চামচ বাঁকিয়ে জাদুকর যেভাবে বিজ্ঞানীদের বোকা বানিয়েছিল
১৯৭৯ সাল। দুজন জাদুকর ঢুকে পড়েছেন একেবারে বিজ্ঞানীদের ল্যাবরেটরিতে। শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও ঘটনাটা সত্যি। এটা ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম বড় ধোঁকাবাজি। এই ঘটনাই পরে পরিচিতি পায় প্রজেক্ট আলফা নামে। উদ্দেশ্য একদম পরিষ্কার। অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা চালান, সেটা যাচাই করা। আর সেই পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হলো ম্যাজিক!
বিজ্ঞানে জাদুর ব্যবহার নতুন কিছু নয়। কখনো বানরের মনোযোগ বোঝাতে, কখনো মানুষের বিশ্বাস কীভাবে কাজ করে সেটা বুঝতে বিজ্ঞানীরা ম্যাজিকের কৌশল ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রজেক্ট আলফা ছিল একটু অন্য রকম। এখানে জাদু ব্যবহার করা হয়েছিল বিজ্ঞানীদেরই পরীক্ষা করার জন্য।
এই গল্পের মূল নায়ক জেমস র্যান্ডি। তিনি ছিলেন বিখ্যাত জাদুকর এবং সন্দেহপ্রবণ মানুষ। কেউ নিজের অলৌকিক ক্ষমতার কথা দাবি করলে র্যান্ডি তা ধরে ফেলার চেষ্টা করতেন। তাঁর কাছেই একদিন চিঠি পাঠালেন দুই তরুণ জাদুকর মাইকেল এডওয়ার্ডস ও স্টিভ শ। তাঁরা লিখলেন, ‘আমরা জাদুকর। যারা অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা থাকার দাবি করে, তাদের ধরতে আমাদের সাহায্য নিতে পারেন। আমরা প্রস্তুত।’
র্যান্ডি তখন তাঁদের চিঠির উত্তর দেননি। কিন্তু হঠাৎ তিনি খবর পেলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ম্যাকডনেল ল্যাবরেটরি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চ সেন্টার প্যারানরমাল গবেষণার জন্য অনেক টাকা পেয়েছে। প্রায় পাঁচ লাখ ডলার। দাতা ছিলেন জেমস এস ম্যাকডনেল নামের এক শিল্পপতি। অলৌকিক বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন তিনি। র্যান্ডির মাথায় তখনই বুদ্ধি এল, এই ল্যাবের বিজ্ঞানীরা কতটা সাবধান, সেটা পরীক্ষা করা দরকার।
র্যান্ডি ল্যাবের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তিনি আগেই সতর্ক করে দিলেন, পরীক্ষার নিয়ম বদলাতে দেবেন না। এমনকি পরীক্ষাধীন ব্যক্তিকেও একা ছাড়বেন না। আর যারা চামচ বাঁকাতে পারে, তাদের ব্যাপারে সাবধান থাকবেন।
কিন্তু ঠিক একই সময় র্যান্ডির পরিকল্পনা অনুযায়ী মাইকেল ও স্টিভ ওই ল্যাবে হাজির হলেন। তাঁরা দাবি করলেন, তাঁদের বিশেষ সাইকিক ক্ষমতা আছে। বিজ্ঞানীরা আনন্দের সঙ্গে তাঁদের নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন।
১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর এই দুই জাদুকর বিজ্ঞানীদের চোখের সামনেই একের পর এক জাদুর কৌশল দেখিয়ে গেলেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা কিছুই বুঝতে পারলেন না। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, চামচে কাগজের লেবেল সুতা দিয়ে বেঁধে দিলে আর বদলানো যাবে না।
কিন্তু জাদুকরদের কাছে এটা ছিল শিশুতোষ খেলা। একটু মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরালেই তাঁরা লেবেল বদলে ফেলতেন। কখনো টেবিলের নিচে চামচ একটু বাঁকিয়ে আবার ওপরে তুলে আনতেন। কখনো এক চামচের লেবেল আরেকটায় লাগিয়ে দিতেন। বিজ্ঞানীরা তখন অবাক হয়ে লিখে রাখতেন, চামচের ওজন বদলে গেছে! নিশ্চয়ই অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা!
একবার বিজ্ঞানীরা একটা কাচের জারে চামচ রেখে মুখ বন্ধ করে দিলেন। ভাবলেন, এবার তো কেউ ছুঁতেও পারবে না। কিন্তু জাদুকরেরা অনুরোধ করলেন, একবার হাতে নিয়ে দেখি জারটা? বিজ্ঞানীরা রাজি হলেন। ওই একবার হাতে নেওয়াই যথেষ্ট। চামচ সামান্য বাঁকিয়ে আবার জারে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। বিজ্ঞানীরা কিছুই ধরতে পারলেন না।
আরও মজার একটা ঘটনা ঘটেছিল ছবি নিয়ে। জাদুকরেরা দেখালেন, তাঁদের তোলা পোলারয়েড ছবিতে ভূতের মুখ দেখা যাচ্ছে! আসলে তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন খুব সাধারণ ট্রিক, ডাবল এক্সপোজার। আগের একটা ছবি নতুন ছবির ওপর হালকা ছায়া হিসেবে ভেসে উঠত। বিজ্ঞানীরা সেটাকেই অলৌকিক প্রমাণ ভাবলেন। তাঁরা যদি শুরুতেই একটা পরীক্ষামূলক ছবি তুলতেন, তাহলে সত্যিটা ধরা পড়ে যেত।
শেষে ১৯৮৩ সালে এল আসল খবর। র্যান্ডি, মাইকেল ও স্টিভ একসঙ্গে সংবাদ সম্মেলন করলেন। ডিসকভার ম্যাগাজিনে পুরো ঘটনা ছাপা হলো। তাঁরা জানালেন, ‘আমরা কেউই অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী নই। আমরা জাদুকর। সবটাই ছিল পরীক্ষা।’ বিজ্ঞানীরা হতভম্ব হয়ে গেলেন। কেউ বললেন, এতে প্যারানরমাল গবেষণার দুর্বলতা ধরা পড়েছে। কেউ রেগে গেলেন। তবে ল্যাবের প্রধান গবেষক স্বীকার করলেন, তাঁরা যথেষ্ট সতর্ক ছিলেন না।
প্রজেক্ট আলফা বিজ্ঞানীদের একটা বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে। বিজ্ঞানে চোখের দেখা সব সময় সত্যি নয়। আর সামনে একজন দক্ষ জাদুকর থাকলে পৃথিবীর সেরা ল্যাবরেটরিতেও বিজ্ঞানীদের বোকা বানানো সম্ভব। বিজ্ঞানে সবচেয়ে জরুরি জিনিসটা তাই কৌতূহল নয়, সতর্কতা।