) মুভিগুলো একদম আলাদা। এর অসাধারণ গল্প, সুন্দর ফ্রেম আর শান্ত পরিবেশ নিমেষেই যেন অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। মুভিটি শেষ হওয়ার পর মন বেশ হালকা হয়ে যায় এবং সব দুশ্চিন্তা যেন দূর হয়ে যায়। সবারই হয়তো এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন এই জাপানি অ্যানিমেশনগুলো আমাদের মনে এমন গভীর ছাপ ফেলে? কেন গিবলির মুভি দেখলে বড়দের শৈশবের সেই হারানো সুখের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়? তবে এই ভালো লাগা কিন্তু কেবল তোমার বা আমার ব্যক্তিগত কোনো অনুভূতি নয়। সম্প্রতি একদল গবেষক জানিয়েছেন, স্টুডিও গিবলির মুভি দেখা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অভাবনীয় কার্যকর। তাঁরা বলেন, এই রঙিন আর মায়াবী জগৎগুলো আমাদের মস্তিষ্কে এমনভাবে কাজ করে, যা বিষণ্নতা কমিয়ে জীবনের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করে। কিন্তু কীভাবে একটা অ্যানিমের মুভির পক্ষে এটা করা সম্ভব।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা তাঁদের এই তত্ত্ব প্রমাণ করতে ৫১৮ জন পোস্টডক্টরেট ছাত্রের ওপর একটি পরীক্ষা চালান।

স্টুডিও গিবলির মুভি মানেই এক অদ্ভুত মায়া। এর মনকাড়া গল্প আর অসাধারণ সব দৃশ্য বিশ্বজুড়ে ছোট-বড় সবার কাছে দারুণ জনপ্রিয়। গিবলির মুভিগুলো দেখলে আমাদের মনে যে প্রশান্তি বা ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হয়। এটি কিন্তু শুধু আমাদের কল্পনা নয়। আসলে এই ভালো লাগার পেছনে চমৎকার কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ আছে।

স্টুডিও গিবলির মিয়াজাকি হাইয়াও
দ্য গার্ডিয়ান

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, কিউশু সাংয়ো বিশ্ববিদ্যালয় এবং জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সম্প্রতি এই বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, আজকালকার তরুণেরা প্রায়ই বিষণ্নতা বা দুশ্চিন্তায় ভোগেন। মানসিক প্রশান্তির জন্য এই মুভিগুলো বা ওপেন-ওয়ার্ল্ড গেমগুলো কেবল বিনোদন নয়, বরং মন ভালো করার ওষুধ হিসেবেও দারুণ কাজ করে।

গবেষকেরা তাঁদের এই তত্ত্ব প্রমাণ করতে ৫১৮ জন পোস্টডক্টরেট ছাত্রের ওপর একটি পরীক্ষা চালান। তাঁদের কয়েকজনকে ‘মাই নেইবার টোটোরো’, ‘কিকি’স ডেলিভারি সার্ভিস’ বা ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’র মতো গিবলি মুভি দেখতে বলা হয় এবং কাউকে কাউকে ‘দ্য লেজেন্ড অব জেল্ডা: ব্রেথ অব দ্য ওয়াইল্ড’–এর মতো গেম খেলতে দেওয়া হয়। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল মূলত দেখা এই মুভি বা গেমগুলো মানুষের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পুরোনো ভালো স্মৃতি, শান্তি, দক্ষতা ও জীবনের সার্থকতা বা সুখের অনুভূতি কতটা জাগিয়ে তুলতে পারে। গবেষণা বলছে, এই রঙিন জগৎগুলো আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে প্রভাবিত করে, যা আমাদের জীবনের সামগ্রিক আনন্দ বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন
যদি এই মুভিগুলোর সঙ্গে পরিচিয় না থাকে তবে শুরুতেই ‘মাই নেইবার টোটোরো’ বা ‘পনিও’র মতো গল্পের মুভিগুলো দেখে নিতে পারেন।

গবেষকেরা তাঁদের এই চমৎকার পরীক্ষার ফলাফল ‘জেএমআইআর সিরিয়াস গেমস’ (JMIR Serious Games) নামক একটি বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশ করেছেন। এই জার্নালটি মূলত গেম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব গেমে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানো যায়, সেগুলো আমাদের মন ভালো রাখতে ও আনন্দ বাড়াতে দারুণ সাহায্য করে। আর এই সুখের অনুভূতি আরও বহুগুণ বেড়ে যায় যখন এর সঙ্গে স্টুডিও গিবলির মুভি দেখা হয়। ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে অবসরে সঠিক বিনোদন বেছে নেওয়া আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী হতে পারে। এটি তরুণদের মনে কৌতূহল জাগিয়ে তোলে ও পৃথিবীতে নিজের অবস্থান সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে মানসিক চাপ ও দুঃখ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।

‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

গবেষণার অন্যতম লেখক আন্দ্রেয়াস বি আইজিনজেরিচ জানান, ‘আমাদের গবেষণায় একটি দারুণ বিষয় উঠে এসেছে। ব্রেথ অব দ্য ওয়াইল্ডের মতো গেম এবং স্টুডিও গিবলি মুভির মায়াবী জগতের বিস্ময় মানুষের কিছু মৌলিক ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলে। নতুন কিছু খোঁজার ইচ্ছা, মনের শান্তি এবং জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া। এগুলো আমাদের দৈনন্দিন ভালো থাকার জন্য খুব কার্যকর পথ তৈরি করে দেয়।’

তাই যদি কখনো বিষণ্ন বোধ হয়, তবে একটি স্টুডিও গিবলি মুভিই হতে পারে সেরা ওষুধ। যদি এই মুভিগুলোর সঙ্গে পরিচিয় না থাকে তবে শুরুতেই ‘মাই নেইবার টোটোরো’ বা ‘পনিও’র মতো গল্পের মুভিগুলো দেখে নিতে পারেন। আর যদি রোমাঞ্চকর বা অ্যাডভেঞ্চারধর্মী কিছু খুঁজতে চান, তবে ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ বা ‘হাউলের মুভিং ক্যাসেল’ তোমার জন্য একদম উপযুক্ত। শুধু আরাম করে বসেন, সঙ্গে কিছু পপকর্ন নিয়ে এই অসাধারণ মুভিগুলোর দেখে নিতে পারেন।

সূত্র: ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন, পেরেন্টস ডটকম, মাইমডার্নমেট

আরও পড়ুন